কোরাল আইল্যান্ড

নাজির আহমেদ সরকার, থাইল্যান্ড : কোরাল আইল্যান্ড। থাইল্যান্ডে ঘুড়তে আসা পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষনীয় একটি জায়গা। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরে আন্দামান সাগরের পাড় ঘেষে অবস্থিত পর্যটনগরী পাতায়া। এই শহর থেকে একেবারেই কাছে অবস্থিত কোরাল আইল্যান্ড। ব্যাংকক শহর থেকে এখানে আসতে সময় লাগে মাত্র দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। এখানকার সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে প্রতিদিন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার পর্যটকরা আসেন।

পাতায় শহরের সমুদ্র সৈকত সড়কের পাড় থেকে প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে কোরাল আইল্যান্ড অভিমুখে যাত্রা শুরু করে অসংখ্য স্পিড বোড, ফেরি এবং ট্রলার। এ পথে ট্রলারে ভ্রমণ করা কোনো ভাবেই উচিৎ নয়। পাতায়া লাইট হাউজের সামন থেকে বেশ কিছু বড় জাহাজ এবং ফেরি পর্যটকদের নিয়ে সকাল ৮ থেকে ১০ পর্যন্ত কোরাল আইল্যান্ড অভিমুখে রহওয়না হয়। আবার ফিরে আসে বিকাল ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে। মূলত সমুদ্র স্নান সূর্যের পাত গ্রহণ, সিফুড উপভোগসহ বেশ কিছু কারণে বিশ্বব্যাপাী নাম কুড়িয়েছে কোরাল আইল্যান্ড।

শুধু তাই নয়, এখানে বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক স্পোর্টসও রয়েছে। যা বিভিন্ন বয়সী পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ব্যানানা বোট রাইড, সি বোট রাইড, প্যারাসিলিং, সিওয়ালকসহ আরো অনেক কিছু। তবে এই কার্যক্রমগুলোর জন্য পরিশোধ করতে হয় আলাদা আলাদা মূল্য।

কোরাল আইল্যান্ড অভিমুখে যাওয়ার পথে প্রথম যে ‘সি স্পোর্টস’ বা সামুদ্রীক খেলা হয় সেটি হলো প্যারাসিলিং বা প্যারাস্যুটে উড়া। এটি খুবই রোমাঞ্চকর। তবে ভীতিকর নয়। সমুদ্রের মাঝখানে স্থায়ীভাবে নোংগড় করা একটি বড় পল্টুনে থেকে প্যারাসিলিং করানো হয়। প্রথমে পর্যটকদের সেখানে স্পিড বোড থেকে নামানোর পর ঘোষণা করা হয় কারা এই ইভেন্টটিতে অংগ্রহণ করতে প্রস্তুত। এরপর তাদের কাছ থেকে নেয়া হয় নির্দিষ্ট পরিমানের অর্থ। তবে প্যারাসিলিং-এর মূল্য ১২’শ থেকে ১৫’শ থাই বাথ। যা বাংলাদেশি টাকায় ৩ হাজার ১ শত টাকা থেকে ৩ হাজার ৯ শত টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে গেলেই সব থেকে সাশ্রয় হয়ে থাকে।

এই ইভেন্টটিতে প্রথমে পর্যটকদের প্যারাস্যুটে ভালো আটকানো হয়। পরের ধাপে স্পিড বোডে আটকানো প্যারাশ্যুটটি নিয়ে দ্রুতগতিতে যাত্রা শুরু করে। আর প্যারাস্যুট আকাশে ভাসতে থাকে। এখাতে আকাশে ভাসতে হয় ১০ থেকে ১৫ মিনিট। তবে কেউ বেশি ভয় পেলে তার সঙ্গে একজন অভিজ্ঞ গাইডও দেয়া হয়। তবে যাদের হার্টের সমস্যা রয়েছে তাদের এটিতে অংশ না নেয়াই ভালো।

প্যারাসিলিং এর পরের ধাপে রয়েছে সি ওয়াক। এই ইভেন্টটিতে নির্দিষ্ট পরিমান অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে পর্যটকদের নিয়ে যাওয়া হয় সমুদ্রের তলদেশে। সেখানে ২০ থেকে ২৫ মিনিট অবস্থান করতে হয়। উপভোগ করা সযায় সমুদ্রের তলদেশের বিভিন্ন ধরনের দৃশ্য। কোরাল আইল্যান্ডে পৌছানোর পর রয়েছে দুপুরের খাবার। সেখানে ইন্ডিয়ান ও ওয়ের্স্টান ফুড পরিবেশন করা হয়। তবে কোরাল আইল্যান্ডে সব থেকে বেশি উপভোগ্য হলো সি ফুড। বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ এবং কাকড়া, স্কুইড, চিংড়ি, কোরাল মাছসহ নানা ধরনের সি ফুড পায়া যায় এই আইল্যান্ডটিতে।

