বাংলা ও বিশ্বের সকল খবর এখানে
শিরোনাম

করোনা ভাইরাস: ইসলামের আলোকে একটি বিশ্লেষণ

আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে অতি উত্তম আকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। রোগ-ব্যধি বা সমূহ বিপদাপদ দিয়ে ধ্বংস করার জন্য তিনি সৃষ্টি করেননি। এ পৃথিবীতে মানুষকে তিনি একমাত্র তাঁরই উপাসনা-আরাধনা করতে পাঠিয়েছেন। মানুষকে তিনি তাঁর খলিফা বা প্রতিনিধিত্বের মর্যাদায়ও ভূষিত করেছেন। মানুষ আল্লাহর নির্দেশিত বাণী পবিত্র আলকুরআন অনুযায়ী ও তাঁর প্রেরিত শেষ পয়গম্বর মুহাম্মদ সা. এর প্রদর্শিত পথে সঠিকভাবে চলবে; যেন ইহকালে শান্তি ও পরকালে মুক্তি পায়। ইসলামের এই পথই হলো সত্যের পথ, মুক্তির পথ ও আলোর পথ। এ আলোকিত পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে মানুষ যখন নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে ছুটবে ও বস্তুবাদী ধ্যান-ধারণার মোহে, দুনিয়াবী সফলতা লাভের খায়েশে বা সাম্রাজ্যবাদী চেতনায় অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়; তখনই বান্দাকে সঠিক পথে আনার জন্যে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন রোগ-শোক ও বিপদাপদ দেন। যেন মানুষ আবার তার ভুল বুঝতে পারে; মহান রবের পথে ফিরে আসতে পারে। এই রোগ আমাদের গুনাহের কারণে হতে পারে।

কারণ আল্লাহ তায়ালা বলেছেনঃ ظهر الفساد في البر والبحر بما كسبت أيدي الناس অর্থাৎ ‘স্থলে বা জলে যে সব ফাসাদ বা অনিয়ম ও বিশৃংখলা প্রকাশ পায়, তা মানুষের হাতের কামাই।’ (৩০:৪১) কিন্তু তাই বলে কারো এই রোগ দেখা দিলে আমরা বলতে পারবো না ঐ লোকের পাপের কারণে এই রোগ হয়েছে। আমাদের পাপের কারণে রোগের প্রাদুর্ভাব হতে পারে, কারো হলে সেটা তার পাপের ফসল নয়। অনেক ছোট বাচ্চার এইডস হয়েছে, যারা কখনো সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড হবার সুযোগ পায়নি, তবে অন্যকোন ভাবে ভাইরাস তার দেহে ঢুকে গেছে। কাজেই দুনিয়ায় কোন মহামারি ছড়িয়ে পড়লে তাকে মহান আল্লাহর তাক্বদীর মনে করে নিতে হয়। তাক্বদীর হিসেবে মেনে নিয়ে নিজের বাসস্থানে শেষ পরিণতি ও মৃত্যু উভয়কে মেনে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়াই ঈমানের দাবী। রাসূলের সাহাবীদের জীবন পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে, তাঁরা এই মৃত্যুকে শহিদী মরণ হিসেবে আখ্যা দেন।

আয়শা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি মহানবী (সা) এর কাছে মহামারি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। তিনি বলেন, এটা এক ধরণের আযাব, যে জনগোষ্ঠির উপর আল্লাহ চান, পাঠায়ে থাকেন। তবে এটা মুমিনদের জন্য রহমত বানিয়ে দেন। যদি কোন বান্দার এই মহামারি ধরে ফেলে, এর পর ঐ শহরে ধৈর্য ধরে থাকে যে আল্লাহ, তার ব্যাপারে যা-ই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা-ই হবে। এরপরে ব্যক্তিটির মৃত্যু হলে শহিদের মত সাওয়াব পাবে। (বুখারি)। তবে এই সব মহামারি সম্পর্কে আমাদের একটা সতর্কবার্তা আমাদের নবী (সা) দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ لم تظهر الفاحشة في قوم قطُّ حتى يعلنوا بها إلا فشا فيهم الطاعون والأوجاع التي لم تكن في أسلافهم الذين مضوا، অর্থাৎ কোন জাতির মাঝে যদি অশ্লীল কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায়, এবং তারা তা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে করে, তা হলে আল্লাহ তাদের মাঝে মহামারি ছড়িয়ে দেন। এবং এমন সব রোগ দেন যা ইতিপূর্বের কোন জাতির মাঝে তা দেখা যায়নি। (ইবন মাজাহ, আব্দুল্লাহ ইবন উমার থেকে)। এই হাদীস আজকের যুগের মুসলিমদের জন্য খুবই উপকারী হতে পারে। আজ মহামারি হিসেবে করোনা ভাইরাস নামে যে রোগ আমাদের কাছে প্রকাশ পেয়েছে, তা কোন না কোন অশ্লীলতা ব্যাপকতার ফল।

ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি, হযরত মুসা আ. এর সম্প্রদায় চরম অবাধ্য হয়ে পড়েছিল। ফলশ্রুতিতে তাদের উপর বিভিন্ন বিপদ-আপদ নেমে আসে। এ প্রসঙ্গে আলকুরআনে এসেছে- ‘অতঃপর আমি তাদেরকে প্লাবন, পঙ্গপাল, উকুন, ভেক ও রক্ত দ্বারা ক্লিষ্ট করি। ইহা স্পষ্ট নিদর্শন; আর তারা দাম্ভিকই রয়ে গেলো; আর তারা ছিলো এক অপরাধী সম্প্রদায়’ (৭:১৩৩)। এ সীমাহীন বিপদে আক্রান্ত সম্প্রদায় এ সব আযাবে অসহ্য হয়ে সবাই মূসা আ. এর কাছে পাকাপাকি ওয়াদা করলো যে, তারা এ সমস্ত আযাব থেকে মুক্তি পেলে মূসা আ. এর উপর ঈমান আনবে। মূসা আ. দুআ করলেন, ফলে তারা এ সমস্ত আযাব থেকে মুক্তি পেল। কিন্তু যে জাতির উপর আল্লাহর আযাব চেপে থাকে, তাদের বুদ্ধি-বিবেচনা, জ্ঞান-চেতনা কোনো কাজ করে না। কাজেই এ ঘটনার পরেও আযাব থেকে মুক্তি পেয়ে এরা আবারও নিজেদের হঠকারিতায় আঁকড়ে বসলো এবং ঈমান আনতে অস্বীকার করলো।

এ প্রসঙ্গ বর্ণনা করতে গিয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘মহামারী এমন একটি শাস্তি যা আল্লাহ বনী ইসরাঈলের উপর পাঠিয়েছিলেন। সুতরাং যখন তোমরা শুনবে যে, কোথাও তা বিদ্যমান তখন তোমরা সেখানে যেও না। আর যদি মহামারি এলাকায় তোমরা থাক, তবে সেখান থেকে পালানোর জন্য বের হয়ো না’ (বুখারীঃ ৬৯৭৪, মুসলিমঃ ২২১৮)।

