বাংলা ও বিশ্বের সকল খবর এখানে
শিরোনাম

করোনায় মৃতদেহ সৎকারে প্রস্তুত কওমি আলেমরা

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বা সন্দেহভাজন মৃতদেহের দাফনসহ সৎকারকাজ করতে প্রস্তুতি নিয়েছেন কওমি মাদ্রাসার সহস্রাধিক আলেম। ইতোমধ্যে দুয়েকটি এলাকায় লাশ দাফনও করেছেন তারা। তবে সরকারি অনুমোদন না থাকায় কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রেখেছেন উদ্যোক্তারা। বৃহস্পতিবার দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আলেমরা সঙ্গে আলাপকালে তাদের আগ্রহের কথা জানান। অন্য ধর্মের অনুসারীদের মরদেহের সৎকারের দায়িত্বও তারা পালন করতে আগ্রহী।

আগ্রহী আলেমদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বা সন্দেহভাজন হিসেবে মৃত ব্যক্তিদের সৎকার কাজ অনিশ্চিত হতে পারে, এমন আশঙ্কাকে সামনে রেখেই কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষিত আলেম ও শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে চান।

উদ্যোক্তা-আলেমরা বলছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে যথাযথ অনুমোদন না থাকায় ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় আহ্বান এলেও তারা সাড়া দিতে পারছেন না। তবে অনুমতি পেলেই মরদেহ সৎকারের কাজটি সম্পন্ন করার যাবতীয় প্রস্তুতি নেওয়া আছে।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরু থেকেই অর্ধশতাধিক স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে কাজ করছেন তাকওয়া ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মাদ্রাসা শিক্ষক মাওলানা গাজী ইয়াকুব। বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, ‘মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে ধর্মীয় নিয়মে মারা যাওয়া লাশের দাফন-কাফন ও জানাজা সম্পন্ন করতে আমরা একটি টিম করেছি। আমরা ঢাকায় ইতোমধ্যে চারটি টিম গঠন করেছি আলেমদের নেতৃত্বে। যারা দাফন-কাফন ও জানাজার কাজটি সম্পন্ন করবে। মাওলানা ইয়াকুব জানান, নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর, চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় টিম গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জেই ২৮টি লাশ দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।

গাজী ইয়াকুবের অভিযোগ, ‘গণমাধ্যমে আমরা বিভিন্ন সময় খবর পাচ্ছি, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন হিসেবে যারা মারা যাচ্ছেন, তাদের লাশ দাফন করতে স্বজন কিংবা পরিচিতরা বিরূপ আচরণ করছেন। আমরা ভাইরাস সংক্রমণের শুরু থেকে ত্রাণ বিতরণ করেছি। পরিস্থিতি উপলব্ধি করে লাশ দাফন ও সৎকারের কাজটিও আমরা স্বেচ্ছাসেবায় করতে চাই। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেও এখন পর্যন্ত (বৃহস্পতিবার) কোনও সিদ্ধান্ত আমরা পাইনি। সে কারণে সরকার যদি আমাদের অনুমোদন করে, তাহলে কওমি মাদ্রাসার আলেম ও শিক্ষার্থীরা এই কঠিন সময়ে জাতির কাজে লাগবে বলে আশা করি।’

গাজী ইয়াকুব জানান, গত ১৬ এপ্রিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করলেও এখন পর্যন্ত কোনও সাড়া পাননি তারা। তবে তাকওয়া ফাউন্ডেশনের ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচি অব্যাহত আছে বলে জানান তিনি।

ইকরামুল মুসলিমীন ফাউন্ডেশনের প্রচার সম্পাদক মাওলানা ইহসান সিরাজ বলেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন হিসেবে মৃতদের মরদেহ দাফন-কাফন ও জানাজার কাজ করতে ইসলামি বক্তা মুফতি হাবিবুর রহমান মিছবাহর নেতৃত্বে সারা দেশে জানাজা টিম গঠন করেছে ‘ইকরামুল মুসলিমীন ফাউন্ডেশন।

ইকরামুল মুসলিমীন ফাউন্ডেশনের আহ্বায়ক, মুফতি হাবিবুর রহমান মিছবাহ জানিয়েছেন, সারা দেশে ৬৪ জেলায় সংস্থার একজন আলেম-কর্মকর্তার নেতৃত্বে টিম গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে অধিকাংশ জেলায় টিম প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। মাওলানা ইহসান সিরাজ উদ্যোগের বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, ‘এখনও অনুমোদন না পাওয়ায় কাজ শুরু করা যায়নি। তবে সারা দেশের বিভিন্ন জেলায় ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী কুরিয়ারে পাঠানো হয়েছে।

