মঙ্গলবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২২, ০৭:৪০ অপরাহ্ন

চীনের কোন পদক্ষেপটি সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে?

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২০

 

করোনাভাইরাস নতুন দিকে মোড় নিয়েছে। উহানের পরিস্থিতি ক্রমেই স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। অন্যদিকে ইউরোপে ভয়াবহ হচ্ছে দিনলিপি। ইতালি, স্পেন থেকে শুরু করে আমেরিকা—মৃত্যুর মিছিল যেন থামানোই যাচ্ছে না। একথা স্পষ্ট যে, চীনের গৃহীত পদক্ষেপগুলোই তাদের সফলতার পেছনে অন্যতম কারণ। যদিও শুরুতে কঠোর বলে মনে হচ্ছিল—বর্তমানে চীনের দেখাদেখি অনেক দেশই তা অনুসরণ করছে। দেশের ভেতরে চলাচল সীমিত করে দিচ্ছে কেউ, কেউ বন্ধ করে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ।

এই বছরের জানুয়ারির মাঝামাঝি। চীনা সরকার নতুন ভাইরাস নিয়ে নিশ্চিত হবার পর সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করে—যেহেতু রোগটি অতিমাত্রায় সংক্রামক। উহানের ভেতরে এবং বাইরের মানুষদের জন্য সীমিত করে দেওয়া হয় চলাফেরা। শুধু উহানের জন্য না, হুবেই প্রদেশের আরো ১৫টি শহরের প্রায় ৬০ মিলিয়ন মানুষ হয় বিচ্ছিন্ন। বাতিল হয় বিমান এবং রেল যোগাযোগ। বন্ধ করা হয় সড়ক পরিবহনও। নাগরিকদের বলে দেওয়া হয় যার যার বাসায় অবস্থান করতে। শুধুমাত্র খাদ্য এবং চিকিৎসার সাহায্যের জন্যই বের হওয়ার অনুমোদন পাওয়া গেল। নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতে, দেশের প্রায় ৭৬০ মিলিয়ন মানুষ অর্থাৎ গোটা জনসংখ্যার অর্ধেকই বাধ্য হয়েছিল বাসায় থাকতে।

একটি ভাইরাস আতঙ্কিত করে তুলেছে গোটা পৃথিবী
সে ঘটনার দুই মাস হয়ে গেছে। তখন প্রতিদিন হাজারের বেশি নতুন রোগী সনাক্ত হতো। এখন তা কমতে কমতে দশ থেকে বিশ জনে নেমে এসেছে। এমনকি স্থানীয়দের মধ্যেও নতুন আক্রান্ত কাউকে তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। জনতার চলাচলে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তাই ব্যাপকভাবে সফল। গত মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চীনকে অভিনন্দন জানায় ক্রমবর্ধমান রোগের প্রতিক্রিয়ায় মৌলিক এবং অভূতপূর্ব পদক্ষেপের জন্য। তারপরেও প্রশ্ন হচ্ছে, চীনের কোন পদক্ষেপটি সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে? যথাযথ উত্তর পাওয়া গেলে তা অন্যান্য দেশের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে।

লক ডাউনের পর
প্রথম দিকে বিজ্ঞানীরা বিষয়টাকে একভাবে খতিয়ে দেখেছেন—একজন আক্রান্ত ব্যক্তি দুই বা ততোধিক ব্যক্তিকে আক্রান্ত করে দিতে পারে। যেভাবে ছাড়ায় সার্সসহ আরো কিছু ভাইরাস। কিন্তু ১৬ থেকে ৩০ জানুয়ারির পরিসংখ্যান দিল অন্য হিসাব। প্রকৃতপক্ষে আক্রান্ত হবার সর্বোচ্চ সময়টা ছিল ২৫ জানুয়ারি। অর্থাৎ উহানে লক ডাউন ঘোষণা করার দুই দিন পর।