আমীরুল মুমিনিন হযরত উমর (রাঃ) এর শাসনামলে সাহাবীদের সময়ে একবার মহামারি প্লেগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। সিরিয়ায়-প্যালেস্টাইনে এ প্লেগে আক্রান্ত হয়ে শাহাদাতবরণ করেন অনেক সাহাবী। তার মধ্যে একজন ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী। উমর (রাঃ) সিরিয়ার উদ্দেশ্যে ৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে রওয়ানা হয়েছিলেন। ‘সারগ’ নামক জায়গায় পৌছার পর সেনাপতি আবু উবাইদাহ (রাঃ) খলিফাকে জানালেন, সিরিয়ায় তো প্লেগ দেখা দিয়েছে। উমর (রাঃ) প্রবীণ সাহাবীদেরকে পরামর্শের জন্য ডাকলেন। জানতে চেয়েছেন; এখন কী করবো? সিরিয়ায় যাবো নাকি যাবো না? সাহাবীদের মধ্য থেকে দুটো মত আসলো। একদল বললেন, “আপনি যে উদ্দেশ্যে বের হয়েছেন, সে উদ্দেশ্যে যান”। আরেকদল বললেন, “আপনার না যাওয়া উচিত”। তারপর আনসার এবং মুহাজিরদের ডাকলেন পরামর্শ দেবার জন্য। তারাও মতপার্থক্য করলেন। সবশেষে বয়স্ক কুরাইশদের ডাকলেন। তারা এবার মতানৈক্য করলেন না। সবাই মত দিলেন- “আপনার প্রত্যাবর্তন করা উচিত। আপনার সঙ্গীদের প্লেগের দিকে ঠেলে দিবেন না।” উমর (রাঃ) তাঁদের মত গ্রহণ করলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, মদীনায় ফিরে যাবেন। খলিফাকে মদীনায় ফিরে যেতে দেখে সেনাপতি আবু উবাইদাহ (রাঃ) বললেন, “আপনি কি মহান আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীর থেকে পালানোর জন্য ফিরে যাচ্ছেন?” আবু উবাইদাহর (রাঃ) কথা শুনে উমর (রাঃ) কষ্ট পেলেন। আবু উবাইদাহ (রাঃ) ছিলেন তাঁর এতো পছন্দের যে, আবু উবাইদাহ (রাঃ) এমন কথা বলতে পারেন উমর (রাঃ) সেটা ভাবেন নি। উমর (রাঃ) বললেন, “ও আবু উবাইদাহ! যদি তুমি ব্যতীত অন্য কেউ কথাটি বলতো! আর হ্যাঁ, আমরা আল্লাহর এক তাকদীর থেকে আরেক তাকদীরের দিকে ফিরে যাচ্ছি।” আল্লাহর এক তাকদীর থেকে আরেক তাকদীরের দিকে ফিরে যাওয়ার মানে কী?

উমর (রাঃ) সেটা আবু উবাইদাহকে (রাঃ) বুঝিয়ে বলেন, “তুমি বলতো, তোমার কিছু উটকে তুমি এমন কোনো উপত্যকায় নিয়ে গেলে যেখানে দুটো মাঠ আছে। মাঠ দুটোর মধ্যে একটি মাঠ সবুজ শ্যামল, আরেক মাঠ শুষ্ক ও ধূসর। এবার বলো, ব্যাপারটি কি এমন নয় যে, তুমি সবুজ মাঠে উট চরাও তাহলে তা আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ী চরিয়েছো। আর যদি শুষ্ক মাঠে চরাও, তা-ও আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ী চরিয়েছো।” অর্থাৎ, উমর (রাঃ) বলতে চাচ্ছেন, হাতে সুযোগ থাকা সত্বেও ভালোটা গ্রহণ করা মানে এই না যে আল্লাহর তাকদীর থেকে পালিয়ে যাওয়া। কিছুক্ষণ পর আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) আসলেন। তিনি এতক্ষণ অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি এসে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) এর একটি হাদীস শুনালেন। আর তা হলোÑ“তোমরা যখন কোনো এলাকায় প্লেগের বিস্তারের কথা শুনো, তখন সেখানে প্রবেশ করো না। আর যদি কোনো এলাকায় এর প্রাদুর্ভাব নেমে আসে, আর তোমরা সেখানে থাকো, তাহলে সেখান থেকে বেরিয়ে যেও না।” [সহীহ বুখারীঃ ৫৭২৯] রাসূলের (সাঃ) হাদীসটি সমস্যার সমাধান করে দিলো। উমর (রাঃ) হাদীসটি শুনে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। মদীনায় ফিরে উমর (রাঃ) আবু উবাইদাহকে (রাঃ) চিঠি লেখলেন। “আপনাকে আমার খুব প্রয়োজন। আমার এই চিঠিটি যদি রাতের বেলা আপনার কাছে পৌঁছে, তাহলে সকাল হবার পূর্বেই আপনি রওয়ানা দিবেন। আর চিঠিটি যদি সকাল বেলা পৌঁছে, তাহলে সন্ধ্যা হবার পূর্বের আপনি রওয়ানা দিবেন।” চিঠিটা পড়ে আবু উবাইদাহ (রাঃ) বুঝতে পারলেন। খলিফা চাচ্ছেন তিনি যেন প্লেগে আক্রান্ত না হন। অথচ একই অভিযোগ তো তিনি উমরকে (রাঃ) করেছিলেন।

