বাংলা ও বিশ্বের সকল খবর এখানে
শিরোনাম

পুলিশের মেসে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা

পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যদের মধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৩ শ’ ছাড়িয়েছে। সোমবার (২৭ এপ্রিল) পর্যন্ত এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩৬ এ। আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন এমন সংখ্যাই বেশি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও পুলিশ হাসপাতাল বলছে, আক্রান্তদের ৮০ ভাগ মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্য। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে চলমান লকডাউনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়েই তারা আক্রান্ত হয়েছেন। তবে তাদের মধ্যে এই ভাইরাস দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ার কারণ তারা দিনের কাজ শেষ করে এসে গাদাগাদি করে ব্যারাকের মেসে থাকছেন। আর সেখানে তাদের লক্ষণ উপসর্গ প্রকাশ পেতে সময় লাগছে, তবে এরইমধ্যে একজন থেকে তা ছড়িয়ে পড়ছে পাশে থাকা অন্যদের মধ্যেও।

পুলিশ সদর দফতর ও বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তারা বলছেন, মাঠ পর্যায়ে কাজ করে এমন পুলিশ সদস্যদের ‘ব্যাপক হারে’ প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সামগ্রী দেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে ডিউটির আগে প্রতিদিন মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাসহ দূরত্ব বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করতে বলা হচ্ছে। এছাড়া পুলিশ সদস্যদের ব্যারাকেও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাড়তি সদস্যদের আবাসনের জন্য স্থানীয় হোটেল, মোটেল কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করা হচ্ছে।

পুলিশ সদর দফতরের একটি সূত্র জানায়, সোমবার (২৭ এপ্রিল) বিকেল ৪টা পর্যন্ত সারা দেশে কোভিড-১৯ আক্রান্ত পুলিশ সদস্যের সংখ্যা ৩৩৬। একদিনের ব্যবধানে আক্রান্ত হয়েছে ৪৮ জন। এরমধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকাতেই সোমবার নতুন করে ২২ জন আক্রান্ত হয়েছেন। ডিএমপিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা এখন ১৮২ জন। ঢাকার বাইরে সর্বাধিক সংখ্যক পুলিশ আক্রান্ত হয়েছেন গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলায়। ২৬ জন করে পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন এই দুই জায়গায়। এছাড়া গোপালগঞ্জে ১৮ জন, গাজীপুরে ১৬ জন, পুলিশের বিশেষ শাখায় ১৬ জন, কিশোরগঞ্জে ১০ জন, ১২ এপিবিএন ঢাকায় ৮ জন, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ ও নরসিংদীতে ৬ জন করে, পুলিশ টিঅ্যান্ডআইএম-এ ৪ জন, শেরপুরে ৩ জন, ঢাকা জেলা পুলিশ ও জামালপুরে ২ জন এবং সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ, পুলিশ স্টাফ কলেজ, ময়মনসিংহ এপিবিএন, নৌ পুলিশ, মুন্সিগঞ্জ, ময়মনসিংহ, মৌলভীবাজার, গাইবান্ধা ও ঝালকাঠিতে একজন করে পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। সোমবার পর্যন্ত সারা দেশে হোম কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন ৭৭৭ জন পুলিশ সদস্য। এর আগে গত ২৩ এপ্রিল পুলিশ সদর দফতর থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ২১৮ জন পুলিশ সদস্য করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার কথা জানানো হয়। গত চার দিনে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে ১১৮ জন।

ওই সূত্র জানায়, আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার। তিনি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে কর্মরত। বাকিরা সবাই কনস্টেবল, এএসআই, এসআই ও পরিদর্শক পদমর্যাদার।

রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতাল সূত্র বলছেন, হাসপাতালের আওতায় এখন পর্যন্ত ২৮০ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে স্থান সংকুলান না হওয়ায় কয়েকজনকে আলাদা হাসপাতাল ও অন্যান্য জায়গায় রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বাকিরা বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে এখন পর্যন্ত ১২ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। পুলিশ সদস্যদের মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় কেউ নেই। ৩-৪ জনকে মাঝে মধ্যে সাধারণভাবে ভেন্টিলেশন ছাড়া অক্সিজেন দিতে হয়।

রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালের পরিচালক ডিআইজি ড. হাসান উল হায়দার বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালের আওতার মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৮০ জন পুলিশ সদস্যকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে স্থান সংকুলান না হওয়ায় কিছু সদস্যকে হাসপাতালের বাইরে স্কুল-কলেজে বেড স্থাপন করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে আসা করোনায় আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বেশিরভাগই আক্রান্ত হয়েছে রাস্তায় ডিউটি করতে গিয়ে। তারা বিভিন্ন লোকজন বা লকডাউন নিয়ন্ত্রণ, ওএমএস এর চাল বিলি কিংবা হাসপাতালের গেটেও দায়িত্ব পালন করে। এদের মধ্যে একজন-দু’জন আক্রান্ত হয়। তারপর তারা যখন আবার ব্যারাকে অবস্থান করে সেখানেও সহকর্মীদের মধ্যে ছড়ায়। এর কারণ হলো উপসর্গ প্রকাশের আগে বোঝার উপায় নেই কে আক্রান্ত হলো। তবে আমরা দেখেছি বেশিরভাগই ডিউটি করতে গিয়ে আক্রান্ত হচ্ছে। এর হার শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশি হবে।’

