বাংলা ও বিশ্বের সকল খবর এখানে
শিরোনাম

৭ মার্চের ভাষণ বিশ্ব ঐতিহ্য হলো যেভাবে

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ এখন বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য। ইউনাইটেড নেশন্স এডুকেশন, সায়েন্স অ্যান্ড কালচারাল অরগানাইজেশন (ইউনেস্কো) ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর এ ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে। ৭ মার্চের ভাষণের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সমগ্র বাঙালি জাতির জন্য গৌরব ও আনন্দের। এ স্বীকৃতির ফলে কালোত্তীর্ণ ভাষণটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ন্যায় ও মুক্তির পথে এগিয়ে চলতে উজ্জীবিত করবে।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু এই ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের সাবেক প্রধান তথ্য কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্বপালনকালে ৭ মাচের্র ভাষণ ও এর ইতিহাস সংগ্রহের উদ্যোগ নেন। তিনি এর ওপর একটি প্রামাণ্য পুস্তিকাও প্রকাশ করেন। এরপর তিনি বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের মহাপরিচালক হিসেবে বদলি হন। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের মহাপরিচালক হিসেবে তিনি ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য ২০১৫ সালে ইউনেস্কোতে প্রস্তাব পাঠান। একই সময়ে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক মোহাম্মদ লিয়াকত আলী খানও ইউনেস্কোতে পৃথক একটি প্রস্তাব পাঠান। ২০১৬ সালের মার্চ মাসে এই উদ্যোগের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এবং সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পৃক্ত হয়। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ফ্রান্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও ইউনেস্কোর স্থায়ী প্রতিনিধি শহীদুল ইসলামকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল’ রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্তির জন্য ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। এরপর তথ্য মন্ত্রণালয় ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সঙ্গে পরামর্শ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্বের অন্যতম দালিলিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য ইউনেস্কোতে আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন প্রস্তাব পাঠায়। এসব প্রস্তাব দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ইউনেস্কো আনুষ্ঠানিকভাবে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে। বিশ্বের নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের মুক্তির পথপ্রদর্শক হিসেবে এ ভাষণ প্রেরণা জোগাবে। বিশ্ববাসী যুগের পর যুগ বাঙালি জাতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস জানতে আগ্রহী হবে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ। এ ভাষণ ধারণ ও সংরক্ষণে তৎকালীন ফিল্ম ডিভিশন, বর্তমানের চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর (ডিএফপি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিচালক (চলচ্চিত্র) মহিব্বুর রহমান খায়ের (প্রয়াত অভিনেতা আবু খায়ের), পরিচালক জিজেডএমএ মোবিন, ক্যামেরাম্যান এমএ রউফ, ক্যামেরাম্যান আমজাদ আলী খন্দকার, সহকারী ক্যামেরাম্যান এসএম তৌহিদ বাবু, সহকারী ক্যামেরাম্যান সৈয়দ মইনুল হাসান, সহকারী ক্যামেরাম্যান হাবিব চোকদার ও লাইট বয় জুনায়েদ আলী ৭ মার্চের ভাষণটি ধারণ করতে সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। তাদের সাহসী ভূমিকার কারণে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের অডিও-ভিডিও ধারণ করা সম্ভব হয়। ৭ মার্চের ভাষণ, জাতিসংঘে প্রদত্ত ভাষণসহ বঙ্গবন্ধুর অন্য যেসব ভাষণের ভিডিও ফুটেজ পাওয়া যায়, তার প্রায় সবই চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের চলচ্চিত্র শাখার কলাকুশলীদের ধারণকৃত।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতের পর চলচ্চিত্র বিভাগের তৎকালীন পরিচালক মহিব্বুর রহমান খায়ের আশঙ্কা করেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ৭ মার্চের ভাষণটির কপি বিনষ্ট করে ফেলতে পারে। সাবেক সহকারী ক্যামেরাম্যান আমজাদ আলী খন্দকার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সারা ঢাকা শহরে গণহত্যা শুরু করার মাত্র কয়েক দিন পর আমি ঢাকায় ফিরে আসি। সেদিনই ওই বিভাগের পরিচালক মহিব্বুর রহমান খায়ের আমাকে একটি ৪২ ইঞ্চি ট্রাংক আনতে বলেন। এই নির্দেশটি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ ও জীবনমরণ সমস্যা। তখনও রাস্তা থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী উঠে যায়নি। রাস্তার মোড়ে মোড়ে জলপাই রঙের আর্মি জিপের ওপর এলএমজি লাগিয়ে জনতার দিকে তাক করে বসে আছে।’ এমন এক পরিস্থিতিতে তিনি ভাষণের মূলকপি ও অডিও রেকর্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ ফুটেজ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে ফেলার উদ্যোগ নেন।’ খায়ের সাহেব নিজেই এসব অন্যত্র সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। এ সময়ে ফিল্ম ডিভিশনের অফিস ছিল সচিবালয়ের ভেতরের টিনশেডে। এপ্রিল মাসের শুরুতে ৪২ ইঞ্চি মাপের স্টিলের ট্রাংকে অতি গোপনে ভরা হলো বাংলার গৌরব, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ, ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষণ ও শেখ মুজিবুর রহমানের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রামাণ্যচিত্র। ২৫ মার্চের দুর্যোগের ১৭ দিন পরও হানাদাররা বাঙালিদের দাবিয়ে রাখতে ব্যস্ত। চারদিকে বিপদের আশঙ্কা।

