দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গ্রেপ্তার সাতক্ষীরা-৪ আসনের বিতর্কিত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের জামিন শুনানি করছিলেন তার আইনজীবীরা। তবে পরিচয় বলার সময় নিজেকে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয় দিতে আইনজীবীকে বলেন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এমপি নজরুল।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টা ১০ মিনিটের দিকে হাজতখানা থেকে তাদের মাথায় হেলমেট, বুকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এহসানুল ইসলামের আদালতে তোলা হয়। এসময় ভিড় ঠেলে আদালতের ৫ তলায় তাদের তোলা হয়। ৩টা ১৬ মিনিটের দিকে মামলার শুনানি শুরু হয়।
শুনানিতে তদন্ত কর্মকর্তা ও শেরেবাংলা নগর থানার এসআই মো. শামসুজ্জোহা তাদের ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে যুক্তি তুলে ধরেন। এসময় আসামিদের পক্ষে অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান রিমান্ড বাতিল করে জামিন চেয়ে বলেন, ‘আসামি নজরুল চারবারের সংসদ সদস্য। সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। তার স্ত্রী আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু তিনি নির্দোষ। তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের কোনো প্রয়োজন নেই। ন্যায়বিচারের স্বার্থে রিমান্ড বাতিল করে তাদের জামিন দেয়া হোক।’
মাথায় সাদা টুপি ও মুখে মাস্ক দিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে শুনানি শুনছিলেন নজরুল ইসলাম। এসময় তিনি তার পক্ষের আরেক আইনজীবীকে ডেকে বলেন, ‘সে তো বীর মুক্তিযোদ্ধার কথা বলেনি।’
পরবর্তীতে শুনানিতে মাহবুবুর রহমান বলেন, নজরুল ইসলাম একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি রাষ্ট্রের একজন আইনপ্রণেতা। ৭৫ বছরের একজন বয়স্ক মানুষ। একটা ঘটনা ঘটে গেছে। তিনি একজন হার্টের রোগী। তিনি পালানোর লোক নন। তাকে জামিন দিন। তিনি যেকোনো সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছেন।
এদিকে আত্মহত্যার সময় কোর্টে ছিলেন জানাতে আইনজীবী ডেকে নজরুল ফের বলতে বলেন, ‘রোববার আমি কোর্টে মামলার কাজে ছিলাম।’
অন্যদিকে রিমান্ডের জোর দাবি জানিয়ে শুনানি করে রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী আদালতে বলেন, ‘ওনারা জামায়াতের ইসলামী। জামায়াতের নেতারা বলেন, সৎ লোকের শাসন। এটা তার সেই নমুনা।’
পিপি আরও বলেন, ‘আসামি নজরুল বাদীর শ্যালককে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে মরহুমা নজরুলকে কবজায় নেয়। এরপর নজরুল তার মরহুমা মরিয়মকে হোটেলে নিয়ে যায় এবং যে অসামাজিক কার্যকলাপ করে তা পুরো জাতি দেখেছে।’
ফারুকী বলেন, ‘মরিয়মের মৃত্যুর পর সেখানে সুইসাইড নোট পাওয়া গেছে। কেন সে মারা গেল দ, সেখানে তা পাওয়া গেছে। চিঠিতে আছে তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে। এজন্য তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। আইন সবার জন্য সমান। তার সর্বোচ্চ রিমান্ড দাবি করছি।’ উভয়পক্ষের শুনানি নিয়ে আদালত নজরুল ইসলামকে চার দিন এবং মাকছুদা বেগমের একদিনের রিমান্ডের আদেশ দেয়।
গত রোববার সন্ধ্যায় সংসদ ভবনের উল্টোদিকের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর রাতে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে হেফাজতে নেয় পুলিশ।
রাতেই আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, তার স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম ও নিহতের মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেন মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ। এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে এদিন দুপুরে শেরেবাংলা নগর থানা থেকে দুই আসামিকে আদালতে নেওয়া হয়।
মামলার এজাহারে মাসুম বিল্লাহ অভিযোগ করেছেন, গত জুনে তার শ্যালক ওবায়দুর রহমানের ‘প্রত্যক্ষ প্ররোচনায়’ সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের সঙ্গে বাদীর বড় মেয়ে মরিয়মের (১৯) বিয়ে হয়। সংসদ ভবনের বিপরীত পাশে ৫ নম্বর ন্যাম ভবনের ২০৩ নম্বর বাসায় নজরুল ও মাকছুদার সঙ্গে থাকতেন মরিয়ম।
এজাহারে বলা হয়, বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নজরুল ও মাকছুদা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন বলে মরিয়ম তার পরিবারকে বলে গেছেন। এর মধ্যে রোববার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে নজরুল মোবাইল ফোনে বাদীকে দ্রুত বাসায় যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে মরিয়মকে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে থাকতে দেখেন বাবা মাসুম বিল্লাহ।
রোববার বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৫টার মধ্যে মরিয়ম আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন বলে এজাহারে বলা হয়েছে। মাসুম বিল্লাহ এজাহারে জানিয়েছেন, মরদেহ উদ্ধারের সময় মেয়ের বিছানার ওপরে তার লেখা ‘সুইসাইড নোট’ দেখতে পান।
একটি চিরকুটে লেখা আছে, ‘শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই… তা না হলে যতটা সস্তা ভাবছো ততটা সস্তা আমি নই…।’
আরেকটিতে লেখা, ‘আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সাথে, জিততে পারিনি হেরে গেলাম ময়দানে। জিতবইবা কেমনে, যুদ্ধের শেষ প্রান্তে যেয়ে দেখি তুমিতো ছিলে বিপক্ষের সেনাপতি।’
অপর একটিতে লেখা, ‘আমি হেরেছি তুমি জিতেছো, কারণ আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছ। আমি ধ্বংসের শেষ দাঁড়িয়েও মুখে হাসি রেখেছি। ভেবে নাও এই হাসির কারণই হবে তোমার ধ্বংসের কারণ।’
আরেকটি চিরকুটে আছে দুটি লেখা। একটিতে আছে, ‘সে ছিল অন্য নারীর স্বামী। কাগজে কলমে অধিকার ছিল তার বউয়ের…!!! আর আমি ছিলাম বোকা…!!! অন্য কারও স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ…!!!’
অপর লেখায় আছে, ‘কাউকে অর্ধেক পাওয়ার চেয়ে হারিয়ে ফেলা বেশির সম্মানের। কারণ ভালোবাসা কখনোই ভাগ করে নেওয়ার বিষয় নয়… ভালোবাসা হয় সম্পূর্ণ, না হয় অপূর্ণ!’
এর আগে, গত ২০ জুলাই রাতে ঢাকার মগবাজারের একটি হোটেলে মরিয়মের সঙ্গে এমপি নজরুলের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এ বিষয়ে প্রথমে জামায়াতের নেতাকর্মীরা এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বলে দাবি করেন।