বাংলা ও বিশ্বের সকল খবর এখানে
শিরোনাম

অস্তিত্ব সংকটে পোশাক শিল্প

আগামী দিনগুলোতে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে লিপ্ত হতে চলেছে রফতানি আয়ে ৮২ শতাংশ অবদান রক্ষাকারী দেশের তৈরী পোশাক শিল্প খাত।

বিশেষ করে করোনাভাইরাসের কারণে সম্ভাবনাময় এ শিল্প খাত যে ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং করোনার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হলে আগামী দিনগুলোতে যে ক্ষতির মুখোমুখি তাদেরকে হতে হবে সেটি ভাবতেই আঁতকে উঠছেন সংশ্লিষ্টরা। পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা, আগামী তিন মাসে ছয় হাজার কোটি ডলারের বাজার হারাতে পারে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্প খাত।

করোনার কারণে কারখানা বন্ধ রাখতে হলে শ্রমিকের বেতন এবং অন্যান্য খরচ বাবদ এ সময়ে যে ক্ষতির মুখে তারা পড়বেন সেটি কাটিয়ে ওঠার ক্ষমতা নেই অর্ধেক উদ্যোক্তারও। এ নিয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটছে শিল্পমালিকদের। যদিও সর্বসাম্প্রতিক দিনগুলোতে কিছু বিতর্কিত আচরণের কারণে দেশবাসীর তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে এ শিল্পের উদ্যোক্তাদের। অবশ্য এই অজুহাতে টিআইবির তির্যক সমালোচনাকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডের ওপর আঘাত বলেও কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৈরী পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত। অনেক চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে গত কয়েক দশকের পথ পরিক্রমায় দেশের পোশাক শিল্প আজকের এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। দেশের অর্থনীতিকে বেগবান করতে পোশাক শিল্পের কোনো বিকল্প নেই। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিদেশ থেকে যে রেমিট্যান্স আসছে তারও অন্যতম খাত হলো গার্মেন্টস শিল্প। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে এ খাতে। ফলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার সাথে জড়িয়ে গেছে এ শিল্প খাতটি। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে পোশাক রফতানি থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বিজিএমইএ। বর্তমানে রফতানি হচ্ছে ৩৫ বিলিয়নের মতো।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, তৈরী পোশাকের বিশ্ববাজার এখন ৬৫০ বিলিয়ন ডলারের। বাংলাদেশ এর মাত্র ৫ শতাংশ সরবরাহ করে। এ হার ৮ শতাংশে উন্নীত করতে পারলেই ৫০ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব; কিন্তু এ পথে রয়েছে বিস্তর প্রতিবন্ধকতা। একসময়ে কম মজুরির জন্য বাংলাদেশ বিখ্যাত থাকলেও শ্রমিকদের মজুরি এখনে বেশ বেড়েছে। দফায় দফায় বেড়েছে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম। বন্দর এবং পরিবহন ব্যয় তো লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। সর্বোপরি ডলারের মূল্য নিয়ে এ খাতের উদ্যোক্তাদের ক্ষোভ দীর্ঘ দিনের। তাদের দাবি, আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে ব্যর্থ হয়ে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

বিজিএমইএর হিসেবে গত কয়েক বছরে দুই হাজারের বেশি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। স্বাভাবিক কারণেই কর্মহীন হয়ে পড়েছে কয়েক লাখ শ্রমিক। এদের একাংশের অন্যত্র চাকরি হলেও বেকার রয়ে গেছেন অনেকেই। এর ওপর সর্বসাম্প্রতিক দুঃসংবাদ হলে বিশ্ববাজারে আরো এক ধাপ পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক রফতানির অবস্থান। দ্বিতীয় অবস্থান থেকে বাংলাদেশ এখন তৃতীয় স্থানে চলে গেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজার চীনের পেছনে অবস্থান এখন ভিয়েতনামের।

অন্য দিকে ব্যবসায় অনবরত ক্ষতির মুখে পড়ে গত সাত মাসে ছোট-বড় মিলিয়ে দেশের ৭৮টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কাজ হারিয়েছেন অসংখ্য শ্রমিক। পোশাক খাতে সুবাতাস তো বইছেই না, উল্টো তীব্র প্রতিযোগিতায় পড়ে এবং বাজার ধরে রাখার লড়াইয়ে চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছেন পোশাক ব্যবসায়ীরা। এমন একটি সময়ে করোনার প্রদুর্ভাব পুরো শিল্পকে অস্তিত্বের সঙ্কটে ফেলবে বলে অনুমান করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজিএমইএ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের কারণে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ইতালিসহ বেশির ভাগ দেশ এক হাজার ১১৫টি কারখানার প্রায় এক বিলিয়ন পিস অর্ডার বাতিল ও স্থগিত করেছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ইউএস ডলার। এসব কারখানায় দুই লাখ ১৯ হাজার শ্রমিক রয়েছেন। এ হিসাব কেবল বিজিএমইএর সদস্য প্রতিষ্ঠানের। এর বাইরেও অর্ডার বাতিল বা স্থগিত রয়েছে আরো অনেক। অন্য দিকে আর্থিক সঙ্কটের কারণে গত ১৪ মাসে বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত ১০৬টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। গত বছরের একই তারিখের তুলনায় এ বছরের ১৮ মার্চ রফতানি কমেছে ৪১ দশমিক ৮৪ শতাংশ, ১৯ মার্চ কমেছে ১২ দশমিক ২ শতাংশ, ২০ মার্চ রফতানি কমেছে ৪৪ দশমিক ১৫ শতাংশ।

