বাংলা ও বিশ্বের সকল খবর এখানে
শিরোনাম

লাদাখে চরম উত্তেজনা, উড়ছে জঙ্গি বিমান-ড্রোন

টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে লাদাখের গলওয়ানে। পশ্চিম লাদাখে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় চীন ও ভারতীয় বাহিনী কাছাকাছি অবস্থান করায় উত্তেজনা আরও বেড়েছে। সীমান্তের একদিকে উড়ছে চীনের সামরিক বিমান-ড্রোন-হেলিকপ্টার। অন্যদিকে চলছে ভারতীয় বাহিনীর রণপ্রস্তুতি। দুই দেশের সেনাবাহিনীকে হাই-অ্যালার্টে রাখা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার ভারত ও চীনের মধ্যে মেজর জেনারেল পর্যায়ের বৈঠক ফলপ্রসূ না হওয়ায় লাদাখ সীমান্তে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সোমবারের সংঘর্ষের জন্য ভারতকে দায়ী করে বেইজিং অনড় অবস্থানে রয়েছে এবং ভারতকে ত্রিমুখী সামরিক চাপে ফেলার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছে। অপরদিকে উসকানি দিলে ভারত সমুচিত জবাব দেবে বলে হুশিয়ারি দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।

এদিকে লাদাখে সংঘাতের পর ভারতে চীনবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে এবং চীনা পণ্য বর্জনের ডাক দেয়া হয়েছে। ভারতের ফোরজি নেটওয়ার্কে চীনা সরঞ্জাম ব্যবহার বন্ধেরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

গলওয়ানে ভারতের আরও কতজন সেনা নিখোঁজ রয়েছে তা স্পষ্ট করে জানাতে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে আহ্বান জানিয়েছেন কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। খবর আনন্দবাজার, এনডিটিভি, পিপলস টাইমস, রিপাবলিক ওয়ার্ল্ড, টাইমস অব ইন্ডিয়া ও বিবিসির।

বৃহস্পতিবার পশ্চিম লাদাখের গলওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা পর্যায়ের বৈঠক হয়। কিন্তু সীমান্ত থেকে সেনা প্রত্যাহার না করতে চীন অনড় থাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সেনা প্রত্যাহার বা ভূমির পরিবর্তন নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় সীমান্তে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি আরও বেড়েছে।

উপগ্রহের মাধ্যমে দেখা গেছে, ভারত ও চীন উভয়পক্ষই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গলওয়ান নদীর উত্তর তীরে এক স্থানে সংঘবদ্ধভাবে দুই শতাধিক ট্রাক দেখা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে নতুন সৈন্য এনে তাদের অ্যাকলেমাইটেশন (উচ্চতায় মানিয়ে নেয়া) করছে চীন। এছাড়াও বেশ কিছু সাঁজোয়া যানও দেখা গেছে।

নদীটির দক্ষিণ দিকে ভারতকে তুলনামূলক কম ভারি অস্ত্র মোতায়েন করতে দেখা গেছে। চীনের প্রতি মুহূর্তের পদক্ষেপের ওপর নজর রাখছে ভারত। সীমান্তের কাছে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে ভারতীয় বিমান বাহিনী। চীনের সঙ্গে প্রতিটি সীমান্তেই ভারতের অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

নিয়ন্ত্রণ রেখার খুব কাছে আরও বেশি সেনা নিয়োগ করা হয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে ভারতীয় নৌসেনা টহল বাড়িয়েছে। সব রকম পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য বিমান, নৌ এবং স্থলবাহিনীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

সোমবার রাতে লাদাখের ঘটনার পর ভারত বা চীন কোনো দেশই সরাসরি যুদ্ধের কথা বলেনি। কিন্তু দুই দেশের বিবৃতিতেই উত্তেজনার পারদ যথেষ্ট বেড়েছে। এরইমধ্যে বৃহস্পতিবার মেজর জেনারেল স্তরের বৈঠক ভেস্তে গেছে।

সামরিক বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলছেন, এতজন সেনার প্রাণহানি হওয়ার পর শিগগিরই সীমান্তে উত্তেজনা কমে যাওয়া কঠিন। দুই পক্ষের সেনাই প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তৈরি হয়ে আছে।

ভারতকে ত্রিমুখী সামরিক চাপে ফেলতে প্রচ্ছন্ন হুমকি চীনের

সাংহাই একাডেমি অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স ইন্সটিটিউটের রিসার্চ ফেলো হু ঝিয়াং বুধবার গ্লোবাল টাইমসকে বলেছেন, সীমান্ত পরিস্থিতি পরিবর্তনের কোনো ইচ্ছা আদৌ চীনের নেই। ঘটনাটি নিয়ন্ত্রণ রেখার চীনা অংশেই ঘটেছে।

এতে ভারতীয় পক্ষ থেকে পুরোপুরি উসকানি দেয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘ভারত একই সময়ে চীন, পাকিস্তান ও নেপালের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধে জড়িয়েছে। পাকিস্তান চীনের নির্ভরযোগ্য কৌশলগত অংশীদার। নেপালের সঙ্গেও বেইজিংয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

দুই দেশই চীনের প্রস্তাবিত বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তিনি বলেন, শুধু বেইজিংয়ের নয়, বরং পাকিস্তান ও নেপালের ত্রিমুখী সামরিক চাপে পড়তে পারে দিল্লি।