খায়ের সাহেব নিজেও বুঝতে পারছিলেন অতি দ্রুত আমজাদ আলী খন্দকারকে ঢাকা থেকে যদি বের হতে না পারেন, তবে তিনি দুনিয়া থেকেই বের হয়ে যেতে পারেন। সেই সঙ্গে বাংলার স্বাধীনতার দলিল বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার দলিল পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে পড়ে জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যাবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাপূর্ব কোনো ইতিহাস আর থাকবে না।

আমজাদ আলী খন্দকার ১৯৭১ সালের ৯ এপ্রিল ভাষণের অডিও-ভিডিও ফুটেজসহ স্টিলের ট্রাংকটি বুড়িগঙ্গা নদীর অপর পাড়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে বেবিট্যাক্সিতে করে সোয়ারিঘাটে যান। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কড়া টহলের মধ্যেও আমজাদ আলী খন্দকার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জিঞ্জিরা হয়ে মুন্সীগঞ্জের জয়পাড়ায় মজিদ দারোগা বাড়িতে ট্রাংকটি নিয়ে যান। এর পেছন পেছন চলচ্চিত্র বিভাগের পরিচালক মহিব্বুর রহমান খায়েরও সেখানে যান। তারা ভাষণের রিল ও অন্যান্য ডকুমেন্টভর্তি ট্রাংকটি অত্যন্ত গোপনে সেখানে লুকিয়ে রাখেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেখান থেকে ট্রাংকটি এনে আবার অফিসের স্টোরে সংরক্ষণ করা হয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনককে নির্মমভাবে হত্যা করার পর ষড়যন্ত্রকারীরা ৭ মার্চের ভাষণের রিল নষ্ট করার লক্ষ্যে চলচ্চিত্র বিভাগে তল্লাশি চালায়। চলচ্চিত্র শাখার নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা ভাষণের মূল পিকচার নেগেটিভ ও সাউন্ড নেগেটিভসহ অন্যান্য ফুটেজ ভিন্ন একটি ছবির ক্যানে ঢুকিয়ে ফিল্ম লাইব্রেরিতে লুকিয়ে রাখেন। ষড়যন্ত্রকারীরা ৭ মার্চের ভাষণ মনে করে অন্য রিল নষ্ট করে আশ্বস্ত হয় যে, ভাষণটি বিনষ্ট করা হয়েছে। এভাবেই ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে রক্ষা করা সম্ভব হয়। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ধারণের স্মৃতিবাহী শব্দধারণ যন্ত্র বা নাগ্রা মেশিন এবং টু-সি ক্যামেরাটি এখনও চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে সংরক্ষিত আছে।

লাইটনিউজ/এসআই