বিজিএমইএর ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আবদুস সালাম এ প্রসঙ্গে বলেন, গত কিছু দিন থেকেই আমাদের অবস্থা খুব খারাপ। বাংলাদেশে শ্রমিকদের বেতনকাঠামো বৃদ্ধি পাওয়ায় মালিকরা ক্রেতার কাছ থেকে এই বাড়তি মূল্য আদায় করছেন। এতে ক্রেতারা আরো কম দামে অন্য বাজারের দিকে ঝুঁকছেন। ভিয়েতনামে কম দামে পোশাক পাওয়ায় তাদের রফতানি আয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার পাশের দেশগুলোতে কারেন্সি ডিভ্যালিউশন করায় পোশাক রফতানি কিছুটা কমেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আগের থেকে কম অর্ডার দিচ্ছে। আবার দেশে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব এই খাতের ওপর পড়েছে। রফতানি আয় হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি বিগত কয়েক মাসে নতুন করে আরো বহু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই খাতের ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বলেন, গত ২৭ মার্চ থেকে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বিটিএমইএ কারখানাগুলো বন্ধ রয়েছে। তাতে বায়ারদের অর্ডার এলেও কারখানায় উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এভাবে কত দিন বন্ধ থাকবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে ক্ষতির পরিমাণ কী দাঁড়াবে তার অনুমান করার শক্তিও কারো নেই।

এ প্রসঙ্গে আলাপকালে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আমরা তো সামান্য লাভে অর্ডার পাই। সারা মাস শ্রমিকদের কাজ করিয়ে যে লাভ আসে মাস শেষে বেতন দিতেই সব শেষ হয়ে যায়। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে সামান্য পুঁজির ব্যবসা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ৪০ লাখ শ্রমিককে এক মাসের বেতন দিতে যে টাকা লাগে তা কি আমাদের উদ্যোক্তাদের আছে? শ্রমিকরা কাজ করে, বিনিময়ে বেতন পায়। করোনার কারণে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তাতে কাজ করানো যাবে না অথচ বেতন দিতে হবে। এ সক্ষমতা কি আমাদের আছে?

সরকারের প্রণোদনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার দেবে পাঁচ হাজার কোটি টাকা, তা-ও আবার ঋণ হিসেবে সুদের বিপরীতে। এই টাকা তো সুদসহ ফেরত দিতে হবে। আমরা ব্যবসা করতে না পারলে কোত্থেকে দেবো? তাছাড়া পাঁচ হাজার কোটি টাকায় ৪০ লাখ শ্রমিকের কত দিনের বেতন হবে? বাকি টাকা কে দেবে? দেশের তৈরী পোশাক শিল্পকে বাঁচাতে আবেগতাড়িত না হয়ে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।

এ দিকে কিছু কিছু গার্মেন্ট মালিক শ্রমিকদের ফিরতে বাধ্য করায় টিআইবির সমালোচনার ভাষা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বেশ ক’জন পোশাক শিল্প উদ্যোক্তা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শীর্ষ উদ্যোক্তা বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় না এনে যেসব গার্মেন্ট মালিক প্রতিষ্ঠান খোলার ঘোষণা দিয়ে আবার শ্রমিকদের ফিরিয়ে দিয়েছেন তাদের কাজকে আমিও সমর্থন করি না। আমার নিজের কারখানাগুলো আমি বন্ধ রেখেছি। কিন্তু টিআইবির সমালোচনার ভাষা ঔদ্ধত্যপূর্ণ। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা মজুরি বৃদ্ধির পর টিআইবি যে দেশের অর্থানুকূল্যে চলে সে দেশের কোনো বায়ারই দর বাড়ায়নি। বারবার গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে যে পোশাক শিল্প তীব্র চাপের মুখে তা নিয়েও তারা কোনো কথা বলে না। অথচ পোশাক শিল্প যখন নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখার জন্য সংগ্রাম করছে তখন টিআইবি বলেছে, ‘তৈরী পোশাক শিল্প মালিকরা প্রমাণ করে দিলেন যে, তাদের নিজেদের স্বার্থের সামনে শুধু শ্রমিকই নয়, পুরো দেশের কল্যাণ ও নিরাপত্তা কোনো অর্থ বহন করে না। তাদের কার্যত পুরো দেশকে কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে ঝুঁঁকির মুখে ঠেলে দেয়াটা চরম স্বার্থপরতা ও ষড়যন্ত্রমূলক ছাড়া আর কী হতে পারে।’ টিআইবির নির্বাহী পরিচালক প্রধানমন্ত্রীর প্রতি স্বার্থান্বেষীদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতেও বলেছে।

এই উদ্যোক্তা প্রশ্ন করেন, টিআইবি বা এর নির্বাহী পরিচালককে এই এখতিয়ার কে দিলো যে তিনি দেশের ৮২ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উদ্যোক্তাদের স্বার্র্থপরতা ও দেশের নিরাপত্তাবিরোধী ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে চিহ্নিত করে প্রধানমন্ত্রীকে বিচার করার নসিহত করেছেন।

ভিন্নবার্তা/এমএসআই