বাংলা ও বিশ্বের সকল খবর এখানে
শিরোনাম

করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে ৮ পরামর্শ

বাংলাদেশে করোনাভাইরোসের কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের প্রেক্ষিতে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার লক্ষ্যে গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির দ্বিতীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মঙ্গলবার এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিস্তারিত অফিস আলোচনা ও পূর্ববর্তী সভায় গঠিত পাঁচটি সাব-কমিটির রিপোর্ট পর্যালোচনা করে কিছু সুপারিশ করা হয়।

মঙ্গলবার রাত পোনে ৯টায় কমিটির সভাপতি ও বিএমডিসির প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

হাসপাতাল সেবার মান বৃদ্ধির বিষয়ে পরামর্শ: ১. (ক) স্বয়ংসম্পূর্ণ ও প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালগুলোকে কোভিড-১৯ এর রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্বাচন করাই যুক্তিযুক্ত ও সমীচীন। Makeshif হাসপাতালসমূহ মৃদু থেকে মাঝারিভাবে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য রাখা বাঞ্ছনীয়।

(খ) কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত রোগীদেও চিকিৎসার জন্য যে হাসপাতালগুলো নিয়োজিত আছে, সেখানে বিভিন্ন বিষয়ের যথেষ্ট জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ চিকিৎসক থাকতে হবে। স্বাস্থ্যসেবার জন্য নিয়োজিত ওয়ার্ড বয় ও পরিচ্ছন্নকর্মীদের সংখ্যা বাড়িয়ে সেবার মান উন্নত করতে হবে।

(গ) স্বাস্থ্য সেবাকর্মী, চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য প্রয়োজনীয় বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত মান সম্মত সুরক্ষা সামগ্রী, বিশেষত পিপিই, ফেস শিল্ড, গগ্লোস, সু কাভার যথেষ্ট সংখ্যায় সরবরাহ করতে হবে। বিশেষতঃ যারা মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসায় নিয়োজিত ও সংক্রমিত হওয়ার বেশি ঝুঁকিতে থাকেন তাদেও জন্য রেসপারেটরি মাস্ক সরবরাহ নিশ্চিত করা দরকার। সুরক্ষা সামগ্রীসমূহ যাতে মান সম্পন্ন হয় তা নিশ্চিত করার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি থাকা দরকার।

(ঘ) কোভিড-১৯ রোগীদেও চিকিৎসায় নিয়োজিত হাসপাতালসমূহে রোগী, চিকিৎসক ও অন্যান্য সকলের জন্য বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এজন্য যথেষ্ট সংখ্যক পানি-ফিল্টার এর ব্যবস্থা করা দরকার।

(ঙ) কোভিড-১৯ রোগীর চিকিৎসায় নিয়োজিত হাসপাতালসমূহে রোগীদেও চিকিৎসার জন্য অতিপ্রয়োজনীয় টেস্ট এর ব্যবস্থা থাকা বাঞ্ছনীয় (যেমন- CBC, SGPT, Creatinine, electrolytes,CRP, CPK, Troponin-1, Chest X-ray, ECG) এবং এসব পরীক্ষাসমূহ নিশ্চিত করতে হবে। এ হাসপাতালগুলোর ল্যাবরেটরিতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক Microbiologist, Virologist ও Technologist পদায়নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমানে বিশ্বেও উন্নত দেশসমূহে রোগীর উপসর্গ ও বুকের X-ray-এর ভিত্তিতে কোভিড রোগী হিসেবে চিকিৎসা শুরু করা হচ্ছে। Community transmission এর এ সময়ে এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা শুরু করা অতীব জরুরি। কোভিড পরীক্ষা ভর্তির পরও করা যেতে পারে।

যে সমস্ত রোগীর উন্নতি হয়েছে এবং ছাড় পাওয়ার যোগ্য তারা পর পর দুইটি কোভিড টেস্ট নেগেটিভ না হওয়া পর্যন্ত ছাড়া পান না। সে কারণে হাসপাতালসমূহের একটা বিরাট অংশের বিছানায় এরা অবস্থান করছেন। যা এইসব হাসপাতালের বিছানার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এ জন্য যারা ছাড়া পাওয়ার যোগ্য কিন্তু এখনো দুইটি টেস্টের রিপোর্টে পাননি। তাদের জন্য আলাদা আইসোলেশনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এটা বাড়িতে বা অন্যত্রও হতে পারে।

(চ) কোভিড রোগীদেও চিকিৎসায় নিয়োজিত হাসপাতালসমূহের মধ্যে আন্তঃহাসপাতাল যোগাযোগ থাকা প্রয়োজন। এতে রোগী চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্যেও আদান প্রদান সহজতর হবে।

(ছ) কোভিড রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত হাসপাতালসমূহে কোভিড রোগীদের অন্যান্য রোগের কারণে Emergency Surgery প্রয়োজন হতে পারে। এজন্য Emergency Surgery ব্যবস্থা রাখতে হবে। গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকা দরকার।

(জ) অধিক সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও স্বাস্থ্যকর্মী কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হলে সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যাতে বিঘ্নিত না হয় সে জন্য পূর্বপরিকল্পনা ও প্রস্তুতি থাকা দরকার।