প্রতিউত্তরে আবু উবাইদাহ (রাঃ) লেখেন- “আমিরুল মুমিনিন! আমি তো আপনার প্রয়োজনটা বুঝতে পেরেছি। আমি তো মুসলিম মুজাহিদদের মধ্যে অবস্থান করছি। তাদের মধ্যে যে মুসিবত আপতিত হয়েছে, তা থেকে আমি নিজেকে বাঁচানোর প্রত্যাশী নই। আমি তাদেরকে ছেড়ে যেতে চাইনা, যতোক্ষণ না আল্লাহ আমার ও তাদের মাঝে চূড়ান্ত ফয়সালা করে দেন। আমার চিঠিটি পাওয়ামাত্র আপনার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করুন এবং আমাকে এখানে অবস্থানের অনুমতি দিন।” চিঠিটি পড়ে উমর (রাঃ) ব্যাকুলভাবে কান্না করেন। তাঁর কান্না দেখে মুসলিমরা জিজ্ঞেস করলো, “আমিরুল মুমিনিন! আবু উবাইদাহ কি ইন্তেকাল করেছেন?” উমর (রাঃ) বললেন, “না, তবে তিনি মৃত্যূর দ্বারপ্রান্তে।” [আসহাবে রাসূলের জীবনকথা, আব্দুল মা’বুদ, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা ৯৩-৯৪] কিছুদিন পর আবু উবাইদাহ (রাঃ) প্লেগে আক্রান্ত হন। আক্রান্ত হবার অল্পদিনের মধ্যেই শাহাদাতবরণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “(প্লেগ) মহামারীতে মৃত্যু হওয়া প্রত্যেক মুসলিমের জন্য শাহাদাত।” [সহীহ বুখারীঃ ২৮৩০] আবু উবাইদাহ (রাঃ) ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী। আশারায়ে মুবাশশারার একজন। রাসূলের (সাঃ) ইন্তেকালের পর খলিফা নির্বাচনের প্রসঙ্গ উঠলে আবু বকর (রাঃ) আবু উবাইদাহ (রাঃ) কে প্রস্তাব করেন। উমর (রাঃ) ইন্তেকালের আগে কে পরবর্তী খলিফা হবেন এই প্রশ্ন উঠলে তিনি বলেন, “যদি আবু উবাইদাহ বেঁচে থাকতেন, তাহলে কোনো কিছু না ভেবে তাঁকেই খলিফা বানাতাম।” রাসূলুল্লাহ (সাঃ) প্লেগ সম্পর্কে বলেন, “এটা হচ্ছে একটা আজাব। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদের উপর ইচ্ছা তাদের উপর তা প্রেরণ করেন। তবে, আল্লাহ মুমিনদের জন্য তা রহমতস্বরূপ করে দিয়েছেন। কোনো ব্যক্তি যদি প্লেগে আক্রান্ত জায়গায় সওয়াবের আশায় ধৈর্য ধরে অবস্থান করে এবং তার অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস থাকে যে, আল্লাহ তাকদীরে যা লিখে রেখেছেন তাই হবে, তাহলে সে একজন শহীদের সওয়াব পাবে।” [সহীহ বুখারীঃ ৩৪৭৪]