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে কেউ যাতে করোনায় আক্রান্ত না হয় এজন্য সবাইকে সচেতন করার পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রতিদিনই এই কাজ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মাঠ পর্যায়ে কর্মরতদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা সামগ্রী দেওয়া হয়েছে। কেউ আক্রান্ত হলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে আইসোলেশনে নেওয়া হয়। যাতে তার দ্বারা অপর কোনও সহকর্মী আক্রান্ত না হয়।

এদিকে, রাজধানীর পাশে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ এলাকার একটি থানায় পুলিশের একাধিক সদস্য আক্রান্ত হওয়ার পর ওই থানা কার্যালয়টি লকডাউন করে রাখা হয়েছে। এর বাইরে জেলার কালিগঞ্জ থানায় ১৬ জন পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন।

গাজীপুরের পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার বলেন, ‘আমরা প্রত্যেক সদস্যকে পিপিই দিয়েছি। হ্যান্ডস গ্লাভস, মাস্ক, সানগ্লাস দিয়েছি। প্রতিবার ডিউটিতে বের হওয়ার আগে আমাদের সদস্যরা এসব সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার করছে কিনা তা এনশিউর করছি। সবাইকে সামাজিক দূরত্ব মেনে ডিউটি করতে বলা হয়েছে। কিন্তু, তারপরও ক্রাউড (ভিড়) কন্ট্রোল করতে গিয়ে সবসময় ডিস্ট্যান্স (দূরত্ব) মেইনটেইন করা যায় না। আমরা সব সদস্যদের আরও বেশি সচেতন করছি।

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের পুলিশ লাইন্স ও থানায় দায়িত্বরতদের কয়েকটা ভাগে ভাগ করে দিয়েছি। যেমন থানার পাশে কোনও স্কুল, ডাকবাংলো বা যা আছে, কিংবা বাসায় যারা আছে তাদের আলাদা আলাদা থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। এছাড়া কে কার সঙ্গে ডিউটিতে যাচ্ছে সেটারও একটা রোস্টার মেইনটেইন করছি। যাতে কেউ যদি আক্রান্ত হয় তাহলে সঙ্গে সঙ্গে যেন ওই গ্রুপটাকে সহজেই শনাক্ত করতে পারি।’

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশের ব্যারাকগুলোতেও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। যেহেতু কেউ আক্রান্ত হয়ে ব্যারাকে ঢুকলে অনেক বেশি আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, এজন্য ব্যারাকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বেড স্থাপন করা হয়েছে। ব্যারাকে প্রবেশ ও বের সময় শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপ করা হচ্ছে। কারও শরীরে সামান্য উপসর্গ দেখা দিলেই পরীক্ষার পাশাপাশি তাকে আইসোলেশনে রাখা হচ্ছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট (পিওএম, উত্তর) এর উপ-কমিশনার নাজমুল হাসান বলেন, ‘আমাদের এখানে ট্রাফিক ব্যারাকে আক্রান্ত ধরা পড়েছিল। আমরা সেটা ১৪ দিন লকডাউন করে রেখেছিলাম। ব্যারাকে যদি কারও সামান্যতম জ্বরও ধরা পরে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে এবং তার দুই পাশের দুই সিটের সদস্যকে উত্তরা পুলিশ লাইন্সে আইসোলেশনে রাখা হয়। আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছি।’

মিরপুরে ১১টি ব্যারাকের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক ব্যারাকেই সোশ্যাল ডিসট্যান্স মেনে সদস্যদের রাখা হয়। এমনকি ব্যারাকে প্রবেশ করার আগে হাত ধোয়া থেকে শুরু করে প্রতিদিন দুই বার করে শরীরের তাপমাত্রা মাপা হয়। এছাড়া মেইন গেটেও তাপমাত্রা মাপা হয়। ব্যারাকের প্রত্যেকটা ফ্লোরে সিসিটিভি আছে। কেউ সামাজিক দূরত্ব ভঙ্গ করছে কি না তাও মনিটর করা হয়। কেউ ভঙ্গ করলে তাকে ব্রিফ করা হয়। ফলে ব্যারাক থেকে ব্যাপকহারে করোনা ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ কম।’

এদিকে গত রবিবার পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সকল ইউনিট কমান্ডারদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় আইজিপি বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদেরকে সুচিকিৎসা দেওয়ার সকল আয়োজন রয়েছে। রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালসহ পুলিশের অন্য হাসপাতালগুলোতে করোনা সংক্রান্ত চিকিৎসা সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া বিভাগীয় পর্যায়েও সুচিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশ সদস্য ও তাদের পরিবারের পাশে বাংলাদেশ পুলিশ রয়েছে বলে জানান তিনি।

লাইটনিউজ/এসআই