হু ঝিয়াং আরও বলেন, ভারত সীমান্ত উত্তেজনা বাড়িয়ে তুললে তারা দুটি বা এমনকি তিনটি ফ্রন্টের সামরিক চাপের মুখোমুখি হতে পারে। এটি ভারতকে একটি বিপর্যয়কর পরাজয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তিনি বলেন, ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের এ পরিস্থিতি ভুলভাবে নেয়া উচিত নয়।

কেননা, তাদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করেন, চীন-মার্কিন সম্পর্কের অবনতিশীল পরিস্থিতি দিল্লিকে বেইজিংকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সুযোগ করে দেবে। কেননা, চীন বা যুক্তরাষ্ট্র কারও জন্যই ভারত কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।

উসকানি দিলে সমুচিত জবাব দেবে ভারত

উসকানি দিলে তার সমুচিত জবাব দেয়ার ক্ষমতা ভারতের আছে বলে চীনকে কড়া ভাষায় হুশিয়ারি দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেন, ভারত শান্তি চায়, কিন্তু উসকানি দিলে পরিস্থিতি যাই হোক না কেন তার যোগ্য জবাব দেয়ার শক্তি ভারতীয় সেনাবাহিনীর আছে।

তিনি বলেন, ভারত সাংস্কৃতিক দিক থেকে একটি শান্তিপ্রিয় দেশ। আমাদের ইতিহাসও শান্তিপ্রিয়। আমরা কলিযুগে গোটা সংসারে শান্তি স্থাপন করেছি ও মানব সমাজের কল্যাণে প্রার্থনা করেছি। আমরা সবসময়ই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থান মেনে কাজ করে আসছি। আমরা সবসময় প্রতিবেশীদের অগ্রগতি ও কল্যাণে প্রার্থনা করেছি।

যেখানেই আমাদের মতের অমিল হয়েছে সবসময় চেষ্ট করেছি যে ভুল বোঝাবুঝি যেন না হয়। চেষ্টা করেছি মতপার্থক্য যাতে বিরোধে পরিণত না হয়। বুধবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আরও বলেন, আমরা কখনও কাউকে উসকানি দিই না। কিন্তু আমাদের নিজেদের দেশের একতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো সমঝোতা করি না। যখনই সময় এসেছে, তখনই দেশের একতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমাদের শক্তি প্রদর্শন করেছি, ক্ষমতা দেখিয়েছি।

ভারতের আরও কত সেনা নিখোঁজ, স্পষ্ট করে বলুন

বুধবার এক ভিডিও বার্তায় কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর উচিত জনসাধারণকে বলা কীভাবে চীন আমাদের জমি দখল করল? কীভাবে সেনাদের তারা হত্যা করল? সেখানকার বর্তমান পরিস্থিতি কী? কতজন সেনা নিখোঁজ? কতজন জখম? সোনিয়া গান্ধী বলেন, দেশের এ সংকটময় সময় সেনা, নিহত সেনার পরিবার ও সরকারের পাশে রয়েছে কংগ্রেস।

ভারতে চীনবিরোধী বিক্ষোভ জোরালো হচ্ছে

লাদাখের বিরোধপূর্ণ গলওয়ান উপত্যকায় সংঘর্ষের পর ভারতজুড়ে চীনা পণ্য বর্জনের ডাক দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে চীনের পতাকা, চীনা পণ্য এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের কুশপুত্তলিকা পুড়িয়েছে বিক্ষোভকারীরা। চীনের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে এবং বাণিজ্য সম্পর্ক খর্বেরও দাবি তুলছেন তারা। দিল্লির ডিফেন্স কলোনির নাগরিক কল্যাণ সংস্থা (আরডব্লিউএ) চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।

মোদির আসন উত্তর প্রদেশের বারানসিতেও চীনবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গ, পাটনা, বিহার, গুজরাটের আহমেদাবাদ, ভাদোদরা, সুরাটেও বিক্ষোভ হয়েছে।

ভারতে ফোরজি পরিষেবায় চীনা সরঞ্জাম ব্যবহারে বিধিনিষেধ

সীমান্তে ভারত সঞ্চার নিগম লিমিটেডের (বিএসএনএল) ফোরজি পরিষেবার উন্নতিতে কোনো চাইনিজ সরঞ্জাম ব্যবহার করা যাবে না- এমন নির্দেশ দিয়েছে দেশটির টেলিকম মন্ত্রণালয়। ফোরজি পরিষেবার উন্নতিতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের জন্য নতুন করে টেন্ডার ডাকার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

শুধু সরকারি টেলিকম সংস্থাই নয়, বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও চাইনিজ সরঞ্জাম বর্জনের ব্যাপারে অনুরোধ করার বিষয়টিও ভেবে দেখছে কেন্দ্রীয় সরকার। ভারতী এয়ারটেল এবং ভোডাফোন আইডিয়ার মতো টেলিকম সংস্থাগুলো তাদের বর্তমান নেটওয়ার্কগুলোতে হুয়াওয়ে-র সঙ্গে কাজ করে। অন্যদিকে জেডটিই কাজ করে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিএসএনএলের সঙ্গে।

লাইটনিউ/এসআই