বাংলা ও বিশ্বের সকল খবর এখানে
শিরোনাম

কুয়েতে অভিবাসী সংকট: বৈধ জনশক্তি পাঠাতে চায় সরকার

কুয়েত সরকার অবৈধ অভিবাসীদের দেশত্যাগে ১ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছে। করোনা পরিস্থিতির কারণে কয়েকদিনে আবেদনের গতি কমলেও, দুদিন থেকে আবারো অনেকে আবেদন করছেন বিনা খরচে দেশে ফেরার সুযোগ নিতে।

এর মধ্যে রয়েছে অনেক বাংলাদেশিও। বাংলাদেশ সরকার বৈধ শ্রমিক প্রেরণ উৎসাহিত করার পক্ষে। তাই এর খুব বেশি খারাপ প্রভাব পড়বে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, কুয়েতে অবৈধ অভিবাসীদের জন্য এরই মধ্যে দেশটিতে বাংলাদেশিদের শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ার পথে। ২০১৮ সালে কয়েক ক্যাটাগরিতে ভিসা বন্ধ হওয়ার পর, বলা হচ্ছিল কুয়েতে বাংলাদেশে শ্রমবাজার হারাবে। যদিও এরপর থেকে দেশটিতে জনশক্তি রপ্তানি কমেছে। এখন যেহেতু অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তাই সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ শেষে এদের মধ্যে অধিকাংশই আবার বৈধ পথে যেতে পারে দেশটিতে। পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারও অবৈধভাবে কুয়েতে যাওয়া রোধে নতুনভাবে কাজ শুরু করতে পারে।

অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম বলেন, অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার সাথে সরকারের ভাবমূর্তি গভীরভাবে সর্ম্পকিত। তাই এই প্রক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে সরকার নতুনভাবে শুরু করতে পারে।

তিনি আরো বলেন, বিদেশে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা না থাকায় অভিবাসী কর্মীরা বিভিন্নভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। আবার দেখা গেছে, অনেকে বৈধভাবে বিদেশে গিয়েও অবৈধ হয়ে পড়ছেন। এসব বিষয়েও সরকারকে ভাবতে হবে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম রেজা বলেন, আমরা বরাবরই বৈধপথে এবং দক্ষ শ্রমিক প্রেরণে পক্ষে। এ বিষয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে। কুয়েত সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়ে আমরা জেনেছি। এখনকার এই পরিস্থিতি (করোনা পরিস্থিতি) গেলে এসব বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নেব।

এদিকে, কুয়েতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, অবৈধ অভিবাসীদের দেশত্যাগে ১ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছে কুয়েত সরকার। এর আওতায় অবৈধ অভিবাসীরা ছাড়পত্র ও জরিমানা ছাড়াই সে দেশ ছাড়তে পারবেন। যারা এ সাধারণ ক্ষমার সুযোগ নিয়ে নিজ দেশে চলে যাবেন, তাদের উড়োজাহাজের টিকিট ও যাবতীয় খরচ বহন করবে কুয়েত সরকার।

এক্ষেত্রে, কুয়েত ছেড়ে যাওয়ার সময় নির্দিষ্ট স্থানে কিছু সময়ের জন্য থাকতে হবে। এ সময় কুয়েত সরকার থাকা-খাওয়াসহ যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। অন্যদিকে এ সময়ের মধ্যে যারা দেশে ফিরে যাবেন, তারা সাধারণ নিয়মে আবার কুয়েতে আসার সুযোগ পাবেন। ১৬ থেকে ২০ এপ্রিলের মধ্যে অবৈধ প্রবাসী বাংলাদেশিদের তিন কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ যোগাযোগ করতে হবে। তবে করোনাভাইরাস সংক্রমণজনিত বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় কুয়েতের ফরওয়ানিয়া এলাকার ব্লক-১-এর আলাদা দুটি স্কুলে অবৈধ অভিবাসীদের এ সেবা দেয়া হবে। ওই ব্লকের ১২২ নম্বর রোডে আল মুথানা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে (বালক) পুরুষদের ও ৭৬ নম্বর রোডের ফরওয়ানিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে (মেয়ে) নারীদের এ সেবা দেওয়া হবে।

কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাস বলছে, কোনো ধরনের কাগজপত্রের জন্য দূতাবাসে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। সরাসরি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে যোগাযোগ করতে হবে। সকাল ৮টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত সপ্তাহে ৭দিন এ সেবা দেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, এর আগেও কুয়েত সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিল। তখন অনেকেই এ সুযোগ নিয়েছিলেন। বর্তমানে দেশটিতে বৈধভাবে প্রায় তিন লাখ বাংলাদেশি আছেন।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৬ থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে কুয়েতে যাওয়া মোট শ্রমিকের সংখ্যা ৬ লাখ ৩০ হাজার ৪৭৩। এর মধ্যে নারী শ্রমিক ৯ হাজার ১০৯ জন। ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দেশটিতে গেছে প্রতি বছর গড়ে ৩০-৪০ হাজার বাংলাদেশি। ২০০৬ সালে কুয়েতে শ্রমিক গিয়েছিলেন ৩৫ হাজার ৭৭৫ জন। এরপর থেকেই রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কুয়েতে শ্রমিক পাঠানো বন্ধ হতে শুরু করে। ২০০৭ সালে দেশটিতে যান ৪ হাজার ২১২ জন, ২০০৮ সালে ৩১৯, ২০০৯ সালে ১০, ২০১০ সালে ৪৮ ও ২০১১ সালে ২৯ জন শ্রমিক। আর ২০১২ ও ২০১৩ সালে দেশটিতে যান মোট ৮ জন শ্রমিক।

তবে ২০১৪ সালে কুয়েতে আবারো শ্রমিক রপ্তানি শুরু হয়। ওই বছর বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে দেশটিতে যান মোট ৩ হাজার ৯৪ জন বাংলাদেশি। ২০১৫ সালে কুয়েতে যান ১৭ হাজার ৪৭২ জন, ২০১৬ সালে ৩৯ হাজার ১৮৮, ২০১৭ সালে ৪৯ হাজার ৬০৪, ২০১৮ সালে ২৭ হাজার ৬৩৭, ২০১৯ সালে ১২ হাজার ২৯৯ জন।

চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে দেশটিতে গেছেন মোট ১ হাজার ৫২৩ জন শ্রমিক। এর মধ্যে জানুয়ারিতে কুয়েতে যায় ৯৩৮ জন, পরের মাসে যায় ৫৮৫ জন বাংলাদেশি।