বাংলা ও বিশ্বের সকল খবর এখানে
শিরোনাম

কতদিন থাকবে করোনাভাইরাস?

দশ মাস পর আবারো আগ্রাসী রূপ ধারণ করেছে করোনাভাইরাস। ডিসেম্বর ২০১৯ সালে চীনের উহানে উদ্ভূত হয়ে এই নতুন বৈশ্বিক মহামারির প্রকোপ মাঝে কিছুটা স্তিমিত হয়েছিল। আসন্ন শীতকালে দ্বিতীয় হামলার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। কোনো কোনো অঞ্চলে ভাইরাসের তীব্রতা বাড়ছেও। সবার মনে একটিই প্রশ্ন, ‘কতদিন থাকবে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস?’

অতীতের বৈশ্বিক মহামারি প্লেগ, ফ্লু, ইনফ্লুয়েঞ্জা দুই থেকে তিন বছর স্থায়ী হয়েছিল। রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সে সময় স্বাস্থ্য বিজ্ঞান তত উন্নত ছিল না। ফলে মহামারি প্রলম্বিত হয়েছিল।

কিন্তু একবিংশ শতকে বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনেক অগ্রসর। অনেক অত্যাধুনিক টেকনোলজি মানুষের করায়ত্ত। তথাপি সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের আগ্রাসন। থেমে থেকে বার বার মরণকামড় দিচ্ছে করোনা।

এতো প্রযুক্তি-তাড়িত উন্নয়নের পরেও ভ্যাকসিন কবে আসবে, তার কোনও স্পষ্ট উত্তর নেই গবেষকদের কাছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, গোটা বিশ্বে ৪২টি সম্ভাব্য প্রতিষেধক ক্যানডিডেটের হিউম্যান ট্রায়াল চলছে। এর মধ্যে ১০টি রয়েছে চূড়ান্ত পর্যায়ে। ফাইজ়ার এবং মডার্না, এই দুই মার্কিন সংস্থা দাবি করেছে, সব ঠিক থাকলে নভেম্বরে তারা সুখবর দিতে পারে। অক্সফোর্ডও বড়দিনে ভাল খবর দিতে পারে বলে ব্রিটেনে গুঞ্জন।

সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জাতিসংঘ জানিয়েছে, ২০২১-এর শেষের মধ্যে ভ্যাকসিন দেওয়ার জন্য একশো কোটি সিরিঞ্জ মজুত করবে তারা। যাতে ভ্যাকসিন তৈরি হয়ে গেলে ইঞ্জেকশন প্রয়োগের জন্য সিরিঞ্জের অভাব না হয়।

আশার বিপরীতে হতাশার চিত্রও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। ব্রিটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরেও, অর্ধেকের বেশি রোগী শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি, মানসিক অবসাদ— এ ধরনের উপসর্গে ভুগছেন। মাসের পর মাস গায়ে ব্যথা, প্রদাহ থেকে যাচ্ছে। গবেষকদলের প্রধান, অক্সফোর্ডের ‘র‌্যাডক্লিফ ডিপার্টমেন্ট অব মেডিসিন’-এর বেটি র‌্যামান জানিয়েছেন, ‘কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হওয়ার পরে শরীরের দীর্ঘমেয়াদি কী ক্ষতি হচ্ছে, তা নিয়ে আরও বিশদে জানা দরকার। সেটাই দেখিয়ে দিয়েছে এই গবেষণা।’ আবার ভ্যাকসিনের পরীক্ষামূলক প্রয়োগেও নানা বিভ্রান্তিকর ও হতাশাব্যাঞ্জক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

এদিকে হু হু করে বেড়ে চার কোটির গণ্ডি পেরিয়েছে বিশ্বে করোনা-সংক্রমণ। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি আক্রান্ত তিনটি দেশে— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং ব্রাজিল। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, গত সাত দিনে নতুন করে ২৫ লক্ষ মানুষ সংক্রমিত হয়েছেন। এ পর্যন্ত সব চেয়ে ভয়াবহ সপ্তাহ বলা হচ্ছে অক্টোবরের শেষ দিকের সপ্তাহগুলোকে।

বিশেষজ্ঞরা এতে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, ‘দ্রুততর গতিতে সংক্রমিতের সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম কারণ, করোনা-পরীক্ষা বাড়ছে। তাই আক্রান্ত ধরা পড়ছে বেশি।’ তবে বিপদের বিষয় হলো এটা যে, এমন বহুজন করোনা-সংক্রমিত রয়েছেন, যাদের শরীরে কোনও উপসর্গ নেই। অনেকে সংক্রমণ নিয়েই চলাফেরা করছেন। যদিও নিজস্ব প্রতিরোধে মানুষ বেঁচেবর্তে আছে, তথাপি কোনো দুর্বল ও নাজুক মুহূর্তে তাকে ধরাশায়ী করতে পারে করোনা।

আরেকটি ভয়ের বিষয় হলো, নতুন সংক্রমণ ও একবার সংক্রমিতদের পুনঃসংক্রমণ। ফলে করোনার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ও সামাজিক স্বাস্থ্য বিধি অব্যাহত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কমিউনিটি পর্যায়ে সংক্রমণ রোধে ইউরোপে উৎসব, অনুষ্ঠান ও জনসমাবেশের লাগাম টেনে ধরা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান উৎসব দুর্গাপূজায় জনসমাগম সীমিত করা হয়েছে।

এসবই করা হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী ভাইরাসের উপস্থিতিকে বিবেচনার মধ্যে রেখে, যা স্পষ্ট করে এই সত্যকে যে, ভাইরাস যায় নি বা সহজেই যাচ্ছে না। সঙ্গে সঙ্গে এই প্রশ্নও উঠে আসে যে, তাহলে কতদিন থাকবে করোনাভাইরাস? এর একটি উত্তর হতে পারে, যত তাড়াতাড়ি ভ্যাকসিন আসব তত তাড়াতাড়িই বিদায় নেবে করোনাভাইরাস।

আরেকটি আশার কথাও জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তা হলো, মানুষের অভিযোজন ক্ষমতা বাড়িয়ে স্বাস্থ্য বিধি মেনে ভাইরাসকে কাবু করে রাখা যেতে পারে। অতীতের প্লেগ, ফ্লু, ইনফ্লুয়েঞ্জা ইত্যাদি মহামারি প্রশমিত হলেও রোগগুলো কিন্তু চিরতরে নির্মূল হয়ে বা বিলুপ্ত হয়ে হারিয়ে যায় নি। টিকা ও মানুষের অভিযোজন ক্ষমতার কাছে পরাজিত হয়ে এখনো রয়ে গেছে।

করোনাভাইরাসের অস্তিত্বও অকস্মাৎ ভোজবাজির মতো লুপ্ত হবে, এমনটি আশা করা যায় না। বরং ভ্যাকসিনের প্রয়োগ ও মানুষের সর্বাত্মক সচেতনতার মাধ্যমে করোনাকেও পরাজিত এবং প্রশমিত করে রাখা সম্ভব হতে পারে। তখন ভাইরাসটি আর মহামারি আকারে ক্রিয়াশীল থাকবে না। হয়তো আর দশটা সাধারণ ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ার মতো নির্বিষ হয়ে থেকে যাবে।

তবে, প্রকৃত প্রস্তাবে, বিজ্ঞানের বাহাদুরি আর মানুষের সচেতন প্রচেষ্টাই নির্ধারণ করবে করোনাভাইরাসে থাকা, প্রশমিত হওয়া এবং বিদায় নেওয়ার বিষয়টি।