শহরের তুলনায় এখানে খাবারের মূল্য খুব একটা বেশি নয়। তবে কোরাল আইল্যান্ডে ভ্রমন করার সময় অধিকাংশ পর্যটকরা মাছের বারবিকিউ খেতে অনেক পছন্দ করেন। এছাড়াও এখানে শাইল্যান্ডের বিভিন্ন ধরনের পর্যটন সুভেনীর পাওয়া যায়। যেগুলো বেশির ভাগ পর্যটক উপহার হিসেবে কিংবা শো-পিস হিসেবে সাজিয়ে রাখে। কোরাল আইল্যান্ডের রয়েছে বিভিন্ন ধরনের পোষাকের সমাহারও। কোরাল আইল্যান্ডে গেছে কিন্তু শরীর পানিতে ভেজায়নি এমন পর্যটক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তবে যারা প্রয়োজনীয় জিনিস ছেড়ে আসেন তাদের জন্য সুব্যবস্থা। প্রয়োজনীয় পোষাকও এখানে পাওয়া যাবে। তবে কিনতে হবে চড়া মূল্য দিয়ে।

কোরাল আইল্যান্ডের ঘুড়তে এসে পর্যটকরা সব থেকে বেশি সমস্যায় পড়েন তাদের ব্যবহার্য্য বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস পত্র নিয়ে যেগুলো তারা সাথে করে নিয়ে আসেন। একটি কথা না বললেই নয়, এখানে জিনিস পত্র হারানোর সম্ভবনা একেবারেই কম। তবুও কেউ চাইলে তাদের জিনিপত্র লকারে রাখতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ১ ঘণ্টার জন্য লকারের ভাড়া দিতে হবে ১০০ থাই বাথ বা ২৫০ টাকা। তবে এতে নিরাপদে থাকবে আপনার জিনিস।

এখানকার আরো একটি জনপ্রিয় খাবার হলো ডাব। কোরাল আইল্যান্ডে প্রায় সব খানেই ডাব পাওয়া যায়। তবে এটির দামও শহরের থেকে তুলনামূলক বেশি। এখানে একটি ডাবের মূল্য ৬০ থাই বাথ বা ১৬০ টাকা। যে কেউ চাইলে ঠান্ডা কিংবা নরমাল ডাব খেতে পারেন। থাইল্যান্ডের অন্যান্য শহরের মতো এখানেও ধুম্পানের জন্য বিশেষ স্থান রয়েছে। কেউ না জেনে এখানে উন্মুক্ত জায়গায় কিংবা পাবলিক প্লেসে ধুমপান করলে গুনতে হবে জরিমানা। দিতে হবে ২০০০ থাই বাথ কিংবা ৫ হাজার ৪’শ টাকা।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের পর্যটকদের মত বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছেও অত্যন্ত জনপ্রিয় এই কোরাল আইল্যান্ড। ঢাকা থেকে পাতায়ার কোরাল আইল্যান্ডে আসা মোহাম্মদ জামান বলেন, বেশ কয়ক দিনের ট্যুর পরিকল্পনা নিয়ে থাইল্যান্ডে এসেছি। তাই কোরাল আইল্যান্ড মিস করতে চাই না। পাতায়াতে মূলত আসা এ কারণেই। এখানে সব কিছুর দাম অন্যান্য স্থানের থেকে তুলনামূলক বেশি। তবে সব কিছুই প্রাকৃতিক। কোনো ভেজাল নেই। আর সমুদ্রের পানিও স্বচ্ছ। এখানে পর্যটকদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা। রয়েছে থাইল্যান্ডের ট্রেডিশনাল বা ঐত্যিবাহী খাবারসহ উন্নতমানের ভারত উপমহাদেশীয়, ইউরোপিয়ান, আমেরিকান খাবারের ব্যবস্থা।

কোরাল আইল্যান্ডের আয়তন খুব একটা বেশি নয়। তবে পাতায়া শহর থেকে অনেক কাছে হওয়ায় এখানে আসা পর্যটকরা খুব কম সময়ের মধ্যেই কোরাল আইল্যান্ডে যেতে পারেন। পাতায়া সমুদ্র সৈকত থেকে কোরাল আইল্যান্ডে যেতে সময় লাগে মাত্র ৩০ মিনিট। আর কোরালে পৌছানোর আগে বেশ কিছু সামুদ্রিক খেলাধুলা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে একটি হলো প্যারাসিলিং। এছাড়াও সি ওয়াক বা সমুদ্রের তলদেশে হাঁটা, সমুদ্রের নিচে ডুবে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এবং উদ্ভিদ দেখা।

