ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনের প্রভাব এখন সরাসরি পড়তে শুরু করেছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। চার দিনব্যাপী এই সংঘাতে ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। আর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সরবরাহ অনিশ্চয়তা নিয়ে। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া, সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা এবং সমুদ্রগামী তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজে আক্রমণের ঘটনায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশেও। আমদানি পরিকল্পনায় থাকা দুটি এলএনজিবাহী জাহাজ অনিশ্চয়তায় পড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এখান থেকেই সংকটের শুরু হতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এলএনজি না এলে গ্যাস সরবরাহ কমে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। তখন লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে কর্মকর্তারা জানান, পরিস্থিতি সামাল দিতে কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বেশি চালানোর চেষ্টা করা হবে। যদিও এটি ব্যয়বহুল সমাধান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, মার্চ মাসে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা কম থাকলেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এপ্রিল থেকে এলএনজি, জ্বালানি তেল বা অন্যান্য জ্বালানির সরবরাহ কমে যেতে পারে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ও সরবরাহের প্রস্তুতি জানতে চাইলে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম
অমিত গতকাল মন্ত্রণালয়ে আমাদের সময়কে বলেন, আমাদের এখনও তেমন সংকট নেই। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। আলাপ-আলোচনা করছি। সংকট থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।
গ্যাস ও এলএনজি নিয়ে উদ্বেগ
জ্বালানি বিভাগের সচিব মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে আপাতত সমস্যা নেই। তবে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হলে চাপ তৈরি হতে পারে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ৬৭ ডলার থেকে বেড়ে ৮২ ডলারে উঠেছে। দাম আরও বাড়লে সরকারের ভর্তুকি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে।
তিনি জানান, চীনভিত্তিক ট্রেডারদের সঙ্গে ছয় মাসের চুক্তির আওতায় মার্চ ও এপ্রিলের চালান নিয়ে প্রাথমিক নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। তবে এলএনজি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বেশি। বাংলাদেশের বড় অংশের এলএনজি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে কাতার থেকে আসে। এ ছাড়া ওমানভিত্তিক ট্রেডিং কোম্পানির মাধ্যমে কাতার, অস্ট্রেলিয়া ও আজারবাইজান থেকেও এলএনজি আসে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মার্চে আংশিক এবং এপ্রিল থেকে বড় সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মার্চ-এপ্রিলে ঝুঁঁকি
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, মার্চে নির্ধারিত ৯টি এলএনজি কার্গোর মধ্যে ২টি অনিশ্চিত। এতে প্রতিদিন প্রায় ২০০-২২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যেতে পারে। বর্তমানে গড়ে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হলেও তা ৭০০ মিলিয়নে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। গ্যাসের ঘাটতি হলে শিল্পখাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরবরাহ দেওয়া হবে। আবাসিক খাতে সরবরাহ সমন্বয় করা হতে পারে।
এদিকে এলপিজি বাজারেও সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। কারণ এই খাত প্রায় পুরোপুরি বেসরকারি আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আমদানিকারকরা সরবরাহ কমাতে পারেন। যদিও সম্প্রতি বিপিসিকেও এলপিজি আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ মনে করছে, বিশ্ববাজারে এলপিজির দাম বেড়ে যাওয়া এবং জাহাজ ভাড়াসহ অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় যদি বেসরকারি মালিকরা আমদানি না করে, তবে অবশ্যই সংকট তৈরি হবে। এ বিষয়ে জ্বালানি সচিব বলেন, এলপিজি মূলত বেসরকারি খাতে আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আমদানিকারকরা কম আনতে পারে এমন আশঙ্কা রয়েছে। তবে ইতোমধ্যে প্রায় ১ লাখ ৯৮ হাজার টন এলপিজি দেশে এসেছে বলে জানা গেছে।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে এলএনজি আমদানির সংকট তৈরি হলে সরকার বিকল্প হিসেবে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির বিষয়ে ভাবছে। তবে স্পট মার্কেটে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে দেশের অর্থনীতিতে ভর্তুকির চাপ এবং আর্থিক চাপ বাড়বে। এদিকে জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এমন বলা যাবে না। তবে বৈশ্বিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক চাপ বাড়বে।
