বাংলা ও বিশ্বের সকল খবর এখানে
শিরোনাম

এই গরমে কী খাবেন কী খাবেন না

 

* গরমকালে ডায়েটের প্রধান শর্ত পানি। গরমে ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে অনেক পানি ও খনিজ লবণ বের হয়ে যায়। ফলে পানিশূন্যতা ও খাবারে অরুচি দেখা দেয়। তাই স্বাভাবিক সময়ে আপনি যদি ন্যূনতম দুই লিটার পানি পান করে থাকেন তাহলে এ সময় পান করুন সাড়ে তিন লিটার। তবে শুধু সাড়ে তিন লিটার পানি খাওয়া অধিকাংশ সময়ই কষ্টকর। সে ক্ষেত্রে পানীয় হিসেবে টক দই দিয়ে লাচ্ছি, দেশীয় ফল যেমন বেল, তরমুজ, লেবু ও বাঙ্গির শরবত খেতে পারেন। ইসবগুলের ভুসিও খেতে পারেন। কিংবা খেতে পারেন ডাবের পানি।

* এ ছাড়া ওভালটিন, দুধ, মিল্কশেক, হরলিকস, মালটোভা ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে।

* রোদ থেকে এসে বা অতিরিক্ত পরিশ্রমের পর সঙ্গে সঙ্গে ঠাণ্ডা পানি বা খাবার খাওয়া ঠিক নয়। প্রচণ্ড রোদে বা খুব পরিশ্রমের পর পাকস্থলীর কর্মক্ষমতা কিছুটা হ্রাস পায়। তাই এ সময় প্রথমে সাধারণ তামপাত্রার পানি পান করুন। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে তারপর ঠাণ্ডা পানি বা অন্যান্য খাবার গ্রহণ করুন।

* গরমে পানি ও জুস বেশি খেতে বলা হয়। তবে চিনি ছাড়া শুধু ফলের জুস খেতে হবে। অনেক সময় জুসকে সুস্বাদু করার জন্য চিনি, ক্রিম বা ঘন দুধ ব্যবহার করা হয়। এতে ওজন বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই শুধুই ফলের রস খান। স্বাদ বাড়াতে বিট লবণ, গোলমরিচের গুঁড়া মেশাতে পারেন। আবার যাঁদের অনেক বেশি ঘাম হয় তাঁরা পানি ছাড়াও দিনে এক প্যাকেট খাবার স্যালাইন খেতে পারেন। ডায়রিয়া আক্রান্তরা পায়খানা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত স্যালাইন খাবেন। তবে যাঁরা উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি রোগে আক্রান্ত তাঁরা খাবার স্যালাইন বা অতিরিক্ত পানি খাওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।

* কোল্ড ড্রিংকস বাদ। এর বদলে গ্লুকোজের পানি পান করতে পারেন। শরীর ঠাণ্ডা রাখার জন্য এ সময় কাগজি লেবু, আম, তেঁতুল, বেল, ঘৃতকুমারী (অ্যালোভেরা) ও তোকমা দিয়ে শরবত তৈরি করে খাওয়া যেতে পারে। বিভিন্ন ফলের রস বা জুস ভিটামিন ‘এ’, ‘সি’ ও অন্যান্য ভিটামিনের চাহিদা পূরণ করে। ইসবগুলের ভুসির শরবতও খুবই উপকারী। এটি কোষ্ঠকাঠিন্য, অন্ত্র ও পাকস্থলীর প্রদাহ, রক্ত আমাশয় ইত্যাদি উপশমে বেশ কার্যকর।

* খুব বেশি চা, কফি পান করা উচিত নয়। কারণ চা, কফিতে ক্যাফেইন নামক পদার্থ শরীরের স্নায়ু উত্তেজিত করে ও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়, পানির পিপাসা তৈরি করে। খুব ইচ্ছে করলে লিকার চা পান করুন।

তেল মসলা আর ভাজা নয়

* গরমের সময় আমাদের পাকস্থলী এমনিতে নাজুক থাকে। অনেকের বদহজমের সমস্যা দেখা দেয়। তাই অতিরিক্ত তেল মসলার খাবার, বিশেষ করে গরু বা খাসির মাংস, বিরিয়ানি, কাবাব বাদ দিন। এগুলো হজমে সমস্যা করে, এমনকি এসিডিটিরও কারণ হয়। যদি খেতেই হয়, এর সঙ্গে পর্যাপ্ত পরিমাণ কাঁচা সবজির সালাদ খাবেন। সম্ভব হলে খাওয়ার আধাঘণ্টা আগে ও আধাঘণ্টা পরে পানি পান করুন। খাওয়ার পর আধাঘণ্টা হেঁটেও নিতে পারেন।

* অল্প ঝাল ও তেল মসলার তরকারি খাবেন। পারলে ঝোল তরকারি খাবেন। পানীয় জাতীয় খাবার শরীরের দূষিত পদার্থ টক্সিন বের করতে সাহায্য করে। তাই এ সময় লাউ, শসা, পেপের তরকারি খেতে পারেন।

* অনেকেই গরমের সময় ডিম খেতে চান না। কিন্তু শিশু ও টিনদের জন্য প্রতিদিন ডিম খাওয়া প্রয়োজন। তাই এ সময় ডিম ভাজা বা পোচ বদলে সিদ্ধ খেতে পারেন। এভাবে ডিম খেলে সহজেই হজম হবে।

* চর্বিযুক্ত খাবার যতটা সম্ভব বাদ দিন। ডুবোতেলে ভাজা খাবার একেবারেই না। এগুলো হজম হতে বেশি সময় নেয়। যেহেতু এ সময় শরীরে পানির চাহিদা বেশি থাকে সেহেতু এ ধরনের খাবার হজম হতে পানি বেশি দরকার হয়। তাই এগুলো বেশি খেলে বদহজম হতে পারে।

* এমন খাবার গ্রহণ করা উচিত, যা আমাদের শরীরকে ঠাণ্ডা ও সুস্থ রাখে। সবজি, ডাল ও পর্যাপ্ত পরিমাণ সালাদ খান। ফল, ফলের রস, সবজি ও সালাদ শরীরে পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং কর্মক্ষম রাখে শরীরকে।

* কম মসলার খাবার যেমন-জাউভাত, মাছের হালকা ঝোল, মুরগির স্যুপ, শসার স্যুপ, আলুর পাতলা ঝোল বা আলুভর্তা, কাঁচকলার পাতলা ঝোল বা ভর্তা ইত্যাদি খেলে শরীর সতেজ থাকবে। হাত-পা জ্বালা করার প্রবণতা দেখা দিলে ধনেপাতা ও পুদিনাপাতার চাটনি করে খেলে শরীর ঠাণ্ডা থাকবে। হজমের গোলমাল থাকলে এ সময় প্রতিদিনই দই খাওয়া যেতে পারে। চিনি খেতে আপত্তি থাকলে টক দই খাবেন।

গরমে এসিডিটি বাড়ে

গরমে অনেকের এসিডিটির সমস্যা বেড়ে যায়। গরমে ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে অনেক পানি বের হয়ে যায়। ফলে তৈরি হয় পানিশূন্যতা। অল্প কিছু খেলেও পেটে অস্বস্তি আর বদহজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর সহজ সমাধান হচ্ছে পানি ও তরল খাবার গ্রহণ করা। ভাজাপোড়া, তেল ও মসলাদার খাবার পরিহার করা। খাওয়ার পরই পানি খেলে পাকস্থলীর জারক রস পাতলা হয়ে যায়। এ কারণেও হজমের গণ্ডগোল ও এসিডিটি দেখা দেয়। খাওয়ার আধাঘণ্টা পর পানি খান। খুব পিপাসা পেলে খাওয়ার পর এক ঢোক পানি খেতে পারেন।

এ সময় প্রাণিজ আমিষের পরিবর্তে উদ্ভিজ্জ আমিষ খেতে পারেন। উদ্ভিজ্জ আমিষের মধ্যে উৎকৃষ্ট হলো ডাল। যাঁদের ডাল খেলে এসিডিটির সমস্যা হয় তাঁদের জন্য ডাল রান্না করার সময় ১০ মিনিট ভিজিয়ে রেখে তবেই রান্না করুন। এসিডিটি হবে না। প্রয়োজনে পাঁচমিশালি ডালও খেতে পারেন।

গরমে চাই তেতো

গ্রীষ্মের অন্যান্য সবজির সঙ্গে তোতো সবজি খান। সেটা করলা বা উচ্ছে হতে পারে। খেতে পারেন হেলঞ্চা শাক ও সজিনা। এতে আছে প্রচুর ভিটামিন ‘সি’ এবং ভিটমিন ‘এ’। গরমে পাকস্থলীতে পানির চাহিদাও বাড়ে। এ সময় পাকস্থলীর কর্মক্ষমতা কিছুটা হ্রাস পায়। তাই তোতো সবজির প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং পাকস্থলীর ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস করতে সাহায্য করে। করলার তোতো খাদ্য পরিপাক ক্রিয়াকে সহজ করে দেয়, যা বদহজম এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে। এ ছাড়া খনিজ লবণ এবং মিনারেলের ভালো উৎস করলা। এতে আছে ভিটামিন ‘বি’ কমপ্লেক্স, আয়রন, জিংক, পটাশিয়াম, ম্যাংগানিজ ও ম্যাগনেশিয়াম। ঘামের কারণে শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া খনিজের অভাব এতে কিছুটা পূরণ হতে পারে।

সবজি আর ফল

* দই, চিঁড়া, দুধ-মুড়ি, স্যুপ, সেমাই, ফালুদা খেতে পারেন।

* বাঁধাকপি, ঢেঁড়শ, কুমড়া, লাউয়ের মতো সবজিতে পানির পরিমাণ বেশি। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় তাই এসব সবজি রাখুন।

* খাবারে সবজি রাখুন। কয়েকটি মৌসুমি সবজি দিয়ে মিক্সড সবজি রান্না করুন। মুরগির মাংসের ঝোল সহজপাচ্য। গরমের দিনে ছোট মাছের একটি পদ প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন। সব ধরনের রান্নায় তেল ও মসলা খুব কম ব্যবহার করুন।

* গরমে সালাদ একটি উপাদেয় খাবার। অন্তত দুই বেলা দুই বাটি সালাদ খাওয়ার অভ্যাস করুন। দই, শসা, টমেটো, গাজর, কাঁচা পেঁপে, কাঁচা মরিচ, ধনেপাতা, পুদিনাপাতা মিশিয়ে সালাদ তৈরি করুন। চাইলে বিভিন্ন মৌসুমি ফল দিয়ে ফ্রুট সালাদও খেতে পারেন। তবে ফ্রুট সালাদ মূল খাবারের সঙ্গে না খেয়ে দুটি ভারী খাবারের মধ্যে নাশতা হিসেবে খান। ফলের সালাদে পেপটিন নামক পদার্থ থাকে, যা হজমে সহায়তা করে।

* বাচ্চাকে বাইরের কেনা খাবার, চকোলেট, চিপস বা কোল্ড ড্রিংকস থেকে বিরত রাখুন। চকোলেট আর্টিফিশিয়াল সুগার ও চিপসে টেস্টিং সল্ট থাকায় ক্ষুধামন্দা ভাব তৈরি হয়। আবার ফাস্ট ফুড, বিশেষ করে ফ্রাইড চিকেনে অতি মাত্রায় টেস্টিং সল্ট ও আটা ব্যবহার করা হয়। আর এই আটাতে আছে গ্লুটিন নামক পদার্থ, যা বাচ্চাদের স্নায়ু চঞ্চল করে ও ক্ষুধামন্দা ভাব তৈরি করে।

* বিদেশি ফলের চেয়ে দেশি ফল, বিশেষ করে টকজাতীয় ফল খেতে দিন। ফলের জুস না ছেঁকে খেতে দিন। পারলে আস্ত ফল খেতে দিন।

* বাচ্চাদের খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের জোগান হিসেবে যে শুধু মাছ-মাংস খাওয়াতে হবে, এটা ঠিক নয়। মাছ-মাংসের বিকল্প হিসেবে আমন্ড বাদাম ও কাজু বাদাম দিতে পারেন। তবে চিনা বাদাম না দেওয়াই ভালো। এটা গরমের সময় আরো ক্ষুধামন্দা ভাব তৈরি করে।

রোগব্যাধি থাকলে

* গরমকালে হিটস্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা, ঘামাচি, ডায়রিয়া, হাত-পা জ্বালা, হজমের গোলমাল, গরমজনিত ঠাণ্ডাজ্বর ইত্যাদি রোগে অনেকে আক্রান্ত হন। ফল ও সবজিতে বিদ্যমান অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ভিটামিন-মিনারেলস আপনার শরীরের পানি ও পিএইচ মাত্রা ব্যালেন্স করবে এবং ঠিক রাখবে সোডিয়াম-পটাশিয়াম লেভেলও।

* গ্রীষ্মের সময় প্রচুর আম পাওয়া যায়। এতে থাকে বিটাক্যারোটিন, যা শরীরে ভিটামিন ‘এ’ তৈরিতে সহায়তা করে। আরো আছে ল্যাকটোজ নামক পদার্থ, যা হজমে সহায়তা করে। গরমকাল জুড়ে যদি প্রতিদিন একটা আম খাওয়া যায় তবে সারা বছর ভিটামিন ‘এ’-এর চাহিদা হবে না। তবে ডায়াবেটিসের রোগীরা আম খাওয়ার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন।

বিশেষ করে যাদের অসুখ-বিসুখ আছে তারা অবশ্যই ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে খাবারের তালিকা ঠিক করবেন।

খেয়াল রাখুন

* গরমে রান্না করা তরকারি দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বাসি হওয়ার আগেই খেয়ে নিন। আর রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করার সময় ভালো করে ঠাণ্ডা করে বক্সে ভরে রাখুন।

* যেসব খাবার দ্রুত ব্যাকটেরিয়া সৃষ্টি হয় সেসব খাবার রান্না করে বা বানিয়ে সঙ্গে সঙ্গে খেতে হবে। যেমন ডাল, দুধ, সালাদ ইত্যাদি।

* রাস্তার পাশের রঙিন শরবত, আখের রস, কেটে রাখা তরমুজ কিংবা আনারস খাবেন না। এসব খোলা খাবার ডায়রিয়া, টাইফয়েড ও জন্ডিসের আশঙ্কা বাড়ায়। বাজারের প্যাকেটজাত রেডিমিক্স শবরতও খাবেন না। এগুলোতে প্রিজারবেটিভ থাকে। এ ছাড়া চিনির মাত্রা অনেক বেশি থাকে। তাই পানির ঘাটতি মিটলেও মিনারেলের অভাব পূরণ হয় না।

* যাঁদের সুগারের সমস্যা আছে তাঁরা মিষ্টিজাতীয় খাবার দিনে একবার পরিমিত পরিমাণে খাবে। এর বিকল্প হিসেবে টকজাতীয় ফল খাবেন।

* গরমে মাসল পেইন হলে অবশ্যই খাবার স্যালাইন খাবেন।

লাইট নিউজ