থাইল্যান্ডের পাতায়া শহরের বিচ রোড সমুদ্র সৈকত থেকে প্রতিদিন সকাল ৮টায় শুরু হয় কোরাল আইল্যান্ড অভিমুখে যাত্রা। বিভিন্ন দেশের পর্যটকবাহী শত শত স্পিড বোড হাজার হাজার পর্যটক নিয়ে ছুটে চলে কোরাল আইল্যান্ডের দিকে। যাত্রার দ্বিতীয় ধাপে রয়েছে ‘সি ওয়াক’ বা সমুদ্রের নিচে হাঁটা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অসংখ্য পর্যটক এই সামুদ্রিক কার্যক্রমটির জন্য পাতায়াতে আসেন। আন্দামান সাগরের ৩০ থেকে ৪০ ফিট নিচে পর্যটকদের হাঁটিয়ে নিয়ে বেড়ানো হয়। মাথার ওপর অক্সিজেন ভাল্ব লাগানো অবস্থায় পানির গভীরে থাকতে হয় প্রায় আধা ঘণ্টা। রোমাঞ্চকর পর্যটকদের জন্য এটি একটি অন্যতম আকর্ষণ।

স্পিড বোডগুলো কোরাল আইল্যান্ডে যাওয়ার আগে সমুদ্রের একটি নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়ায়। সেখানেই করানো হয় ‘সি ওয়াক’ বা সমুদ্রে হাঁটা। যারা এই রাইডসটিতে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী তাদের স্পিড বোড থেকে একটি ছোট জাহাজে উঠানো হয়। মূলত ওই জাহাজটি সেখানে স্থায়ীভাবে সেখানে নোংগড় করা থাকে। জাহাজে পৌছানোর পর যে পর্যটকরা রোমাঞ্চকর এই স্পোর্টসটিতে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী তাদের আলাদা করা হয়। এরপর তাদের হাতে আলাদা রঙের একটি রশি বেধে দেয়া হয়। যেন তাকে সহজেই চিহ্নিত করা যায়। সেখানে তাদের পেমেন্ট করতে হয়। এটির মূল্য ১০০০ থেকে ২২০০ থাই বাথ হয়ে থাকে। অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় জনপ্রতি ২৬’শ থেকে সাড়ে ৫ হাজার পর্যন্ত হয়ে থাকে।

টিকিট সংগ্রহের পর দ্বিতীয় ধপে সমুদ্রের নিচে নামার আগে কিছু নিয়ম-কানুন শিখানো হয়। অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক একাধিক বার প্রশিক্ষণ দেন এবং অনুশীলন করান। প্রশিক্ষক বলে দেন পানির নিচে কি ভাবে কোন সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করতে হবে। মূলত ৪০ ফিট পানির নিচে কোনো সমস্যা হলে ডান হাত বা বাম হাতের বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে উপরের দিকে উঠানোর সংকেত দিতে হয়। আর সব ঠিক থাকলে বৃদ্ধা আঙুল এবং দ্বিতীয় আঙুল একত্রে লাগিয়ে ওকে সংকেত দিতে হয়।

তবে যাদের উচ্চতাজনিত সমস্যা কিংবা এয়ার প্রেসারের সমস্যা রয়েছে। তাদের জন্য প্রথম এক বা দুই মিনিট ভীতিকর মনে হতে পারে। দুই কানে তীব্র ব্যাথা অনুভব হতে পারে। তবে মাত্র দু থেকে তিন মিনিটের ব্যবধানে এই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। আর সমাধান না হলে মাথার ওপর লাগানো অক্সিজেন ভাল্বের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে মুখে কিছুটা অক্সিজেন নিয়ে নাক চেপে ধরে স্বজোরে ফু দিতে হয়। তাহলে এ সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।

মূলত সমুদ্রের নিচের উদ্ভিদ ও প্রাণী জগৎ দারুণভাবে উপভোগ করা যায় ‘সি ওয়াক’-এর মাধ্যমে। একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি সমুদ্রের নিচের জীব-বৈচিত্র সম্পর্কে একটু হলেও ধারণা পাওয়া যায়।

পানির ৫০ থেকে ৬০ ফিট নিচে ‘সি ওয়াক’ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা কর্মীরা সব সময়ই তৎপর থাকে। পিঠে অক্সিজেন সিলিন্ডার বেঁধে সব সময়ই দর্শনার্থীদের সংকেত দেয়। এরপর দুই পা সমানভাবে মাটিতে ফেলে খানিকটা হাঁটিয়ে নিয়ে বেড়ানো হয়। শুধু তাই নয়, পাউরুটির টুকরা দিয়ে মাছ একেবারে হাতের নাগালে নিয়ে আসে। সামুদ্রিক শৈবালগুলোকে হাতে স্পর্শ করে দেখার সুযোগ হয়।

লেখক : থাইল্যান্ড প্রবাসী, উপদেষ্টা- লাইট নিউজ বিডি।

Facebook Comments