যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলবর্তী একটি বিশাল ভূ-চ্যুতি অঞ্চল—ক্যাসকাডিয়া সাবডাকশন জোন—তিন শতাব্দী ধরে নিশ্চুপ। কিন্তু এই নীরবতা কোনো স্বস্তির নয়, বরং এক ভয়াল ভবিষ্যতের পূর্বাভাস।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, এই অঞ্চল যেকোনো সময় প্রবল ভূমিকম্পে কেঁপে উঠতে পারে, যার ফলে তীব্র এক ‘মেগা সুনামি’ আছড়ে পড়বে ১০০ ফুট উচ্চতায়। আর তাতেই শুরু হবে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি।
ক্যাসকাডিয়া সাবডাকশন জোনটি উত্তর ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ব্রিটিশ কলাম্বিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত, যেখানে জুয়ান ডে ফুকা প্লেট ধীরে ধীরে উত্তর আমেরিকান প্লেটের নিচে ঢুকে যাচ্ছে।
এই প্লেটগুলো মসৃণভাবে না গিয়েই আটকে থাকে, ফলে জমতে থাকে চাপ। একবার সেই চাপ মুক্তি পেলে উৎপন্ন হবে ৯.০ বা তার চেয়েও বেশি মাত্রার একটি ভূমিকম্প।
গবেষণা বলছে, এই ধরনের বড় ভূমিকম্প ৪৫০–৫০০ বছর পরপর ঘটে। শেষবার ঘটেছিল ১৭০০ সালে। তাই এখন সেই বিপর্যয়ের সময় যে এসে গেছে, তা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিসমিক হ্যাজার্ড মডেল অনুযায়ী, আগামী ৫০ বছরের মধ্যে ৮.০ মাত্রার বা তার বেশি ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা ১৫ শতাংশ।
এমন একটি ভূমিকম্পে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৫,৮০০ মানুষ সরাসরি প্রাণ হারাবে এবং সুনামিতে আরও ৮,০০০ জনের মৃত্যু হতে পারে।
আহত হবে এক লাখের বেশি মানুষ, আর ধ্বংস হবে ৬ লাখ ১৮ হাজারের বেশি ভবন, যার মধ্যে ২,০০০ স্কুল ও ১০০টি জরুরি অবকাঠামো অন্তর্ভুক্ত। সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতি: ১৩৪ বিলিয়ন ডলার।
কিন্তু বিপদ এখানেই শেষ নয়। গবেষণায় বলা হয়েছে, ভূমিকম্পের ফলে ২৪টি নদী মোহনায় ০.৭৬ থেকে ৮.৭৬ ফুট পর্যন্ত ভূমি স্থায়ীভাবে নিচে নেমে যাবে—এই ‘subsidence’ বা ভূমিধসের ফলে ৩০০ বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা নতুন করে বন্যাপ্রবণ হয়ে উঠবে।
এতে হাজার হাজার ঘরবাড়ি, রাস্তা, হাসপাতাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ডুবে যাবে। সেইসঙ্গে লবণাক্ত পানির ঢুকে পড়ায় কৃষিজমি হবে অনুর্বর, এবং প্রাকৃতিক বন্যা প্রতিরক্ষা যেমন জলাভূমি বিলীন হয়ে যাবে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, যদি এই ভূমিকম্প ২১০০ সালে ঘটে, তখন ক্ষয়ক্ষতি আরও ভয়াবহ হবে। কারণ তখন পর্যন্ত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আরও ৬০ সেন্টিমিটার বাড়বে।
তখন একই সঙ্গে ভূমিকম্পের ভূমিধস ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বন্যাপ্রবণ এলাকা ৩৭০ বর্গকিলোমিটারে পৌঁছাবে—আজকের তুলনায় তিনগুণ বেশি।
গবেষণার প্রধান লেখক প্রফেসর টিনা ডুরা বলেন, “বছরে ৩-৪ মিলিমিটার করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে বলে আমরা আলোচনা করি, কিন্তু এখানে তো একেবারে ২ মিটার বেড়ে যাবে মিনিটের মধ্যে। এত বড় ঝুঁকি নিয়ে আমরা কথা বলি না কেন?”
সমাধান নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি।
ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও অবকাঠামোকে সরিয়ে নেওয়া, নতুন মানচিত্রে এই গবেষণার তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা, জনগণের মাঝে সচেতনতা বাড়ানো এবং প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা যেমন জলাভূমি পুনরুদ্ধার করার কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া নতুন নির্মাণকাজে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিয়ন্ত্রণ আনা দরকার।
যদিও পরিস্থিতি ভয়াবহ, বিজ্ঞানীরা আশা ছাড়ছেন না। প্রফেসর ডুরা বলেন, “অনেকেই এই বিষয় নিয়ে কাজ করছেন, তবে আমাদের আরও মানুষ, আরও সম্পদ এবং আরও সমন্বিত প্রচেষ্টা দরকার।
কারণ ঘড়ির কাঁটা চলছে। সময় শেষ হওয়ার আগেই আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে।” তথ্যসূত্র : বিবিসি সাইন্স ফোকাস