বাংলা ও বিশ্বের সকল খবর এখানে
শিরোনাম

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা: ‘লকডাউন’ শিথিলের সিদ্ধান্ত

স্টাফ রিপোর্টার : করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে চলমান ‘লকডাউন’ শিথিলের যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, সেটি আত্মঘাতী হতে পারে – এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, চলমান ‘লকডাউনে’ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নেয়া নানা পদক্ষেপেও তা পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অনেক অঞ্চলেই সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব এখন অনুসরণ করা হচ্ছে না।

ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। এর মধ্যে যদি চলাফেরা নির্বিঘ্ন হয়, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ চলতি মাসের মাঝামাঝিতে করোনাভাইরাসের প্রকোপ ‘পিকে (চূড়া)’ উঠতে পারে।

এ অবস্থায় শপিং মল, দোকানপাট খোলা হলে, মসজিদগুলোতে জামাত শুরু হলে অবশ্যই সেখানে সংক্রমণ বেড়ে যেতেই পারে। আর লোকজন স্বাস্থ্যবিধি কতটুকু অনুসরণ করবেন, তা নিয়েও আছে যথেষ্ট সন্দেহ।

করোনা সংক্রমণ রোধে ২৬ মার্চ থেকে দেশে সাধারণ ছুটি চলছে। এতে গণপরিবহন, দোকানপাট ও শপিং মল বন্ধ আছে। পাশাপাশি মসজিদগুলোতে জামাতে নামাজ পড়াও বন্ধ রয়েছে। কিন্তু সোমবার সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ঈদের কেনাকাটার

জন্য দোকানপাট ১০ মে থেকে সীমিত আকারে খোলা রাখা যাবে। আবার বুধবার ধর্ম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার জোহরের ওয়াক্ত থেকে স্বাস্থ্যবিধি ও দূরত্ব রক্ষার নিয়মসহ কিছু শর্ত মেনে সুস্থ ব্যক্তিরা মসজিদগুলোতে জামাতে নামাজ পড়তে পারবেন।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, চলমান ‘লকডাউন’ সম্পূর্ণ কার্যকর না হলেও যতটুকু হয়েছে, সেজন্যই এখন পর্যন্ত আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা এখনও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আছে। এরমধ্যে কিছুদিন আগে গার্মেন্ট খুলে দেয়া হল আর ১০ মে থেকে যদি দোকানপাট ও শপিং মলও খুলে দেয়া হয়, তখন সংক্রমণ বাড়ার শঙ্কা আরও বহুগুণে বেড়ে যাবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রায় ৬০ শতাংশই ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে। আর তাই এ দুই এলাকার ব্যাপারে সাবধানতা আরও বেশি প্রয়োজন। চিন্তার বিষয় হল, বেশিরভাগ গার্মেন্ট কারখানাও এ দুই জেলা ও গাজীপুরে অবস্থিত।

যুক্তরাষ্ট্রের পরিসংখ্যান বলছে, বুধবার তাদের আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ লাখে। অথচ প্রথম ৫০ দিনে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ছয় হাজারের মতো। আর বাংলাদেশে প্রথম ৫০ দিনে আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ১০ হাজার। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, আমাদের দেশে শঙ্কা এখনও রয়েই গেছে।

করোনা সংক্রান্ত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির অন্যতম এক সদস্য টেলিফোনে বুধবার বলেন, মে মাসের মাঝামাঝি দেশে করোনাভাইরাসের একটি পিক দেখা দিতে পারে। যার উপস্থিতি ইতোমধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে লকডাউনের সব নির্দেশনা ঠিকভাবে মানতে হবে। যেমন অপ্রয়োজনে বাসা থেকে বের না হওয়া, জরুরি প্রয়োজনে বাইরে গেলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করা এবং দূরত্ব বজায় রাখা ইত্যাদি।

লকডাউনের এসব অবশ্য পালনীয় নির্দেশনা না মানলে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তিনি বলেন, যখন এ নির্দেশনাগুলো পালন করা বাধ্যতামূলক, ঠিক সেই সময় শপিং মল, মসজিদ খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

ফলে জনসমাগম কোনো ভাবেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না। এসব স্থান থেকে সামাজিক সংক্রমণ আরও ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়বে। ইউরোপ বা আমেরিকার মতো নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়তে পারে দেশের করোনা পরিস্থিতি।

এ প্রসঙ্গে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, আমাদের দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হার বর্তমানে ঊর্ধ্বমুখী। গত কয়েকদিনে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জে মানুষ যেভাবে লকডাউন অমান্য করেছে, আগামী ৭-১০ দিনে দেশে সংক্রমণের হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

সুতরাং প্রতিটি মুহূর্ত এখন মূল্যবান। বিশ্বের কোনো দেশ সংক্রমণের এ পর্যায়ে লকডাউন শিথিল বা তুলে নেয়ার কথা চিন্তাও করেনি। একমাত্র সুইডেন করেছিল এবং মাত্র ২ সপ্তাহের মধ্যেই সেই ভুলের মাশুল তারা দেয়া শুরু করেছে। প্রতিদিন বাড়ছে তাদের মৃত্যুর সংখ্যা। এখন তারা নিজেরাই নিজেদের ভুলের জন্য অনুশোচনা করছে। লকডাউন শিথিল করার নামে যে কয়েকটি আÍঘাতী সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ নিয়েছে, সেগুলো অবিলম্বে বাতিল করতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি।

এদিকে তৈরি পোশাক কারখানা খোলা ও দোকানপাটে আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় সংক্রমণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। মঙ্গলবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে করোনাভাইরাস সংক্রান্ত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শ কমিটির বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে এমন মন্তব্য করেন তিনি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, সংক্রমণ কিছু বেড়েছে। যেহেতু এখন স্বাভাবিকভাবেই মার্কেট খোলা হয়েছে (খোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে), গার্মেন্ট খোলা হয়েছে, দোকানপাটে আনাগোনা বাড়ছে – কাজেই সংক্রমণ যে বৃদ্ধি পাবে, এটি আমরা ধরেই নিতে পারি। আমাদের যতটুকু সম্ভব এটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক আরও বলেন, দেশব্যাপী চলমান লকডাউন খোলার ব্যাপারে ১৭ সদস্যের বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্ব^য়ে গঠিত করোনা টেকনিক্যাল কমিটি সরকারকে পরামর্শ দেবে। একই সঙ্গে ঈদে শপিং মল, দোকানপাট বন্ধ রাখা হবে কিনা সে ব্যাপারেও কমিটি সরকারকে পরামর্শ প্রদান করবে। দেশের এ উচ্চ শ্রেণির বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতামত অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে সরকার। তারপর সরকারের যে নির্দেশনা থাকবে, সে অনুযায়ী কাজ করা হবে।

কিন্তু টেকনিক্যাল কমিটির এ ধরনের সিদ্ধান্ত দেয়ার কোনো এখতিয়ার নেই বলে জানান কমিটির অন্যতম সদস্য অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলান।

তিনি বলেন, টেকনিক্যাল কমিটির কার্যপরিধিতে এসব বিষয়ে পরামর্শ দেয়ার কথা উল্লেখ নেই। এ পর্যন্ত লকডাউন শিথিল করার বিষয়ে সব সিদ্ধান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গ্রহণ করেছে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে লকডাউন শিথিল করতে যেসব নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, সেগুলো এক প্রকার আত্মঘাতী – এমন মন্তব্যও করেন তিনি।