কোনো উপায় না দেখে জান্নাত বানিয়েছেন লোহার খাঁচা। খাঁচার ওপর ছাউনি, নিচে দুটো চাকা লাগিয়ে তা বানিয়ে নিয়েছেন ছোট্ট একটি ঠেলাগাড়ির মতো।
লাল চোখ, ক্লান্ত মুখ, বুকভরা কষ্ট—লোহার তৈরি ছোট্ট খাঁচার ভেতর যমজ তিন শিশু আর সঙ্গে আরেক সন্তানকে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন জান্নাত বেগম।
সন্তানদের কেউ কোলে, কেউ লোহার খাঁচায়, আর কেউ হাঁটছে মায়ের হাত ধরে। মায়ের চোখে শুধুই অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ—কিন্তু পিছু হটার সুযোগ নেই।
ঠাকুরগাঁও সদরের এক গলিতে এই দৃশ্য চোখে পড়ে। হঠাৎ মনে হতে পারে, কোনো নাটকের দৃশ্য। কিন্তু এ বাস্তবতা আরও নির্মম, আরও করুণ।
প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন জান্নাত। স্বামীর সঙ্গে ঢাকার সংসার পেরিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ে পাড়ি দেন। প্রথম সন্তান মরিয়মের জন্মের পর আসে তিন যমজ—আব্দুল্লাহ, আয়েশা ও আমেনা। তখনই বদলে যায় জীবন। স্বামী হাবিল স্ত্রী-সন্তান রেখে নিখোঁজ।
কোনো উপায় না দেখে জান্নাত বানিয়েছেন লোহার খাঁচা। খাঁচার ওপর ছাউনি, নিচে দুটো চাকা লাগিয়ে তা বানিয়ে নিয়েছেন ছোট্ট একটি ঠেলাগাড়ির মতো।
ওই খাঁচাতেই বসিয়ে রাখেন তিন যমজ সন্তানকে, আর হাত ধরে ঘোরান বড় মেয়েকে।
জান্নাত বলেন, “তিনটা বাচ্চা কোলে নেওয়া সম্ভব না। তাই ভাবলাম কিছু একটা করতে হবে। খাঁচা বানিয়ে নিছি, যেন সন্তানদের নিয়ে বেরোতে পারি।”
দরজায় দরজায় ঘুরে সাহায্য চাইছেন জান্নাত। কারও বাসায় কাজ করে জীবন চালানো তার পক্ষে সম্ভব নয়। “ছোট ছোট বাচ্চাগুলারে আমি কোথায় রাখব?” — চোখ ভিজে যায় জান্নাতের।
৭ হাজার টাকা খরচ করে বানানো খাঁচায় সন্তানদের নিয়ে তার দিন কাটছে রোদে-বৃষ্টিতে।
ভালোবাসার দৃষ্টান্ত রেখেছেন তিনি—অনেকে লাখ টাকা দিয়ে শিশুদের দত্তক নিতে চাইলেও রাজি হননি জান্নাত। মায়ের চোখে টাকা নয়, সন্তানই সব।
প্রতিবেশী রোকসানা পারভীন বলেন, “একজন নারী কীভাবে চারটা ছোট বাচ্চা নিয়ে এমন সংগ্রাম করতে পারে, সেটা দেখলেই বুক কেঁপে ওঠে। ওর জীবনের প্রতিটি দিন যুদ্ধের মতো।”
আরেকজন প্রতিবেশী শারমিন বলেন, “অনেকে বিপদে সাহায্য পান, কিন্তু জান্নাতকে তেমন কেউ এগিয়ে আসছে না।”
এই সংবাদ ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা খায়রুল ইসলামের কাছে পৌঁছালে তিনি জানান, “বিষয়টি আমার জানা ছিল না। দ্রুত খোঁজ নেব। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা যা যা পারি, তার পাশে দাঁড়াব।”