বাংলা ও বিশ্বের সকল খবর এখানে
শিরোনাম

জার্মানি যেভাবে করোনাকে হারাচ্ছে

করোনা মোকাবিলায় এখন পর্যন্ত জার্মানি সফল। অনেক দেশই কারোনা মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে। সারা বিশ্বেই আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা বিরাজমান। কোথাও কোথাও লকডাউন চলছে। এই পরিস্থিতিতে জার্মানি ছোট ছোট দোকানপাট খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্কুলও খুলে দেওয়া হবে আগামী ৩ মে থেকে, পর্যাক্রমে।

এ পর্যন্ত জার্মানিতে ১ লাখ ৫০ হাজার করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। সুস্থ হয়েছে ৯৮ হাজার। মৃতের সংখ্যা ৫ হাজার। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ২৯ হাজার। কিন্তু মারা গেছে ১৭ হাজার। ইতালিতে ১ লাখ ৮৩ হাজার আক্রান্ত, মৃত্যু হয়েছে ২৪ হাজার রোগীর। ফ্রান্সে মারা গেছে ২০ হাজার। আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ৫৮ হাজার।

বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে, জার্মানিতে সুস্থ হওয়ার হার বেশি এবং মৃত্যুর হার যেকোনো দেশের থেকে কম। জার্মানির এই সাফল্যের কারণ কী? ঘুরেফিরে বিভিন্ন জায়গাতেই একই প্রশ্ন করা হচ্ছে। কমবেশি আন্তর্জাতিক প্রতিটি গণমাধ্যমেই এ বিষয়ে বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য কারণ অনুসন্ধান করা হয়েছে।

দরদি ও দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও কারিগরি দক্ষতা জার্মানিকে করোনা মোকাবিলায় এ পর্যন্ত সাফল্য এনে দিয়েছে। করোনা পরিস্থিতি বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ১১ মার্চ চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল ভাষণ দেন। তাঁর ভাষণটি ছিল অত্যন্ত ইতিবাচক ও বাস্তবভিত্তিকি। তিনি তথ্য নিয়ে লুকোচুরি করেননি কিংবা নিয়তির ওপর নির্ভর করেননি। জার্মানদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ম্যার্কেল বলেন, পরিস্থিতি আতঙ্কজনক, আপনারা সবাই আতঙ্কিত হবেন। ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ জার্মান আক্রান্ত হতে পারে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে আমাদের জয়ী হতে হবে। এবং আমরা সবাই মিলে জয়ী হব।

শুধু ম্যার্কেল নন, সব জার্মান রাজিনৈতিক নেতাই পরিশীলিত, বুদ্ধিদীপ্ত ও সংযত আচরণ করেছেন। জার্মান প্রেসিডেন্ট ফ্রাংক ভাল্টার স্টাইনমায়ার ইস্টারের ভাষণে বলেন, এটা কোনো জাতি বা সৈনিকের বিরুদ্ধে লড়াই নয়। এটা মানবতা পরীক্ষার লড়াই। তাই তো জার্মানি এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে ইতালি ও ফ্রান্স থেকে রোগী এনে চিকিৎসা করেছে।

মোটের ওপর জার্মান রাজনীতিবিদেরা কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প, ব্রিটেনের বরিস জনসন বা ইরানের আলী খামেনির মতো উদভ্রান্ত আচরণ করেননি। ষড়যন্ত্র না খুঁজে বরং করোনা প্রতিরোধে মনোযোগ দিয়েছেন। সবাই একযোগে কাজ করেছেন। আমলাতন্ত্রের ধীরগতির জন্য সুবিদিত জার্মান প্রশাসন খুবই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

জার্মানির কোনো রাজনৈতিক নেতা বলেননি, ম্যার্কেলের মতো নেতা থাকায় জার্মানিতে করোনা আসবে না। বা কেউ বলেননি, ম্যার্কেল সকালে বাইবেল পাঠ করে দিনের কাজ শুরু করেন। ভবিতব্যের ওপর নির্ভর না করে বরং জনগণের প্রতি তাদের নিবেদন ছিল লক্ষণীয়। জনসাধারণকে রক্ষা করতে পারবেন কি না, আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারবেন কি না, সেই শঙ্কায় হেসে রাজ্যের অর্থমন্ত্রী ঠোমাস শেফের আত্মহত্যা পর্যন্ত করেন। এ থেকেই অনুধাবন করা যায়, জার্মান রাজনীতিবিদেরা বিষয়টি কতটা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলেন। রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন দক্ষ পেশাজীবী ও গবেষকেরা। রবার্ট কখ ইনস্টিটিউট করোনা–বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনা করে সরকারকে সরবরাহ করছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকেরা সঠিক ও সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে সরকারকে অবহিত করেছেন।

জার্মান সরকার শুরুর দিকেই নাগরিকদের অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা দিয়েছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান সাময়িক বন্ধ করে দেওয়ায় শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তার মূল বেতনের ৬০ তেকে ৬৭ শতাংশ প্রদান করেছে সরকার। ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাকে সরকার অফেরতযোগ্য থোক বরাদ্দ দিয়েছ। ১০ বছর মেয়াদি ৫০ হাজার থেকে ৮০ হাজার ইউরো বিনা সুদে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। জার্মান সরকার ৭৫০ বিলিয়ন ইউরোর প্যাকেজ ঘোষণা করে গত মাসে। এর বাইরেও বড় উদ্যোক্তাদের জন্য সীমাহীন ঋণসুবিধা ঘোষণা করেছে।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে, জার্মানির স্বাস্থ্যব্যবস্থা সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বের যেকোনো দেশের থেকে শক্তিশালী। এ পর্যন্ত ১৭ লাখের বেশি পরীক্ষা করে ১ লাখ ৪৮ হাজারের মতো রোগী শনাক্ত করেছে। রোগী দ্রুত শনাক্ত করায় নিরাময়ও দ্রুত সম্ভব হচ্ছে। শতাধিক সরকারি ও বেসরকারি ল্যাবরেটরিতে নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। ।

মোদ্দাকথা হচ্ছে, জার্মানির রাজনৈতিক নেতৃত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। বিশেষ করে ম্যার্কেলের দৃঢ়চেতা ও স্পষ্টবাদী নেতৃত ছিল এককথায় অনবদ্য। তিনি ঘরে ও বাইরে উভয় ক্ষেত্রেই নিজস্ব ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন।

এ জন্য তিনি এখন সারা বিশ্বে নন্দিত। ম্যার্কেলকে জার্মানরা আদর করে ‘মা’ বলে ডাকেন। জার্মান ভাষায় বলেন ‘উনজেয়েরে মুটি’। মানে, ‘আমাদের মা’। ম্যার্কেল আরও একবার তাঁর প্রায় আট কোটি সন্তানকে আগলে রাখলেন যোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে। না তিনি কোনো হুমকি দেননি। কাউকে জেলে পোরার ধমকও দেননি। বরং তিনি সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইয়ের জন্য সংঘবদ্ধ করেছেন।