সমকালীন পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা ও অনিশ্চিত বৈশ্বিক অর্থনীতি মানুষকে এক অন্তহীন প্রতিযোগিতার বলয়ে আবদ্ধ করে রেখেছে। ফলে আধুনিক এই যুগের বেশির ভাগ মানুষ ভবিষ্যত্ নিয়ে উত্কণ্ঠায় ভুগছে। মানুষ তার রিজিক, পেশাগত অবস্থান ও বৈষয়িক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছে।
কেউ কেউ হারিয়ে ফেলছে নিজের দ্বীন, নীতি, নৈতিকতা-সব। এই অতৃপ্তি ও সার্বক্ষণিক দুশ্চিন্তার প্রধান কারণ হলো চিন্তা-চেতনাকে কেবল নশ্বর পার্থিব জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা। অথচ ইসলাম মুমিনের সব চিন্তা দুনিয়াকেন্দ্রিক হওয়া নিষেধ, এর ফলে দুনিয়া-আখিরাত দুটোই হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নিম্নে এ বিষয়ে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হলো;
দুনিয়াকেন্দ্রিক চিন্তার পরিণতি ও হাদিসের সতর্কবাণী
মানুষ যখন আখিরাতের চিরস্থায়ী জীবনের কথা ভুলে সমস্ত শ্রম ও উত্কণ্ঠা পার্থিব প্রাপ্তির পেছনে ব্যয় করে, তখন তার অন্তরের প্রশানি্ত চিরতরে বিনষ্ট হয়ে যায়। মানুষ এই কুল ওকুল দুকুলই হারায়। পার্থিব বিষয়কে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানানোর পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তির একমাত্র চিন্তা হবে আখিরাত, আল্লাহ তার অন্তরে প্রাচুর্য সৃষ্টি করবেন এবং তার সামগ্রিক বিষয়গুলোকে গুছিয়ে দেবেন, তখন দুনিয়াটা তার কাছে অপদস্থ হয়ে আসবে। পক্ষান্তরে যার একমাত্র লক্ষ্য বা চিন্তা হবে দুনিয়া, আল্লাহ তার দুই চোখের সামনে দারিদর্্য এঁকে দেবেন এবং তার সামগ্রিক বিষয়গুলোকে এলোমেলো ও বিশৃঙ্খল করে দেবেন; আর দুনিয়ার ততটুকুই সে পাবে, যতটুকু তার তকদিরে নির্ধারিত রয়েছে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৬৫)
অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও ইরশাদ করেছেন, Èযে ব্যক্তি তার যাবতীয় চিন্তাকে এক চিন্তায় অর্থাত্ আখিরাতের চিন্তায় পরিণত করবে, আল্লাহ তার দুনিয়ার সকল চিন্তার জন্য যথষ্টে হবেন। আর যে ব্যক্তি দুনিয়ার নানা প্রকার চিন্তায় নিজেকে নিমজ্জিত রাখবে, সে যে কোনো প্রান্তরে ধ্বংস হোক না কেন, আল্লাহ তাআলার তাতে কিছু যায় আসে না।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৫৭)
এই মূলনীতি স্পষ্ট করে যে, বৈষয়িক চিন্তাকে প্রাধান্য দেওয়া অন্তরে দারিদর্্যের ভয় বৃদ্ধি করা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারে না। তাই মহান আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে দুনিয়ার জীবনকে হালাল ভাবে পরিচালনার পাশাপাশি আখিরাতের জীবনের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
তাওয়াক্কুলের হাকিকত ও শরয়ী তাত্পর্য
তাওয়াক্কুল শব্দটা শুনলে অনেকে মনে করে, কোনো কাজ না করে মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে বসে থাকা। বিষয়টা এমন নয়। তাওয়াক্কুল অর্থ কেবল হাত গুটিয়ে বসে থাকা কিংবা বৈষয়িক কার্যকারণ (আসবাব) ত্যাগ করা নয়। ফিকহি ও আকিদাগত দৃষ্টিতে তাওয়াক্কুল হলো, উপযুক্ত উপায়-উপকরণ অবলম্বন করার পর ফলাফলের জন্য সামগ্রিকভাবে আল্লাহর ফায়সালার ওপর নির্ভর করা। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, Èআর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) করে, তার জন্য তিনিই যথষ্টে। (সুরা ত্বালাক, আয়াত : ৩)
উপায় অবলম্বন এবং তাওয়াক্কুলের সমন্বয় বুঝিয়ে দিতে গিয়ে আল্লাহর রাসুল (সা.) এক বেদুইনকে বলেছিলেন, Èতুমি সেটা (উটটিকে) রশি দিয়ে বাঁধো, তারপর আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করো।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৫১৭)
অতএব, উপায় উপকরণ অবলম্বন না করে, ঘরে বসে থাকার নাম তাওয়াক্কুল নয়। দুনিয়া মানুষের জন্য পরীক্ষাগার। এখানে মহান আল্লাহ তার বান্দাদের বিভিন্ন ভাবে পরীক্ষা করবেন, সেসব পরীক্ষায় মহান আল্লাহর আনুগত্যের পাশাপাশি আখিরাতের প্রস্তুতি নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ এবং সব অনিশ্চয়তাকে জয় করার মাধ্যম।
ভবিষ্যত্ নিয়ে অতিচিন্তা থেকে বের হয়ে আসার একটি শক্তিশালী পন্থা হলো, তাওয়াক্কুলের চর্চা করা এবং পার্থিব মোহের ঊর্ধ্বে উঠে আখিরাতকে প্রাধান্য দেওয়া। একজন সচেতন মুমিন বর্তমানের দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করবে, জীবিকার বৈধ সংস্থান করবে, কিন্তু তার অন্তরের চাবিকাঠি সঁপে দেবে তার মহান রবের কাছে। পার্থিব ক্ষণস্থায়ী অর্জনের ভয়কে পেছনে ফেলে চিরস্থায়ী আখিরাতের পাথেয় সঞ্চয় করাই মুমিনের জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। কারণ দুনিয়ার জীবনে মানুষ তার জন্য বরাদ্দকৃত রিজিকের বেশি একটুও অর্জন করতে পারবে না। কিন্তু কেউ যদি আল্লাহর ওপর ভরসা করে আখিরাতকে প্রাধান্য দেয়, তবে মহান আল্লাহ তাদের জন্য ইহকালীন শানি্ত ও পরকালীন মুক্তির পথ উন্মুক্ত করে দেন।