আবু উবাইদাহর (রাঃ) ইন্তেকালের পর সেনাপতি হন রাসূলের (সাঃ) আরেক প্রিয় সাহাবী মু’আজ ইবনে জাবাল (রাঃ)। সবাই তখন প্লেগের আতঙ্কে ভীত-সন্ত্রন্ত। নতুন সেনাপতি হবার পর মু’আজ (রাঃ) একটা ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি বলেন-“এই প্লেগ আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো মুসিবত নয় বরং তাঁর রহমত এবং নবীর দু’আ। ‘হে আল্লাহ! এই রহমত আমার ঘরেও পাঠাও এবং আমাকেও এর যথেষ্ট অংশ দান কর।” [হায়াতুস সাহাবাঃ ২/৫৮২] দু’আ শেষে এসে দেখলেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয়পুত্র আব্দুর রহমান প্লেগাক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। ছেলে বাবাকে সান্ত্বনা দিয়ে কুরআনের ভাষায় বলেনঃ “আল-হাক্কু মির রাব্বিকা ফালা তাকুনান্না মিনাল মুমিতারিন- সত্য তোমার রবের পক্ষ থেকে। সুতরাং, তুমি কখনো সন্দেহ পোষণকারীর অন্তর্ভূক্ত হয়ো না।” [সূরা বাকারাঃ ২:১৪৭] পুত্রের সান্ত্বনার জবাব পিতাও দেন কুরআনের ভাষায়ঃ “সাতাজিদুনী ইন শা আল্লাহু মিনাস সাবিরীন- ইনশা আল্লাহ তুমি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবে।” [সূরা আস-সাফফাতঃ ৩৭:১০২] কিছুদিনের মধ্যে তাঁর প্রিয়পুত্র প্লেগে আক্রান্ত হয়ে শহীদ হন, তাঁর দুই স্ত্রী শহীদ হন। অবশেষে তাঁর হাতের একটা আঙ্গুলে ফোঁড়া বের হয়। এটা দেখে মু’আজ (রাঃ) প্রচণ্ড খুশি হন। অল্পদিনের মধ্যে তিনিও প্লেগে আক্রান্ত হয়ে শহীদ হন। [আসহাবে রাসূলের জীবনকথা, ৩/১৫১-১৫২]

করোনা ভাইরাস অনেক জায়গায় মহামারি আকার ধারণ করেছে। ১৫০টির বেশি দেশে করোনা ভাইরাসে এ যাবত আক্রান্ত ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ। মারা গেছে ৫ হাজার ৬ শতাধিক মানুষ। সারাবিশ্বে এখন আলোচিত বিষয় হলো করোনা ভাইরাস। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এর থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজতে ব্যস্ত। বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দর, স্টেশনগুলোতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি দেশই নিজের সীমান্ত সুরক্ষায় জোর দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ বিচ্ছিন্নতা আগামী জুন পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে পারে। কা’বা ঘরের তাওয়াফ সাময়িক স্থগিত রাখা হয়েছে (এখন সীমিত পর্যায়ে তাওয়াফ হচ্ছে)। সবমিলিয়ে পুরো বিশ্ব একটা আতঙ্কের মধ্যে আছে। ঠিক এই মুহূর্তে প্রশ্ন উঠছে- করোনা ভাইরাস কি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো আজাব? বিগত কয়েক মাসের চীন সরকারের মুসলিম বিদ্বেষী মনোভাব এবং মুসলিমদের উপর নির্যাতনের ফলে অনেকেই মনে করছেন, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে আজাব। চীন সরকার উইঘুরের মুসলিমদের যেমনভাবে নির্যাতন করেছে, মুসলিম আইডেন্টিটির জন্য তাদেরকে যেভাবে হয়রানি করা হচ্ছে, চীন সরকারের এই ‘অ্যাকশন’ এর জন্য একটা ‘রিঅ্যাকশনারি’ অবস্থান থেকে মুসলিমরা কেউ কেউ করোনা ভাইরাসকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আজাব বলে অভিহিত করছেন।

রাসূলুল্লাহর (সাঃ) হাদীস থেকে দেখতে পাই, প্লেগকে তিনি বলেছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে আজাব, আবার বলেছেন এটা মুমিনদের জন্য শর্তসাপেক্ষে রহমত। একই মহামারি ভাইরাস কারো জন্য হতে পারে আজাব, আবার কারো জন্য হতে পারে রহমত। তাই বলে, একে ঢালাওভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে আজাব কিংবা ঢালাওভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত বলার কোনো সুযোগ নেই। মহামারি ভাইরাস যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে আজাব হয়ে থাকে, তাহলে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী আল্লাহর আজাবে ইন্তেকাল করেছেন? সাহাবীদের বেলায় আল্লাহ সাধারণভাবে ঘোষণা করেছেন- ‘আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি।’ তাহলে সুহাইল ইবনে আমর, মু’আজ ইবনে জাবাল, ফদল ইবনে আব্বাস, ইয়াজিদ ইবনে আবি সুফিয়ান, আবু মালিক আশ’আরী (রাঃ) সাহাবীগণ আল্লাহর আজাবে নিপতিত হয়েছেন? উত্তর হচ্ছে- না। রাসূলের (সাঃ) হাদীস অনুযায়ী ঐ মহামারিকে তারা রহমত হিসেবে নিয়েছিলেন। মহামারিতে মৃত্যুবরণ করাকে তারা শাহাদাত হিসেবে দেখেছেন। যার ফলে মু’আজ ইবনে জাবাল (রাঃ) সেই রহমত পাবার জন্য দু’আ পর্যন্ত করেন।