মার্চের ১৬ তারিখ অব্দি ৮১ হাজার সংক্রমণের তথ্য দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। অবশ্য বিজ্ঞানীরা এতে আশ্বস্ত না। তাদের দাবি, অনেক তথ্য তালিকার বাইরে থেকে গেছে। হতে পারে অনেকের মধ্যে লক্ষণগুলো মারাত্মক হয়ে ওঠেনি বলে কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেনি। হতে পারে টেস্ট পৌঁছায়নি। কিন্তু এটা নিশ্চিত যে, যদি আক্রান্তের সংখ্যা এর চল্লিশ গুণও হয়ে থাকে; তবুও চীনের নেওয়া পদক্ষেপ সফল।

আরো ভালো হতে পারত?
গবেষকরা মনে করেন, চীনের প্রতিক্রিয়ায় একটি তীক্ষ্ণ ত্রুটি রয়েছে। তারা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে অনেক দেরিতে। ডিসেম্বর কিংবা জানুয়ারির শুরুর দিকে উহান কর্তৃপক্ষ রহস্যজনক এই ভাইরাস নিয়ে নীরব ছিল। চীনের এই বিলম্বই হয়ে থাকতে পারে ভাইরাসটির বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম মূল কারণ। গবেষণা সমীক্ষা বলছে, চীন যদি আর এক সপ্তাহ আগে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করত; তবে ৬৭% সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সক্ষম হতো।

চীন আরেক সপ্তাহ আগে পদক্ষেপ নিলে আঘাত কমতে পারত
এবং যদি তিন সপ্তাহ আগে গ্রহণ করতে পারত; সংক্রমণ নেমে যেত ৫%-এ। অন্যান্য শহরের উপাত্ত বিশ্লেষণ করলেও ঠাহর করা যায় দ্রুততার সুফল। যে শহরে প্রথম আক্রান্তের খবর পাওয়ার সাথে সাথেই যোগাযোগ, জনসমাবেশ এবং প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে; তাদের আক্রান্তের হার যারা করেনি তাদের চেয়ে ৩৭% কম।

পরিবহন নিষেধাজ্ঞার সাফল্য-ব্যর্থতা
চীনের পরিবহন অবরোধ সংক্রমণ কমিয়ে দিয়েছে সত্য। কিন্তু খুব যে বেশি কমিয়েছে তা কিন্তু না। অন্যান্য শহরে পৌঁছাতে খুব জোর চার দিন পিছিয়েছে। তবে এতে লাভ হয়েছে বাকি দেশগুলোর। দুই বা তিন সপ্তাহের মধ্যেই উহান থেকে ভাইরাসের চালান থামানো গেছে। যদিও খুব বেশি দিনের জন্য না। কারণ চীনের অন্যান্য শহরেও আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম না। তারাও এরমধ্যে বিদেশ ভ্রমণ করেছে। ফলে খুব শীঘ্রই আন্তর্জাতিকভাবে মহামারীতে রূপ নেয় ভাইরাসটি। পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, নব্বই শতাংশ পরিবহন বন্ধ করে দিয়েও মহামারীর মহাযজ্ঞ কয়েক দিন পেছানো গেছে মাত্র।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অবশ্য পরিবহন বাতিলের বিরোধিতাই করেছে
এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকার বহু দেশ এখন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার নীতিকে গ্রহণ করেছে। অবশ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তার বিরোধিতাই করেছে। এতে জাতীয় মনোযোগ ও সম্পদ ভিন্ন খাতে চলে যাবে। রোগের বিস্তার রোধে ফলপ্রসূ হবে না খুব একটা। উল্টা শিল্প, বাণিজ্য এবং অর্থনীতির ওপর দারুণ আঘাত পড়বে। বিঘ্নিত হবে জরুরি নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্য সহযোগিতা।

