বাংলা ও বিশ্বের সকল খবর এখানে
শিরোনাম

আবু’র ভার্চুয়াল জগৎ ও কোভিড-১৯

ভার্চুয়াল জগত সমন্ধে বিশাল আগ্রহ আবু’র। এই ভার্চুয়াল কথাটার সাথে পরিচিত হওয়ার পর থেকেই দারুনভাবে এক্সাইটেড সে। আবু শুনেছে এক সময় জীবন-যাত্রার সবই হবে ভার্চুয়ালি। অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ, বাজার-হাট, চিকিৎসাসেবা সবই। আবু ভাবে, সত্যি-সত্যি সবকিছু ভার্চুয়ালি হলে কতই না মজা হবে। নিয়ম মেনে অফিসে যেতে হবে না। বাজারে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বাচ্চাদের স্কুলে কিংবা টিউশনে নেয়ার তাড়া হুড়া নেই। তবে কিছুটা আফসোসও আছে আবু’র, কারণ ততদিন কি সে বেঁচে থাকবে?

আবুর মাথায় হারানো দিনের স্মৃতিগুলো ঘুরপাক খায়। রেডিও’র সেই দুর্বার, সন্ধ্যা সাতটা পঁয়ত্রিশ মিনিটে, বুধবার ও শনিবার, সৈনিক ভাইদের জন্য ছায়াছবির গানের অনুরোধের আসর। তখনকার সবচেয়ে বিখ্যাত সেই অনুষ্ঠান। তারপর এল ক্যাসেট প্লেয়ার। কত গান যে শোনা হয়েছে, তখনকার যুগের বিখ্যাত সব গান-মালকা-বানুর দেশেরে, বিয়া’র বাদ্যবালা বাজেরে, কিংবা মেরে পিয়া গয়ে রাঙুন ওহাসে কিয়া হয় টেলিফুন। আর মান্নাদে কিশোর কুমারের গান তো বলাই বাহুল্য। তারপর বø্যাক এন্ড হোয়াইট টিভি, পরিবারের সবার সাথে আয়োজন করে সাপ্তাহিক নাটক দেখা, মাসে একবার সিনেমা, এবং সিরিয়াল নাটকের একটি পর্ব দেখার পর, পরবর্তি পর্বের জন্য পনের দিন অপেক্ষা। রমজান মাসে তারাবির নামাজের কারণে যারা সিরিয়াল দেখা থেকে বঞ্চিত, তাদের জন্য ঈদের পরে পুণঃপ্রচার। সংযুক্ত হল রঙিন টিভি ও ভিসিআর, এ’তো বড়লোকদের ব্যপার-সেপার। বিশ টাকায় দোকান থেকে ভাড়ায় ক্যাসেট এনে হিন্দি সিনেমার ধুম। আবু প্রথম যেদিন টিভির রিমোট কন্ট্রোল দেখলো, নিজের দু’চোখকে বিশ্বাসই করতে পারছিল না। টিভি থাকবে দূরে আর সোফায় বসেই কন্ট্রোল করা যাবে, এ এক অবিশ্বাস্য ব্যপার।

ইতিমধ্যে টেলিফোনে এন ডবলিউ ডি এবং কোথাও কোথাও আই এস ডি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কি মজা, তার মানে সরাসরি ডায়াল করে দেশের যে কোন জায়গায় কথাবলা যাবে, আবার বিদেশেও বলা যাবে, অথচ এই কদিন আগেও একটা ট্রাঙ্ক কল বুক করে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। আর পোস্ট-অফিস, সে তো বিরাট এক কর্মযজ্ঞ। আপন জনের চিঠি, পার্শ্বেল, মানি অর্ডার, চাকরি সংক্রান্ত বিষয় আরো কত কি? জরুরী বার্তা থাকলে টেলিগ্রাম তো আছেই।

বাস্তবে ফিরেআসে আবু, চোখ বুজলেই দেখতে পায় তার স্মৃতিতে ভেসে ওঠা সবগুলো কাজ এখন একটি মাত্র যন্ত্র দিয়ে করা যায়। স্মার্ট ফোন। কি আশ্চর্য্য! একটি মাত্র যন্ত্র সকল সমস্যার সমাধান। বিজ্ঞানের কি অগ্রগতি। পৃথিবী এখন সকলের হাতে হাতে। নিমিষেই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে যোগাযোগ, ছবি সহ সরাসরি সম্প্রচার, আরো কত কি। আবু ভাবতে থাকে, কোথায় যেয়ে থামবে এই অগ্রযাত্রা, যার মেইল ট্রেন দ্রুত গতিতে ছুটছে তো ছুটছেই। যাঁরা কোন প্রতিবন্ধকতার কারণে এ ট্রেনে উঠতে পারছে না, তাাঁরা সমাজের কাছে এমনকি পরিবারের কাছেও নিজেকে বড়ই বেমানান ভাবছে।

এই অগ্রযাত্রার মহাযজ্ঞে যুক্ত হয়েছে সকল ধরণের সেবা। চিকিৎসা সেবাও পিছিয়ে নেই কোন অংশে। টেলি মেডিসিন, অনলাইন ডাক্তার, এয়ার এম্বুলেন্স, এসব ভাবতেও হিমসিম খায় আবু।

শুরু হল মহা প্রলয় কোভিড-১৯। আবু পাত্তাই দেয় না। ওসব পরাশক্তিওয়ালাদের ব্যাপার, বড়দের ব্যাপার, বড়রাই সমাধান করবে। যারা পুরো পৃথিবীকে এক যন্ত্রে বন্ধ করতে পারে। এক অস্ত্রে পুরো পৃথিবীকে ধ্বংশ করে দিতে পারে, তারা কি বসে আছে। এক ফু’তেই শেষ করে দিতে পারে এই সব ভাইরাস।

হতাশ হয় আবু, না! বড়রা শুধু এক ফু’তে সব মানুষকে শেষ করে দিতেই পারে, কিন্তু রক্ষা করতে পারছে না। যত গবেষণা সবই শুধু মানুষ মারার গবেষণা। মানুষ বাঁচার সফল কোন গবেষণা দেখতে পায় না আবু।

আবু’র সেই কল্পনার ভার্চুয়াল অফিস বাস্তবে শুরু হয়ে গেছে। যেতে হয় না অফিসে। বাচ্চার পড়াশোনা, বাজার-হাট সবই চলে ভার্চুয়ালি। সপ্নগুলোর বাস্তব প্রতিফলন দেখে’তো আনন্দে আত্মহারা হওয়ার কথা আবু’র। কিন্তু না, হতাশ আবু! এই রকম ভার্চুয়াল জগতই কি চেয়েছিল আবু? ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে। সকালে উঠে আবার সেই টেলিওয়ার্ক উইথ স্কাইপে মিটিং।

লেখক : শাকিল আহমেদ