২. রোগী সেবার মান বৃদ্ধিও জন্য কয়েকটি কর্মপদ্ধতি তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত মা, শিশু, নবজাতক, হৃদরোগ ও কিডনি ফেইলিওর রোগীদের চিকিৎসার জন্য আলাদা আলাদা সুপারিশ প্রদান করা হয়েছে।

৩. চিকিৎসাকর্মী, রোগী ও রোগীদের স্বজন বিশেষভাবে মানসিক চাপে থাকেন এবং উদ্বেগ, হতাশা ও ভীতিতে ভোগেন, তাদের মানসিক সহায়তার জন্য মনরোগ বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি সহায়তা প্যানেল গঠন করা হয়েছে। এই বিশেষজ্ঞরা টেলিফোনে পরামর্শ দেবেন।

৪. তীব্রভাবে আক্রান্ত বা মুমূর্ষু রোগীদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা বা Intensive Care এর প্রয়োজন। এজন্য যথেষ্ট নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র সারা দেশের সব কোভিড রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত হাসপাতালে তৈরি করা দরকার। এখানে যথেষ্ট সংখ্যক Ventilator ও অন্যান্য অনুসঙ্গিক যন্ত্রপাতি থাকা প্রয়োজন। যথেষ্ট সংখ্যক Anesthetist নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন। Anesthetist হিসাবে নিয়োগের উপযুক্ততা সম্পন্ন বেশকিছু সংখ্যক জনবল দেশে আছে। তাদেও জরুরিভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন।

Intensive Care পরিচালনার জন্য অব্যাহত অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা থাকা অত্যাবশ্যকীয়। এজন্য Liquid oxygen সরবরাহ, oxygen concentrator পর্যাপ্ত অক্সিজেন সিলিন্ডার এর ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা সমূহের সাহায্য নেয়া দরকার।

৫. কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত হাসপাতালসমূহে তিন শিফটে ভাগ করে স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজ করার ব্যবস্থা থাকা দরকার। প্রতি শিফটে সমন্বয়ের জন্য প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য থাকা প্রয়োজন।

৬. কোভিড শনাক্তের জন্য টেস্ট আরও বেশী সংখ্যায় ও বেশী স্থানে করা দরকার যাতে টেস্টের ফলাফল আরও দ্রুত জানা যায়। কোভিড-১৯ এর জন্য নিয়োজিত ল্যাবরেটরিসমূহ বায়োসেফটি লেভেল-২ অনুযায়ী পরিচালনা করা উচিত। এই ল্যাবরেটরিসমূহে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত থাকা দরকার। বায়োসেফটি ক্যাবিনেটসমূহ নিয়মিতভাবে ক্যালিব্রেশন করা দরকার, এ জন্য সার্টিফায়েড ইঞ্জিনিয়ার প্রয়োজন হবে। স্বল্প মেয়াদে ৫ লাখ টেস্টিং কিট সংগ্রহ করা অতীব জরুরি।

Reference Laborator-তে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নমুনা পাঠিয়ে প্রতিটি ল্যাবরেটরি iquality assurance করা অতীব জরুরি। Sample collection, transportation ও storage যথাযথ হওয়ার জন্য জনবলকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ল্যাবরেটরি যাতে প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে তার ব্যবস্থা করতে হবে। টেস্টের কেন্দ্র সংখ্যা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনে উন্নয়ন সহযোগীদের সাহায্য নেয়া প্রয়োজন।

৭. (ক) বর্তমানে শুধুমাত্র উপসর্গসহ যেসব রোগী কোভিড নির্ণয় কেন্দ্রসমূহে আসেন, তাদেরই পরীক্ষা করা হচ্ছে। এ রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করার জন্য community-তে যে সমস্ত মানুষের উপসর্গ আছে কিন্তু রোগনির্ণয় কেন্দ্রে আসছেন না, তাদের খুঁজে বের করে টেস্টের আওতায় আনতে হবে।

(খ) রোগের প্রাদুর্ভাবের ভিত্তিতে (বেশি, মাঝারি ও কমসংখ্যক) এলাকা চিহ্নিত করতে হবে। এই অনুযায়ী Response Team-এর কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করে রোগ containment-এর ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য Contact tracing করতে হবে।

(গ) যে সমস্ত ঘনবসতি এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ (যেমন- শহরের বস্তি, পোশাক কর্মীদেও বাসস্থান), সেখানে কোন ব্যক্তি রোগাক্রান্ত এবং তার হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন না হলে, সে যেন Isolation-এ থাকতে পারে এমন বাসস্থানের ব্যবস্থা (Dormitor) করতে হবে।

(ঘ) সামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশ হিসেবে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা পর্যায়ক্রমে শিথিল করার জন্য বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করা প্রয়োজন।

৮. এ রোগের জন্য ভ্যাকসিন তৈরির প্রক্রিয়ায় Clinical trial বিশ্বেও বিভিন্ন দেশে শুরু হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় উন্নয়নশীল দেশসমূহও যুক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ ও বৈজ্ঞানিকদের এ Clinical trial সমূহে সংযুক্ত হওয়ার প্রচেষ্টা থাকা প্রয়োজন। সফল ভ্যাকসিন তৈরি হওয়ার পর বাংলাদেশের সমগ্র জনগণ যাতে এ ভ্যাকসিন পায় সেজন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এখন থেকেই সচেষ্ট থাকা দরকার।

লাইটনিউজ/এসআই