মহামারি থেকে বাঁচার জন্য আমরা প্রতিওয়াক্ত নামাজ শেষে মহান আল্লাহর কাছে কায়মনোচিত্তে দু’আ করবো,اذهب الباس رب الناس ، واشف انت الشافى ، لا شفاء الا شفاؤك ، شفاء لا يغادرسقما

‘হে মানুষের প্রতিপালক। তুমি রোগ দূর করে দাও এবং আরোগ্য দান করো। তুমিইতো আরোগ্যদানকারী। তোমার আরোগ্য ভিন্ন আর কোনো আরোগ্য নেই। এমন আরোগ্য দাও, যারপর কোনো রোগ থাকে না।’ [বুখারী, হাদীস নং- ৬৫] আবার রাসুল (স) এই দোয়াটিও পড়তে বলেছেন, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আওজুবিকা মিনাল বারাসি, ওয়াল জুনুনি, ওয়াল জুযামি, ওয়া সাইয়ি ইল আসক্কাম।’ [তিরমিজি :৩৬৮৭] একটি হাদীসে এসেছে, রাসীল সা. বলেছেন, ‘যে কেউ বিপদ- মুসিবতে পড়ে ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ বলবে এবং বলবে, হে আল্লাহ! আমাকে এ মুসিবত থেকে উদ্ধার করুন এবং এর থেকে উত্তম বস্তু ফিরিয়ে দিন’, অবশ্যই আল্লাহ তাকে উত্তম কিছু ফিরিয়ে দিবেন।’ (মুসলিম-৯১৮)

করোনা ভাইরাস থেকে বেঁচে থাকতে ডাক্তাররা সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় থাকতে বলেছেন। আর রাসুল (স) বলেছেন, ‘পবিত্রতা ইমানের অঙ্গ।’ [সহিহ মুসলিম :৫৫৬]। আমাদের সবার উচিত রাসুল (স) কর্তৃক প্রবর্তিত সমাধান মেনে চলা এবং আল্লাহর কাছে নিজ নিজ গোনাহের জন্য তওবা করা। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী চলা। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) প্লেগের ব্যাপারে প্রথমে সতর্ক করেন- যেসব জায়গায় প্লেগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, সেসব জায়গায় যাবে না। তারপর বলেছেন, যেখানে আছো, সেখানে প্লেগ দেখা দিলে অন্যত্র যাবে না। রাসূলের (সাঃ) হাদীস, উমরের (রাঃ) আমল থেকে দেখতে পাই- মহামারির বেলায় প্রতিরক্ষার দিকে সতর্ক হবার শিক্ষা। আবার অন্যন্য সাহাবীরা যখন প্লেগে আক্রান্ত হয়েছেন, তখন ধৈর্যধারণ করে, রহমত মনে করে আল্লাহর ফয়সালাকে মেনে নিয়েছেন। যার প্রতিদানস্বরূপ রাসূলের (সাঃ) হাদীস অনুযায়ী তাঁদের মৃত্যু হলো- শাহাদাতবরণ। তারপরও যদি করোনা-আক্রান্ত হয়ে আমরা অসুস্থ হয়ে পড়ি, তাহলে ধৈর্য ধারণ করবো, আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকবো এবং শাহাদাতের পেয়ালাপানে উন্মুখ থাকবো। ভালো মন্দ যা কিছু ঘটুক, মেনে নেবো সন্তুষ্টচিত্তে; এটাই প্রকৃত ঈমানদারের পরিচয়।

মোহাম্মদ হেদায়েত ঊল্লাহ
পিএইচডি গবেষক
ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

লাইটনিউজ/এসআই