বাকি দেশগুলোর শিক্ষা
রোগ সনাক্তকরণ এবং দ্রুত সঙ্গরোধের ব্যবস্থা এবং সেই সাথে আন্তঃনগর যোগাযোগ বন্ধকরণ সম্মিলিতভাবে প্রকোপ কমাতে সাহায্য করেছে। এই পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ফেব্রুয়ারির শেষতক ন্যূনপক্ষে ৮ মিলিয়ন মানুষ আক্রান্ত হতো। জনতার পারস্পারিক যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণও ছিল গুরুত্ববহ। তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের লোকেশন তথ্য জেনে দেখা যায় প্রমাণ। বিস্ময়করভাবে কমে এসেছিল মানুষে মানুষে যোগাযোগের ধরন। যদি এইটা করা না যেত তাহলে ফেব্রুয়ারির শেষ অব্দি এর আড়াই গুণ মানুষ আক্রান্ত হতো।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সনাক্তকরণ এবং সঙ্গরোধ। এটা করা না হলে সংক্রমণ পাঁচগুণ বেশি দাঁড়াত বর্তমানের তুলনায়। যদি পরবর্তী কোনো দেশ কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চায়, তবে একেই সবার আগে গুরুত্ব দিতে হবে। উৎকৃষ্ট প্রমাণ সিঙ্গাপুর। গোড়ার দিকে সেখানে ভাইরাস সবচেয়ে দ্রুত বিস্তারণশীল ছিল। রোগীর দেহে ডাক্তাররা রহস্যজনক নিউমোনিয়া দেখেই বিষয়টাকে সিরিয়াস হিসাবে নিয়েছে। সার্থকভাবে নির্ধারণ করেছে বিস্তারের কারণ। নিশ্চিত করেছে সঙ্গরোধ। ফলে মার্চের ২৭ তারিখ অব্দি তাতে আক্রান্তের সংখ্যা ছয়শোর নিচে। মৃত্যু মাত্র দুইজন এবং আরোগ্য লাভ করেছে ১৭২ জন।

সিঙ্গাপুর এই ক্ষেত্রে এখন অব্দি সফল
চীনের মতো ভয়াবহ অবরোধের প্রয়োজন পড়েনি সেখানে। কিছু অনুষ্ঠান কিংবা প্রোগ্রাম বাতিল হয়েছে শুধু। আক্রান্তদের নেওয়া হয়েছে কোয়ারেন্টিনে। চীনে স্কুল-কলেজ বন্ধের ফলাফল এখনো আমাদের কাছে অজানা। সম্ভবত সেটাও সাহায্য করেছে। কিন্তু কতটুকু; তা গবেষণা সাপেক্ষ।

চীনে কোভিড অধ্যায়ের সমাপ্তি!
নাটকীয়ভাবেই কমে এসেছে কোভিড-১৯ এর চীন পর্ব। অবশ্য ভয় থেকেই যাচ্ছে। লক ডাউন উঠিয়ে নিয়ে সবকিছু স্বাভাবিক করে দেওয়া হলে আরেক দফা ছড়িয়ে পড়তে পারে। বাইরের দেশগুলো থেকেও সংক্রমিত হতে পারবে তখন। যেহেতু পৃথিবীর প্রতিটা দেশই কমবেশি এই মহামারীতে ধুকছে। অর্থাৎ দ্বিতীয় ধাক্কার সন্দেহটা থেকেই যাচ্ছে।

চীনের অভিজ্ঞতা গোটা বিশ্বের জন্য শিক্ষা হয়ে থাকতে পারে
বস্তুত চীন ভাইরাসটিকে দমিয়ে দিচ্ছে, দূর করছে না। চীনের স্বাভাবিক হতে আরো সময় লাগবে। ততদিনে হয়তো আমরা পরিষ্কারভাবে জানতে পারব—তারা কী করেছে বা কী করেনি। আমাদের সরকার অনেক ব্যাপারেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বা নেয়নি। অন্তত জানা ব্যাপারগুলোর ক্ষেত্রে সরকারের চেয়ে আমাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও ভূমিকা অনেক বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে।

Please Share This Post in Your Social Media

আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD