সোমবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২২, ০৩:৫৪ অপরাহ্ন

বগুড়ার ভোটকেন্দ্রের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ৭ জানুয়ারী, ২০২২

বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বালিয়াদীঘি ইউনিয়নের কালাইহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট গণনা নিয়ে সন্দেহের জেরে সহিংসতায় নিহত ৪ জনের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৬ জানুয়ারি) রাতে কালাইহাটা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে স্থানীয় গোরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়। এদিকে এ ঘটনার সঠিক কারণ অনুসন্ধানসহ ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণ করতে জেলা পুলিশের একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা পুলিশ।

পুলিশের তদন্ত কমিটি গঠন : ঘটনাটি তদন্তে পুলিশের পক্ষ থেকে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

বগুড়ার পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী জানান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের (প্রশাসন) আলী হায়দার চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত ৩ সদস্যের কমিটিকে ৭ কার্য দিবসের মধ্যে ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখার পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ দিতে বলা হয়েছে।

ঘটনা ঘটলো যেভাবে : পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কালাইহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে গাবতলী উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার জাকির হোসেন মামলা করবেন। এদিকে সহিংস ঘটনায় দরজা-জানালাসহ আসবাবপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বৃহস্পতিবার (৬ জানুয়ারি) কালাইহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোন ক্লাস হয়নি।

গত বুধবার বিকেলে কালাইহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী ইউনুস আলী ফকিরের সমর্থকরা ‘যথাযথ গণনা’ নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেন। তারা ওই কেন্দ্রের ভোট ইউনিয়নের অপর ৮টি কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণার পর গণনার জন্য দাবি জানাতে থাকেন। কিন্তু নিয়ম না থাকায় নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ তা অগ্রাহ্য করে ওই বিদ্যালয়ের ২নং কক্ষে ভোট গণনা কার্যক্রম অব্যাহত রাখায় তাদের সন্দেহ আরও বেড়ে যায়।

এ সময় খবর রটে যে, ওই কেন্দ্রের ভোট গণনার জন্য ব্যালট পেপারগুলো গাবতলী উপজেলা পরিষদে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নৌকা মার্কার সমর্থক কয়েক শ’ নারী-পুরুষ সন্ধ্যার দিকে কালাইহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র ঘেরাও করেন। এতে সীমানা প্রাচীর বিহীন ওই বিদ্যালয়ের একটি কক্ষের ভেতরে নির্বাচনী কর্মকর্তারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন।

এক পর্যায়ে নৌকা প্রতীকের সমর্থকরা অবরুদ্ধ নির্বাচনী কর্মকর্তাদের কক্ষ লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল মারতে শুরু করেন। তাদের নিক্ষিপ্ত ইটের আঘাতে ওই কেন্দ্রে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালনকারী শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আহমেদ এবং বিজিবির গাড়িসহ বেশ কয়েকটি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে জানমাল রক্ষার্থে উপস্থিত বিজিবি সদস্যরা গুলি বর্ষণ করে। এতে এক নারীসহ ৭জন গুলিবিদ্ধ হন।

তাদের মধ্যে স্থানীয় এক নারী ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীর এজেন্ট কুলসুম বেগম, রিকশা চালক মামুন ও কৃষক আব্দুর রশিদ ঘটনাস্থলেই নিহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে খোরশেদ আলমের মৃত্যু হয়। গুলিবিদ্ধ অপর তিনজন রাকিব (১৫), আব্দুল্লাহ্ (৪৫) ও ছহির উদ্দিনকে (৬০) বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

স্বজনরা জানান , গত বুধবার দিনগত রাত দেড়টার দিকে পুলিশের একটি টিম নিহত ৪ জনের বাড়ি গিয়ে তাদের মরদেহগুলো নিয়ে ময়না তদন্তের জন্য বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন।

শোকার্ত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা জানাতে গিয়ে অনেকেই নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না। রিকশা চালক আলমগীরের স্ত্রী হোসনে আরার কিছুদিন আগে টিউমারের অপারেশন সম্পন্ন হয়েছে। স্বামীকে হারানোর কষ্টের কথ বলতে গিয়ে তার কথাগুলো যেন আটকে আসছিল। তিনি বলছিলেন, ‘ইশ্, যদি তার (স্বামী আলমগীরের) একটা পা কিংবা হাত ভাঙতো তবুও তো সে জীবিত থাকতো। আমাদের দেখভাল করতো। কিন্তু তাকে তো বাঁচতে দেওয়া হলো না। এখন আমাকে আর আমার মেয়েকে কে দেখবে?’

প্রতিবেশীরা জানান, আলমগীর বগুড়া শহরে রিকশা চালান। শহরের কৈপাড়া এলাকায় স্ত্রী ও একমাত্র কন্যাকে নিয়ে বসবাস করেন তিনি। ভোট দিতেই গত ৪ জানুয়ারি বাড়ি এসেছিলেন তিনি। ওদিকে মেয়ে কুলসুমকে হারিয়ে পাগলপ্রায় তার মা মনোয়ারা বেওয়া।

গ্রামের পথে পথে ঘুরছেন আর বলছেন, ‘আমি বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করে আমার মেয়েকে বড় করেছি। আমার মেয়েও খুব কষ্ট করে সংসার করছিল। ওরা ক্যান আমার মেয়েকে গুলি করে মারলো?’ তার প্রশ্নে সবাই নিরুত্তর।

কালাইহাটার ঘটনায় বগুড়ার জেলা প্রশাসক মো. জিয়াউল হক জানান, ‘জানমাল রক্ষার্থে কালাইহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বিজিবি ফায়ার ওপেন করেছে।’ ওই ঘটনা নিয়ে কোন তদন্ত হবে কি’না তা জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী আগে বিজিবির রিপোর্ট আসতে হবে। এরপর পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

নিহত ৪ জনের সুরতহাল করার সময় উপস্থিত জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিপন বিশ্বাস জানান, সুরতহাল করার সময় এটা জানা গেছে যে, গুলিবিদ্ধ হওয়ার কারণেই ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আরও বিস্তারিত জানতে হলে আমাদেরকে ময়না তদন্তের রিপোর্ট আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’

প্রিসাইডিং অফিসারের মামলা : কালাইহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের রিটার্নিং কর্মকর্তা জাকির হোসেন বাদি হয়ে ওই ঘটনায় গাবতলী থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন।

গাবতলী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সুব্রত সাহা জানান, সরকারি সম্পদ ভাঙচুরসহ সরকারি কাজে বাধা প্রদানের অভিযোগে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

তবে বৃহস্পতিবার (৬ জানুয়ারি) রাত পৌনে ১২টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নিহতের ঘটনায় কোনা মামলা হয়নি।

Please Share This Post in Your Social Media

আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD