বাংলা ও বিশ্বের সকল খবর এখানে
শিরোনাম

কম গুরুত্বপূর্ণ খাতে কমছে হাজার কোটি টাকা

করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত অর্থনীতি সামাল দিতে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ খাতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

এরই অংশ হিসেবে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও বিদেশ ভ্রমণসহ ১৮ খাতে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয় কমানো হচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

করোনাভাইরাসের প্রভাব দীর্ঘায়িত হবে- এমন ধারণা থেকে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে যে অর্থ সাশ্রয় হবে, তা ব্যয় করা হবে স্বাস্থ্য খাতে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

অন্য যেসব খাতে ব্যয় কমানো হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- মুদ্রণ ব্যয়, চাকরিজীবীদের গৃহনির্মাণ ঋণ, মনিহারি ক্রয়, বিশেষ ব্যয়, পুরাকীর্তি ও স্মৃতিসৌধ সংস্কার, খুচরা যন্ত্রাংশ মজুদ ও মূলধন দ্রব্যাদি কেনাকাটা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, এই মুহূর্তে সরকারের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে হবে। বিদেশ ভ্রমণসহ অনেক অযৌক্তিক ব্যয় আছে যেগুলো বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি অনেক ধরনের কেনাকাটা হয় সরকারি অফিসগুলোতে। এসব কেনাকাটা প্রয়োজন না হলে কম করতে হবে। এর ফলে সাশ্রয়ী অর্থ দিয়ে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করতে হবে। কারণ বাজেটের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত টিকে থাকার। এজন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ থাকতে হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ব্যয় মোকাবেলার পরিকল্পনায় মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় বলা হয়, কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উৎপাদন খাতে ক্রিয়াশীল সূচকগুলো অনেকাংশে অচল হয়ে পড়েছে। যার ফলে হুমকির মধ্যে পড়েছে লাখ লাখ মানুষের আয় ও জীবন-জীবিকায়।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়ায় রাজস্ব আয় কমেছে। অন্যদিকে করোনা মোকাবেলা করতে গিয়ে সরকারকে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে সরকার ১ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।

এসব উদ্যোগের কারণে ২০১৯-২০ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে এবং পরবর্তী তিনটি বছর সরকারের ব্যয় বেড়ে যাবে। এ জন্য অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

সূত্রমতে, আগামী অর্থবছরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব ধরনের দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষণকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কারণ করোনাভাইরাসের প্রভাব দীর্ঘ সময় থাকবে। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণকে নিরুৎসাহিত করা হয়। ফলে এ খাতে ব্যয় কম করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ বিভাগ।

প্রস্তাবিত বাজেটে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের জন্য এ খাতে ৩ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। আর চলতি বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ আছে ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ আগামী বছর এ খাতে ১০৮ কোটি টাকা ব্যয় কমানো হচ্ছে।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থা ও বিভাগে সারা বছর মুদ্রণ, প্রকাশনা ও প্রিন্টিং, মনিহারি দ্রব্যাদি কেনাকাটা করতে হয়। এ খাতে চলতি বছরের তুলনায় প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ কমানো হয়েছে। বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২ হাজার ১৮৩ কোটি টাকা। কিন্তু চলতি বাজেটে এসব খাতে বরাদ্দ আছে ২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা।

মুদ্রণ, প্রকাশনা ও মনিহারি দ্রব্যাদি কেনাকাটা খাতে বরাদ্দ কমানো হয়েছে ১১২ কোটি টাকা। এছাড়া সরকারি কাজে বিভিন্ন ধরনের ফি, কমিশন ও চার্জ দিতে হয়। এটি বেশি হয় উন্নয়ন খাতে। আগামী অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় কমানো হয়েছে ১১৯ কোটি টাকা।

আরও জানা গেছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থার জন্য বিশেষ ব্যয় নামে একটি বরাদ্দ প্রতিবছর রাখা হয়। এ বিশেষ ব্যয় থেকে নানা ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। আগামী বছর এ খাতে ব্যয় কমছে ১৮০ কোটি টাকা।

প্রস্তাবিত বাজেটে বিশেষ ব্যয় খাতে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ১ হাজার ১৭০ কোটি টাকা, চলতি বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ হচ্ছে ১ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। এছাড়া অনগদ সামাজিক সহায়তা সুবিধা (নারীদের ক্ষমতায়ন, প্রশিক্ষণ, সামজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীদের সুযোগ সৃষ্টি) খাতে ব্যয় কমছে ১৯৮ কোটি টাকা।

প্রস্তাবিত বাজেটে এ খাতে ব্যয় করা হবে ৪ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা, যা চলতি বাজেটে বরাদ্দ আছে ৪ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা। অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা এ বিষয়ে বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে এসব কর্মকাণ্ড স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা সম্ভব হবে না। ফলে যেসব মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে তাদের ব্যয় কমানো হয়েছে।

সূত্র আরও জানায়, আগামী অর্থবছরে ব্যয় কমছে সরকারি চাকরিজীবীদের অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ খাতে ৭ কোটি টাকা, মূলধনী অনুদান খাতে ৬৩ কোটি টাকা, পুরাকীতি, স্মৃতিসৌধ সংস্কার খাতে ১ কোটি টাকা, উইপন সিস্টেম খাতে ২৯ কোটি টাকা, খুচরা যন্ত্রাংশ মজুদ খাতে ৭ কোটি টাকা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের খাদ্যদ্রব্য খাতে ৮৮ কোটি টাকা, তালিকাভুক্ত ত্রাণ সামগ্রিক খাতে ৫ কোটি টাকা, মূল্যবান দ্রব্যাদি কেনাকাটায় ১৮ কোটি টাকা, অচাষকৃত জৈব পদার্থ খাতে ১ কোটি টাকা ও সরকারি চাকরিজীবীদের ঋণ খাতে ১০ কোটি টাকা।

এদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সারা বছর কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য ব্যয় মেটাতে পরিচালনা ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৪৮ হাজার ১৮০ কোটি টাকা। এর থেকে উন্নয়ন খাতের ব্যয় বাদ দিলে প্রকৃত আবর্তক ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা।

চলতি বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ আছে ৯২ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে আবর্তক চলতি বাজেটের চেয়ে ১ হাজার কোটি টাকা কমানো হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট প্রণয়নের আগেই সব মন্ত্রণালয় ব্যয় কমানোর চিঠি দেয়া হয়। বিশেষ করে অযৌক্তিক ব্যয় বরাদ্দ যাতে না বৃদ্ধি পায় সেদিকে নজর দেয়া হয়েছে। কারণ করোনাভাইরাসের কারণে অনেক স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হবে। ফলে চাইলেও সেসব খাতে ব্যয় করা সম্ভব হবে না।

সার্বিক দিক বিবেচনা করেই ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

লাইট নিউজ