বাংলা ও বিশ্বের সকল খবর এখানে
শিরোনাম

করোনায় পারিবারিক কলহে তালাক:রেখাকে আশ্রয় দিলো পুলিশ

তিন সন্তানের জননী রেখা বেগম। স্বামী মিলন মিয়া। দিন মজুর। মৌলভীবাজার ও শ্রীমঙ্গলের মধ্যবর্তী ভৈরব বাজার এলাকায় তাদের বসবাস। অভাব অনটন থাকলেও সংসার ভালোই চলছিল।
সম্প্রতি করোনাভাইরাসের কারণে বেকার হয়ে পড়েছেন মিলন মিয়া। জমানো টাকাও নেই যে তাই দিয়ে চলবেন। ধার দেনা করে কোনোমতে এ কয়দিন চলেছেন। এখন কেউ ধারও দিচ্ছে না। ঘরে তাই চুলা জ্বলছে না।
টানাপোড়েনের সংসারে উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম দারিদ্র চেপে বসেছে। এক দুকথায় স্ত্রী রেখা বেগমের সাথে ঝগড়া শুরু।

তিনটি ছোট বাচ্চা। চরম এই সঙ্কটের মধ্যে তাদের মুখে খাবার জোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মা হয়ে সন্তানের কান্না সহ‌্য করতে পারেন না রেখা বেগম। স্বামীর সাথে এ নিয়ে মনোমালিন‌্য হয় রেখার। এক পর্যায়ে মেজাজ রাখতে পারেন না মিলন মিয়া।

স্ত্রীকে মৌখিকভাবে তালাক দিয়ে বসেন মিলন। শুধু তাই নয়, তিন সন্তানসহ স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। দেশের এই সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে চরম বিপদে পড়ে যান রেখা বেগম। কী করবেন ভেবে পান না। অসহায় অবস্থায় তিন সন্তান নিয়ে রাস্তায় পড়ে থাকতে হয় তাকে।

অনেক কাকুতি মিনতি করেছেন। মন গলেনি স্বামীর। সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে। অবশেষে বাধ‌্য হয়ে সন্তানদের নিয়ে বাবার বাড়ি কুমিল্লার উদ্দেশ‌্যে রওনা দেন রেখা। গত বুধবারের (১৫ এপ্রিল) ঘটনা।

চারিদিকে লকডাউন চলায় রাস্তায় কোনো গাড়ি নেই। সাথে যথেষ্ট টাকাও নেই। তাই বাধ‌্য হয়ে ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে বুধবার সকালে কুমিল্লার উদ্দেশে হাঁটা শুরু করেন রেখা। প্রায় ৫০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) বিকেলে পৌঁছান হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের নতুন ব্রিজ এলাকায়।

তিন সন্তানসহ অসহায় এক নারীকে রাস্তায় বসে থাকতে দেখেন স্থানীয় সাংবাদিক মোতাব্বির হোসেন কাজল। তিনি এগিয়ে গিয়ে খোঁজ খবর নেন তাদের। খাবার ও পানি সংগ্রহ করে দেন। পরে বিষয়টি চুনারুঘাট থানার ওসি শেখ নাজমুল হককে জানান।

খবর পেয়ে ওসি শেখ নাজমুল হক তাৎক্ষণিক পুলিশ পাঠিয়ে সন্তানসহ রেখাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যান। কুমিল্লায় রেখার ভাই মুজিবুর রহমানের কাছে খবর পাঠান। খবর পেয়ে অসহায় বোনকে উদ্ধার করতে ছোটেন মুজিবুর রহমান। অবশেষে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় পৌঁছলে তার কাছে বোন রেখা ও তার তিন সন্তানকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

রেখা বেগম জানান, স্বামী মিলন মিয়াসহ ও তিন সন্তান নিয়ে ভৈরব বাজার এলাকায় থাকতেন তারা। তার স্বামী দিন মজুর। করোনার কারণে স্বামীর রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে। এ সময়ে পারিবারিক কলহে বাধে স্বামীর সাথে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে স্বামী তাকে তালাক দিয়েছেন। তিন সন্তানসহ তাকে ঘর থেকেও তাড়িয়ে দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘কোনো উপায় না পেয়ে সন্তানদের নিয়ে বাবার বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগরের কামারচরে রওনা হই। রাস্তায় কোনো গাড়ি না পেয়ে হাঁটতে থাকি। শায়েস্তাগঞ্জ নতুন ব্রিজের কাছে এলে পুলিশ আমাদের থানায় নিয়ে আশ্রয় দেয়।’

ওসি শেখ নাজমুল হক বলেন, ‘করোনাভাইরাস সংক্রমণের এই দুর্যোগের মধ‌্যে রেখা বেগমকে তালাক দিয়েছে তার স্বামী। তিন সন্তানসহ বাড়ি থেকেও বের করে দিয়েছে। বিষয়টি খুবই অমানবিক। তিনটি ছোট বাচ্চা নিয়ে ওই নারী হেঁটে ৫০ কিলো মিটার পাড়ি দিয়েছেন। ভাবাই যায় না। অবশেষে তার ভাই এসে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে গেছেন। কিন্তু এমন অমানবিকতা কোনোভাবেই কাম‌্য নয়।’