বাংলা ও বিশ্বের সকল খবর এখানে
শিরোনাম

ক্ষমা, সহনশীলতা ও সাহসের প্রতীক নবী করিম সা.

মানবতার মুক্তির দিশারী মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অতুলনীয়, অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। দুনিয়াজুড়ে মানুষ আজ নৈতিক অধঃপতনের অতল গহব্বরে নিমজ্জিত। নানা রকম অবক্ষয়ের করাল গ্রাসে পতিত গোটা মানব জাতি। এই অধঃপতন থেকে মানব জাতির পরিত্রাণের একমাত্র পথ হচ্ছে হজর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আনীত জীবন বিধানের দিকে ফিরে আসা।

হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন অসাধারণ বিনয়ী, পরোপকারী, সদালাপী ইত্যাদি সকল প্রকার মহৎ গুণে গুণান্বিত অনুপম চরিত্রের অধিকারী। বর্তমানের এই ঝঞ্জা-বিক্ষুব্ধ সমাজে রাসুলের আদর্শ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল অশান্তির দাবানল থেকে মুক্তি লাভ সম্ভব।

ওই সময়ের কাফেররাও তার আদর্শের কাছে মাথানত করেছিল। তারা জানতো নবী করিম (সা.)-এর নেতৃত্বের কারণে তাদের নেতৃত্ব ধূলোয় মিশে যাবে। তাই তারা সর্বশক্তি দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিরোধিতা করেছিল। পরিণামে তাদের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চরিত্রের অত্যুজ্জ্বল আলোকমালায় উদ্ভাসিত হয়েছিল সারাজাহান। নব্য জাহেলিয়াতের ঘন ঘোর অন্ধকার দ্রবীভূত করে প্রভাত সূর্যের সোনালী কিরণের সুষমা ছড়াতে। তাই মহানবীর নৈতিক শিক্ষার বিকল্প নেই।

নবী মুহাম্মদ (সা.) দানশীলতা, উদারতা ও বদান্যতায় ছিলেন সর্বোচ্চ উদাহরণ। হজরত জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট কিছু চাওয়া হলে তিনি না বলতেন না। হজরত আনাস বিন মালেক (রা.) বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট কিছু চাওয়া হলে তিনি দিয়ে দিতেন। এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট চাইল, তিনি তাকে দুই পাল ছাগলের মধ্য থেকে এক পাল দিয়ে দিলেন, সে লোক নিজ গোত্রে এসে বলল, হে গোত্রের লোকেরা! তোমরা মুসলমান হয়ে যাও, কেননা ‘মুহাম্মদ এমন ব্যক্তির ন্যায় দান করে যে দারিদ্রের ভয় করে না।’ –সহিহ মুসলিম : ৪২৭৫

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বদান্যতার ব্যাপারে হজরত আব্বাস (রা.)-এর উক্তিই যথেষ্ট। তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানুষের মাঝে অধিকতর দানশীল। তিনি রমজান মাসে অধিক দান করতেন-যখন জিবরাইল তার নিকট অহি নিয়ে আসতেন, তাকে কোরআন শিক্ষা দিতেন। নিঃসন্দেহে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুক্ত বায়ুর চেয়ে অধিক দানশীল ছিলেন। (মুক্ত বায়ুর তুলনায় রাসুলের দানশীলতা অধিক, এ তুলনার মর্মার্থ হচ্ছে- বায়ু মুক্ত হলেও তার যেমন কিছু কিছু দুর্বলতা থাকে; যেমন সে পৌঁছতে পারে না আবদ্ধ ঘরে। রাসুলের দানশীলতার তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। তার দানশীলতা পৌছেঁ যেত সমাজের সবখানে)। -সহিহ বোখারি : ৩২৯০

সহনশীলতা ও ক্রোধ সংবরণে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সবোর্চ্চ আদর্শ। কখনও তার পক্ষ হতে মন্দ কথন ও কর্ম প্রকাশ পায়নি, নির্যাতন-অবিচারের শিকার হলেও কখনও প্রতিশোধ নেননি। কখনও কাউকে প্রহার করেননি। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) কে আল্লাহর নিষিদ্ধ সীমারেখা লঙ্ঘন না হলে কখনও নিজের প্রতি জুলুম নির্যাতনের কোনো প্রতিশোধ নিতে আমি দেখিনি। আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ ব্যতীত তিনি কখনও কোনো কিছুকে স্বীয় হস্ত দ্বারা প্রহার করেননি এবং তিনি কখনও কোনো সেবক বা স্ত্রীকে প্রহার করেননি। -সহিহ মুসলিম : ৪২৯৬

হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহনশীলতার সমর্থনে কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করা হলো-

উহুদ যুদ্ধে রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখণ্ডল আঘাত প্রাপ্ত হয়ে কয়েকটি দাঁত ভেঙে যায়, মাথায় পরিধেয় শিরস্ত্রাণ খন্ড-বিখন্ড হয়। তারপরও তিনি কোরাইশদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করেননি। বরং তিনি বলেছেন, ‘হে আল্লাহ! আমার জাতিকে ক্ষমা কর, কেননা তারা জানে না।’ –সহিহ মুসলিম : ৩২১৮

প্রতিশোধ নেওয়ার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সীমালঙ্ঘনকারীকে ক্ষমা করা একটি উদারণ ও মহৎগুণ। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগুণে সর্বাপেক্ষা গুণান্বিত ছিলেন। নবী করিম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক ক্ষমা প্রদর্শনের অনেক ঘটনা বিবরণ বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত আছে।

তিনি যখন মক্কা বিজয় করলেন, কোরাইশের বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিবর্গকে তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় নতশীরে উপবিষ্ট পেলেন। তিনি তাদেরকে বললেন, হে কোরাইশগণ! তোমাদের সঙ্গে এখন আমার আচরণের ধরণ সম্পর্কে তোমাদের ধারণা কি? তারা বলল, আপনি উদারমনস্ক ভাই ও উদারমনস্ক ভাইয়ের ছেলে। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যাও, তোমরা মুক্ত। তিনি তার ও সাহাবায়ে কেরামের বিরুদ্ধে ঘটানো সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে দিলেন।

হজরত রাসুলল্লাহকে হত্যার উদ্দেশ্যে এক লোক আসল, কিন্তু তা ফাঁস হয়ে গেল। সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এই লোক আপনাকে হত্যা করার মনস্থ করেছে, এ কথা শুনে লোকটি ভীত ও অস্থির হয়ে পড়ল। রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ভয় করো না, ভয় করো না, যদিও তুমি আমাকে হত্যা করার ইচ্ছা করেছ কিন্তু তুমি আমাকে হত্যা করতে পারবে না। কেননা আল্লাহ আমাকে অবহিত করেছেন যে, তিনি তাকে মানুষের কাছ থেকে রক্ষা করবেন। হজরত রাসুল (সা.) তাকে ক্ষমা করে দিলেন, অথচ সে তাকে হত্যা করার উদ্যোগ নিয়েছিল।

সাহসিকতা, নির্ভীকতা, যথাসময়ে উদ্যাগ গ্রহণ রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষ গুণ ছিল। তার সাহিসকতা বড় বড় বীরদের নিকট অবিসংবাদিতভাবে স্বীকৃত। হরজত আলি বলতেন, যুদ্ধ যখন প্রচণ্ড রূপ নিত, প্রবলভাবে ক্রোধান্বিত হওয়ার ফলে চোখ রক্তিম বর্ণ ধারণ করত তখন আমরা (তীর-তরবারির আঘাত থেকে বাঁচার জন্য) হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রক্ষাকবচ হিসেবে গ্রহণ করতাম। ইমরান ইবনে হাছিন (রা.) বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো বাহিনীর মুখোমুখি হলে প্রথম আঘাতকারী হতেন।

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহসিকতার একটি নমুনা নীচে উল্লেখ করা হলো- এক রাতে মদিনার একপ্রান্তে কারও চিৎকারের আওয়াজ শোনা গেল। কিছু মানুষ আওয়াজের দিকে অগ্রসর হলো, কিন্তু দেখা গেল হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) একাই আওয়াজের উৎসস্থলে তাদের আগে গিয়ে পৌছঁলেন। বরঞ্চ তিনি যখন অবস্থা দেখে ফিরছিলেন তখন তাদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হলো। তিনি ছিলেন আবু তালহার অসজ্জিত ঘোড়ার ওপরে। তরবারি ছিল তার স্কন্ধে। আবু তালহা বলতে লাগলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বাপেক্ষা সুন্দর, সর্বাপেক্ষা দানশীল, সর্বাপেক্ষা সাহসী। -সহিহ বোখারি : ২৬০৮