বাংলা ও বিশ্বের সকল খবর এখানে
শিরোনাম

লকডাউন শিথিল করায় চরম ক্ষোভ ১৪ দলের

লকডাউন’ শিথিলসহ দোকানপাট খুলে দেওয়ার বিপক্ষে ১৪ দল। এখনই সবকিছু খুলে দেওয়ার সময় আসেনি উল্লেখ করে ক্ষমতাসীন এই জোটের নেতারা মনে করেন, বাংলাদেশ এখন করোনাভাইরাসের পিক আওয়ার চলছে। এই সময় মানুষকে ঘরে থাকার বিষয়টি আরও কঠোরভাবে নিশ্চিত করা দরকার। কোন ধরনের শৈথিল্য সরকারের জন্য বুমেরাং হবে। সরকার ভুল পথে হাঁটছে মন্তব্য করে তারা দোকানপাট বন্ধসহ সার্বিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের বেশ কয়েকজন নেতা এসব কথা বলেন।

দেশে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের পর জনগণকে ঘরে থাকা সহজ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে সরকারি-বেসরকারি অফিস আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সব ধরনের পরিবহন চলাচল বন্ধসহ গত দুই মাস সার্বিক বিষযয়ে সতর্ক অবস্থানে ছিল সরকার। করোনাভাইরাস সংক্রমণের দুই মাসের মাথায় এখন দিন দিন সংক্রমণ বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশের বর্তমান করোনাকালকে ‘পিক আওয়ার’ বলে আখ্যায়িত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এরইমধ্যে সরকার রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠান গার্মেন্টস শিল্পকে খুলে দিয়েছে। আসন্ন ঈদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রবিবার (১০মে) থেকে দোকানপাটও খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গণপরিবহনসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান পর্যায়ক্রমে খুলে দেওয়ার আলোচনা চলছে। বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্টরা সরকারের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকও বলেছেন, এভাবে সবকিছু খুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে সংক্রমণ ও মৃত্যু আরও বাড়বে। তিনি টেকনিক্যাল কমিটির পরামর্শ নিয়ে সব কিছু খোলার সিদ্ধান্তের প্রস্তাব দেন।

ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোটের নেতারাও সমালোচনা করছেন এসব সিদ্ধান্তের। সরকার ভুল পথে চলছে উল্লেখ করে তারা বলেছে, লকডাউন খুলে দেওয়ার সময় এখনও আসেনি।

অবশ্য ১৪ দলসহ সংশ্লিষ্টরা করোনা মোকাবিলায় মানুষকে ঘরে আবদ্ধ রাখার নানামুখী সরকারি সিদ্ধান্তকে লকডাউন বলে আখ্যায়িত করলেও সরকার কেন্দ্রীয়ভাবে কোনও রকম লকডাউন ঘোষণাই করেনি। সরকারিভাবে শুধু বিশেষ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। আর সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন স্ব স্ব জেলা থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রত্যেকে নিজ নিজ জেলা লকডাউন করেছে। তাও কোথাও এই শব্দটি বলা হয়েছে, কোথাও হয়নি।

এদিকে সরকার রবিবার থেকে শপিং মল ও দোকানপাট খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও বেশ কয়েকটি শপিং মল ও মার্কেটের মালিক ও ব্যবসায়িক সমিতি নিজের আগে খুলবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিজেদের ও ক্রেতাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনা করে তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

শুক্রবার এক বিবৃতিতে ১৪ দলের পক্ষ থেকে শপিংমলে দোকানপাট খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে সরকারের প্রতি দাবি জানানো হয়েছে।

লকডাউন

পৃথক বিবৃতিতে ১৪ দলের শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কাস পার্টি লকডাউন খোলার কারণ সরকারের কাছে জানতে চেয়েছে। বিবৃতিতে দলটি বলেছে, কোন বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে লকডাউন ক্রমান্বয়ে শিথিল করে শপিং মল, দোকানপাট খোলার মধ্য দিয়ে সবকিছু প্রায় উন্মুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে তা দেশবাসীকে জানাতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার বলেন, সরকার নানা ধরনের কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়ে করোনাভাইরাসকে বেশ খানিকটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে। আরো দুই/চার সপ্তাহ এ ধরনের কঠোরতা অবলম্বন করা উচিত ছিল। করোনাভাইরাস সংক্রমণের যে সংকট সারা পৃথিবীতে দেখতে পাচ্ছি তাতে করে লকডাউন শিথিল করার সিদ্ধান্ত ভালো কিছু বয়ে আনবে বলে মনে করি না। এজন্য আমরা মনে করি সরকারের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা দরকার।

বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া বলেন, লকডাউন শিথিল করার সময় হয়েছে বলে আমি মনে করি না। সরকার মার্কেট খুলে দেওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছে তা আমাদের জন্য বুমেরাং হতে পারে।

গার্মেন্টসহ শিল্প কারখানা খুলে দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ইন্ডাস্ট্রিজ এসব খোলা হয়েছে সেখানে কোনও তদারকি দেখা যাচ্ছে না। কেবলমাত্র লেয়ার স্যানিটাইজার ব্যবহার করলে স্বাস্থ্যবিধি মানা হয় না। তাদের পরীক্ষা ও কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করা হয়নি। যেভাবে স্বাস্থ্যবিধি পালন করা উচিত তা হচ্ছে না। আমি মনে করি এই মুহূর্তে সরকার ভুল রাস্তায় আছে। তারা পুরো বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে সঠিক লাইনে ফেরত আসবে সেই প্রত্যাশা করি। স্বাস্থ্যবিধি মানতে আরও কড়াকড়ি আরোপসহ আরও কিছুদিন লকডাউন পরিস্থিতি অব্যাহত রাখবে বলে মনে করি। বাংলাদেশে এখনও নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার দিক দিয়ে অদক্ষ বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সবকিছু খুলে দেওয়ার জন্য আমরা এখনও প্রস্তুত নই।

তবে সরকারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া। তিনি বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণের এই সময় লকডাউন তুলে দেওয়া যেমন বিপদ আবার বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দীর্ঘদিন সবকিছু বন্ধ রাখাও বিপজ্জনক। বাস্তবতা মূলত শাঁখের করাতের মতো। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা বিজ্ঞচিত ও সময়োচিত।

এর আগে ওয়ার্কাস পার্টি তার বিবৃতিতে করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতার মধ্যে কোন বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে লকডাউন ক্রমান্বয়ে শিথিল করা হচ্ছে তা জানতে চেয়ে বলেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সব খুলে অর্থনীতি সচল করার তাগাদা দিলেও দেশটির বিশেষজ্ঞ, পরামর্শক ডা. ফাউসি সবকিছু খুলে না দেওয়ার পক্ষে অটল রয়েছেন। ব্রাজিলেও দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী করোনা পরিস্থিতিতে সব সচল রাখার ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট বলসোনারোর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। তাতে তিনি মন্ত্রীত্বও হারিয়েছেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিশেষজ্ঞদের সরকারকে বলতে হবে, করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা যখন ঊর্ধ্বমুখী, তখন সব চালু করার সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী কিনা। জনমনে করোনা নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, এ বিষয়ে স্পষ্ট করে বললেই জনগণের মধ্যে আস্থা ও স্বস্তি ফিরবে।

১৪ দলের পক্ষ থেকে এক যৌথ বিবৃতিতে চলতি মাসে দেশে করোনার ত্রাস বাড়ার আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলা হয়, সাধারণ মানুষ নানা অজুহাতে ঘর থেকে বের হচ্ছে। এর মধ্যে শপিংমল, বিপণিবিতান ও দোকানপাট খুলে দেওয়া হলে মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আইন মানানো কঠিন হয়ে পড়বে। তাই এ সময়ের এই ধরনের একটি সিদ্ধান্তে করোনাভাইরাস আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

লাইটনিউজ/এসআই