বাংলা ও বিশ্বের সকল খবর এখানে
শিরোনাম

বিপদে যখন কেউ নেই, পাশে আছে আল মারকাজুল-পাথওয়ে

স্টাফ রিপোর্টার : করোনাভাইরাসে অথবা করোনা উপসর্গ নিয়ে এমনকি অন্য কোনো রোগেও কারও মৃত্যু হলে তার মরদেহ দাফনের বেলায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি হয়। অনেক কবরস্থানে জ্বর, সর্দি কাশি ও শ্বাসকষ্টজনিত কারণে মৃতদেরও দাফন হবে না মর্মে সাইনবোর্ড লাগানো হয়। কোথাও কোথাও বিক্ষোভও করা হয়।

এর ফলে কোডিভ-১৯ ছাড়াও অন্যান্য রোগে মৃত্যুবরণকারীদের কবর দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়তে হয় স্বজনদের। তৈরি হয় নানা জটিলতা ও বিড়ম্বনা।

এমন অবস্থায় প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে মৃত ব্যক্তির মরদেহ দাফনে স্বেচ্ছায় দায়িত্ব নেয় আল মারকাজুল ইসলাম নামে একটি বেসরকারি সংগঠন। পরবর্তীকালে পাথওয়ে নামে আরও একটি বেসরকারি সংগঠনও এগিয়ে আসে করোনায় মৃতদের দাফনে। এর বাইরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকেও মৃতদেহ দাফনে একটি টিম গঠন করা হয়। এছাড়া বাহিনী হিসেবে পুলিশ এবং ব্যক্তি পর্যায়েও অনেকে দসফন টিমে অংশ নেয়।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে সরকারি হিসাবে জানা যায়, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত ১৩ জন মারা গেছেন। এ নিয়ে এই ভাইরাসে আক্রান্ত মোট ১৯৯ জন মারা গেলেন দেশে। এর মধ্যে ছয় জন রাজধানীর বাসিন্দা, তিন জন ঢাকা বিভাগের এবং চার জন চট্টগ্রাম বিভাগের। এই ১৩ জনের মধ্যে আট জন পুরুষ, পাঁচ জন নারী।

একদিনে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে দ্বিতীয় সর্বেচ্চ মৃত্যু ঘটেছে গত ২৪ ঘণ্টায়। এর আগে গত ১৮ এপ্রিল একদিনে সর্বোচ্চ ১৫ জন কোভিড-১৯ রোগী মারা যান।

মৃতদেহ দাফনে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে থাকা বেসরকারি সংগঠন আল মারকাজুল ইসলামের চেয়ারম্যান হামজা শহিদুল বলেন, করোনায় আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত আল মারকাজুল ইসলাম ১৬০ জনের মরদেহ ঢাকায় দাফন করেছেন। এর মধ্যে ২৫ জন ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। আর সব মিলে ঢাকা শহরে ২২০ জনের দাফন হয়েছে মারকাজুলের মাধ্যমে। ঢাকার বাইরে কোনো দাফন কাজে অংশ নেয়নি সংগঠনটি। ১৬০ জনের বাইরে যাদের দাফন করা হয়েছে তারা করোনা উপসর্গ অথবা করোনাভাইরাসের ভয়ে তাদের মরদেহ কেউ নিচ্ছিল না অথবা কোনো আত্মীয় স্বজন আসেননি।

তবে বাইরের মৃতদেহগুলো কারা দাফন করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের মরদেহগুলো সেখানকার কাউন্সিলর ও তার দল দাফন করেছেন। এছাড়া চট্টগ্রামসহ অন্যান্য স্থানে পুলিশসহ ও অন্যান্য সেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরা দাফন করেছে। আমরা ডিএমপিতে ১৫০ জনের মতো পুলিশ সদস্যকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি তারা সবখানে কাজ করছে।

আপনাদের ইকুইপমেন্ট সরবরাহ করছে কারা জানতে চাইলে মারকাজুল ইসলামের চেয়ারম্যান বলেন, সকল প্রকার ইকুইপমেন্ট স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে সরবরাহ করা হয়েছে। তবে তারা এখন পর্যন্ত কোনো ফান্ড দেয়নি। নিজেদের যানবাহনে চলছে সব কাজ। ১৮ জনের টিমে তিনজন নারী ও ১৫ জন পুরুষ রয়েছে। তারা সবাই দীর্ঘদিন ধরে ঘরবাড়ি ছাড়া। সবাই পরিবার ছেড়ে মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করেছে। তারা সবাই ভালো আছে। সংগঠনের অফিসেই তাদের খাওয়া দাওয়া ও থাকা চলছে।

এসব কাজ করতে গিয়ে কোনো সমস্যা বোধ করছেন কিনা জানতে চাইলে হামজা শহিদুল বলেন, আমরা সবচেয়ে বড় সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি, বাসায় যারা মৃত্যুবরণ করছেন তাদের মরদেহ আনতে গিয়ে দেখা যায়, লিফটে উঠতে দেয় না। তালা মেরে কোথায় যেন চলে যায়! বহুতল ভবন থেকে সিড়ি বেয়ে মরদেহ নিয়ে নামতে হয়। অনেক কষ্ট হয় মরদেহ নিয়ে নামতে। এই মানসিক সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার আহবান জানান সকলকে।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, শুধু মহামারি করোনাভাইরাসেই নয়, আইলার মতো ঘূর্ণিঝড় এবং বিভিন্ন সময় বন্যাসহ নানা দুর্যোগের সময়েও কাজ করেছি। এবারের মতো মানসিক সমস্যা কখনো দেখিনি। এ থেকে বের হওয়া দরকার। কারণ যে মারা গেছে তার সৎকার করা সবার কর্তব্য। শুধু মারকাজুল ইসলাম দাফন করবে আর দাফনে কেউ কোনো প্রকার সহায়তা করবে না, তা কী করে হয়।

রাজধানীতে পাথওয়ে নামে আরেকটি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। মৃতদেহ সৎকারের জন্য এগিয়ে আসে। ১৫ সদস্যের একটি টিম ভাড়ায় একটি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে একাজ করছে সংগঠনটি। সরকার বা স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে ন্যূনতম সহযোগিতাটুকুও পায়নি সংগঠনটি।

জানতে চাইলে পাথওয়ের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ শাহিন বলেন, কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তির মরদেহ দাফনে বেসরকারি সেচ্ছাসেবী সংগঠন পাথওয়ে সিরাজগঞ্জ ও কলাপাড়ায় দুইটি টিম গঠন করেছে। এর বাইরে ঢাকায় আমরা ১৫ সদস্যের একটি টিম গঠন করেছি। এখন পর্যন্ত আমরা মিরপুরের একজন করোনায় মৃত ব্যক্তির দাফন করেছি। আমরা প্রস্তুত আছি যেকোনো সময় ডাক পেলে জাতির ক্রান্তিলগ্নে ঝাঁপিয়ে পড়তে। তাছাড়া আমরা অনেককে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা রেখেছি।, যাদের কেউ ধরে না ছোঁয় না। কয়েকজনকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য অধিদফতরে বেশ কয়েকবার চিঠি দিয়ে এবং কল করেও কোনো প্রকার সহযোগিতা পাইনি। নানান ইকুইপমেন্টসহ নিজেদের সংস্থানেই সব কিছু চলছে। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদফতর আমাদের আরও বেশি সহযোগিতা করতে পারত বলে মনে করেন তিনি।

লাইট নিউজ