ময়মনসিংহে জেলা প্রশাসক ডেকে নিয়েই ইকরামুল মুসলিমীনকে দাফন কাজ করার অনুমতি দিয়েছেন বলে জানান ইহসান সিরাজ। মাওলানা হাবিবুর রহমান মিছবাহর নেতৃত্বে সৎকারের কাজে আলেমরা, ময়মনসিংহে দাফনের অনুমতি পেয়েছিলেন তারা

ইহসান সিরাজ জানান, তাদের সংগঠনের শুধু মুসলিম নয়, অমুসলিমদের মরদেহ সৎকারের প্রস্তুতিও রয়েছে। এক্ষেত্রে কোনও কোনও টিমে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী সদস্যরাও যুক্ত হয়েছেন। নারীদেরও সৎকারের প্রস্তুতি আছে। তাদের ক্ষেত্রে আলাদা ব্যবস্থা করা হয়েছে। সংগঠনটি ঢাকায় নিজস্ব পরিবহনে সেবা দিলেও ঢাকার বাইরে মৃতব্যক্তির পরিবার বা স্বজনদেরই পরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে বলে জানান তিনি।

ইহসান সিরাজ জানান, ঢাকা, গাজীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মানিকগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, নোয়াখালী, ভোলা, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম, পটিয়া, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট, শেরপুর, ঠাকুরগাঁও, নাটোর, নেত্রকোনা, রাজবাড়ী, রংপুর, জামালপুর, লালমনিরহাট, নরসিংদী, মাদারীপুর, দিনাজপুর ও কুড়িগ্রাম জেলায় টিম প্রস্তুত করা হয়েছে।

সৎকারের কাজ করতে উদ্যোক্তা আলেম মাওলানা গাজী ইয়াকুব বলেন, ‘আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মরদেহ সৎকারের কাজ করবো। আমরা চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার তিন-চার ঘণ্টা পর তার শরীরে আর জীবাণু থাকে না। এজন্য আমরা কেউ কল করলে তিন-চার ঘণ্টা পর তার জানাজা-দাফনের ব্যবস্থা করবো।’

মৃতদেহ সৎকারের বিষয়ে স্বাস্থ্যবিধি ও প্রক্রিয়া ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একটি ভিডিও ক্লিপ থেকে জেনে নেওয়া হয়েছে বলে জানান মাওলানা ইহসান সিরাজ। তিনি বলেন, ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একটি ভিডিও ক্লিপ দেখে প্রাথমিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এছাড়া স্থানীয়ভাবে আমরা প্রশাসনের নির্দেশনাতেই কাজ করবো। করোনায় মৃতদেহ সৎকারে প্রস্তুত কওমি আলেমরা

ইকরামুল মুসলিমীনের প্রচার সম্পাদক ইহসান সিরাজ বলেন, ‘করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন মৃতদেহের সৎকার কাজের সরকারি অনুমোদন এখনও পাওয়া যায়নি। অনুমোদন ব্যতীত করোনায় মৃতের কাছে কারও যাওয়ার অনুমতি নেই।

জানতে চাইলে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বা সন্দেহজনক মৃতদের সৎকারের বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দিক থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম-সচিব মো. সাইফুল্লাহিল আজম বলেন, ‘সবাই যদি করতে চায়, এটা তো দেওয়া যাবে না। প্রথমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর আবেদন করতে হবে। কমিটি যদি মনে করে, তাহলে অনুমতি দেবে। আমাদের যে অভিজ্ঞতা, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর- এই রিজিয়নে করোনা আক্রান্ত বেশি। আল্লাহর রহমতে ঢাকার বাইরে এত ভয়াবহ অবস্থা এখনও নেই। এরপরও যদি সেরকম কিছু ঘটে তাহলে তো অনুমতি দিতে হবে।’

আবেদনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সাইফুল্লাহিল আজম বলেন, যারা আগ্রহী তারা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করবে, প্রশাসন আমাদের জানাবে। ঢাকার বাইরে স্থানীয় উপজেলা পর্যায়ে ইউএনও, জেলা পর্যায়ে সিভিল সার্জন বা জেলা প্রশাসকের কাছে যাবে।

অনুমতি ছাড়া কেউ সৎকারের কাজ করতে পারবে না বলে জানান মো. সাইফুল্লাহিল আজম। তিনি বলেন, যারা করতে চায় তাদের সচিব বরাবর দরখাস্ত করতে হবে। আমরা দেখে যদি মনে করি, তাহলে অনুমতি দেবো। আর এখন যারা মারা যাচ্ছেন, সেটা প্রশাসনই ব্যবস্থা নেবে। যাদের সঙ্গে প্রশাসনের যোগাযোগ এখন আছে, তারাই করবে।

উল্লেখ্য, বুধবার (২২ এপ্রিল) পর্যন্ত আল মারকাজুল ইসলামী করোনায় আক্রান্ত অন্তত ৭০টি মরদেহ সৎকার করেছে বলে জানান মো. সাইফুল্লাহিল আজম।

লাইটনিউজ/এসআই