বিদ্যুৎ খাতে চাপ
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত হতে পারে। বিপিডিবি পেট্রোবাংলার কাছে ১,২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস চেয়েছে। কিন্তু সরবরাহ কমে গেলে ঘাটতি বাড়বে।
বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানান, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে একটি ছাড়া সব কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র চালু রয়েছে।
গ্যাস সংকট তীব্র হলে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার এসব কেন্দ্রের মালিকদের কাছে সরকারের প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। বকেয়া পরিশোধ না হলে উৎপাদন অব্যাহত রাখা কঠিন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বিকল্প ভাবনা
সরকার স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির সম্ভাবনাও যাচাই করছে। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা, যায় ইরান যুদ্ধে গ্রীষ্মকালীন সময়ে বিশেষ করে দেশে মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে (দীর্ঘমেয়াদে, স্বল্পমেয়াদে ও স্পট মার্কেট হতে) পর্যায়ক্রমে মোট ৯টি, ১১টি ও ১১টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। তবে মার্চের ৯টি কার্গোর মধ্যে ইতোমধ্যে দুটি কার্গো আসা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
মার্চ মাসে কাতার এনার্জি, কাতার এনার্জি ট্রেডিং, ওমান ট্রেডিং এবং এক্সিলারেট হতে যথাক্রমে ৭টি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। যার মধ্যে ৬টি কাতার হতে (যা হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে) এবং ১টি অ্যাঙ্গোলা, আফ্রিকা হতে আমদানি করা হবে। উল্লেখ্য, মার্চ মাসের ৬টির মধ্যে ৩টি কার্গো ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে বলে জানা গেছে। এদিকে এপ্রিল মাসে কাতার এনার্জি, কাতার এনার্জি ট্রেডিং, ওমান ট্রেডিংয়ের মাধ্যে দুটি চুক্তির আওতায় ওমান ট্রেডিং এবং এক্সিলারেট হতে পর্যায়ক্রমে মোট ৬টি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে; যার মধ্যে ৫টি কাতার হতে (যেগুলো মূলত হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে) এবং ১টি অ্যাঙ্গোলা, আফ্রিকা হতে আমদানি করা হবে।
মে মাসে কাতার এনার্জি, কাতার এনার্জি ট্রেডিং এবং দুটি চুক্তির আওতায় ওমান ট্রেডিং এবং এক্সিলারেট হতে পর্যায়ক্রমে মোট ৯টি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে; যার মধ্যে ৭টি কাতার হতে (যা হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে) এবং ১টি অ্যাঙ্গোলা, আফ্রিকা ও ১টি যুক্তরাষ্ট্র হতে আমদানি করা হবে। পেট্রোবাংলা বলছে, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আগামী তিন মাসে (মার্চ-৬টি, এপ্রিল-৫টি ও মে-৭টি) মোট ১৮টি কার্গো কাতার হতে হরমুজ প্রণালি হয়ে আসবে, যার ক্ষেত্রে বর্তমান পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এক্ষেত্রে উল্লিখিত ৫টি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে এলএনজি কার্গো সরবরাহে তাদের অবস্থান কি হবে সেটা জানতে চেষ্টা করছে সরকার। পাশাপাশি স্পট মার্কেট হতে এলএনজি আমদানির সম্ভাব্যতাও যাচাই করছে। পেট্রোবাংলা বলছে, মার্চ মাসের ৬টির মধ্যে ৩টি কার্গো ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।
পেট্রাবাংলা জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে তাদের এলএলজি আমদনির পরিকল্পনা তুলে ধরে বলেছে, স্বল্পমেয়াদি এলএনজি আমদানি পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে মার্চ মাসে ওমান ট্রেডিং ও আরামকো হতে একটি করে মোট ২টি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ দুটি কার্গোই অস্ট্রেলিয়া হতে আমদানি করা হবে।
এপ্রিল মাসে ওমান ট্রেডিং ও আরামকো হতে একটি করে পর্যায়ক্রমে ২টি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। যার মধ্যে ১টি কাতার হতে (যা হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে) এবং ১টি কোন দেশ হতে ও কোন রুটে হতে আসবে তা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করেনি ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান।
?মে মাসে ওমান ট্রেডিং ও আরামকো হতে ২টি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। যার মধ্যে ১টি কাতার হতে (যা হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে) এবং ১টি কোন দেশ হতে ও কোন রুটে হতে আসবে তা এখনও নিশ্চিত নয়। সূত্রে জানা যায়, সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার স্পট মার্কেট হতে এলএনজি আমদানি দ্রুত সম্ভাব্যতা যাচাই করতে নির্দেশ দিয়েছে। যার মধ্যে এপ্রিল মাসে স্পট মার্কেটের আওতায় ৩টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে।