বাংলা ও বিশ্বের সকল খবর এখানে
শিরোনাম

যে কারণে বিপাকে পড়ছেন বাণিজ্যমন্ত্রী

কেজিতে দশ টাকা বেড়ে গত দুই দিনে কমেছে মাত্র দুই টাকা। এখনও অসহনীয় পর্যায়ে রয়েছে চালের দাম। কবে নাগাদ আগের অবস্থানে আসবে বা আদৌ আসবে কিনা তা জানেন না কেউই। গত তিন-চার মাস ধরে ক্রমাগত বাজারে বেড়েছে চালের দাম। বাজারে চালের সরবরাহ বাড়াতে আমদানির অনুমতি দিয়েও উদ্দেশ্য সফল হয়নি। পরবর্তীতে আমদানি উৎসাহিত করতে শুল্ক কমিয়েও চালের বাজার সহনীয় করা যায়নি। সরকার ভারতের সঙ্গে জিটুজি পদ্ধতিতে চাল আমদানি করছে। সেই চাল বাজারে আসতেও শুরু করেছে। কিন্তু চালের বাজার দর এখনও তেমন নামছে না।

অপরদিকে ভারত থেকে পেঁয়াজ বাংলাদেশে আসতে শুরু করায় বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। কারণ, মিসর ও তুরস্ক থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ এখন আর কেউ কিনছেন না। আমদানি করা তাদের এই পণ্যটি পচে যাচ্ছে। এতে তারা লোকসানের কবলে পড়ছেন। আবার ভারতের পেঁয়াজ আসা অব্যাহত থাকলে দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের দর পড়ে যাবে, এতে দেশের কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই পেঁয়াজের ওপর ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করেছে সরকার। তবে বাজারে এর প্রভাব কতটা পড়বে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এ দুটি পণ্য নিয়ে বিপাকে পড়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, দেশে চাল ও গমের বিষয়টি দেখভাল করার দায়িত্ব খাদ্য মন্ত্রণালয়ের। ধানের উৎপাদন দেখে কৃষি মন্ত্রণালয়। চাল বা গম আমদানির অনুমতি দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ধান ও গমের আমদানিতে শুল্কা আরোপ বা শুল্ক হ্রাসের বিষয়টি দেখার দায়িত্ব অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর)। কিন্তু চালের দাম বাড়লে বা পেঁয়াজ আমদানির সুযোগ রাখলে দেশের কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার জন্য সর্বমহল থেকে বাণিজ্যমন্ত্রী বা এই মন্ত্রণালয়কেই দায়ী করা হয়। অথচ চাল আমদানি বা উৎপাদনের কোনোটাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার নয়। তারপরও সমালোচিত হন বাণিজ্যমন্ত্রী। কিছুদিন ধরেও এ দুটি পণ্য নিয়ে খুবই বিব্রত ও বিপাকে রয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি।

তিনি জানিয়েছেন, চাল উৎপাদনের বিষয়টি দেখভাল করে কৃষি মন্ত্রণালয়। আর চালের মজুত ও বাজারে সরবরাহের বিষয়টি দেখভাল করে খাদ্য মন্ত্রণালয়। সেখানে উৎপাদন কম হলে বা বাম্পার হলে ব্যর্থতা বা কৃতিত্ব কোনোটার জন্যই দায় নেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। অপরদিকে মজুত কমে গেলে বা বাড়তি থাকলে এর ব্যর্থতা বা কৃতিত্বও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর বর্তায় না। চাল উৎপাদনে ঘাটতি হলে আমদানি করার সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ারও নেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। এসব দায়িত্ব খাদ্য মন্ত্রণালয়ের। আমদানির সিদ্ধান্ত হলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অনুমতি দেয় মাত্র। অথচ চাল নিয়ে যেকোনও সংকটের জন্যই অনেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে দায়ী করেন। তবে চালের বাজারে দাম নিয়ে কেউ কোনও অভিযোগ করলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর তা মনিটর করে। এর জন্য সংস্থার কর্মকর্তারা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেল জরিমানা করেন।

অপরদিকে পেঁয়াজ উৎপাদনে দেশের কৃষকদের সুরক্ষা দিতে আমদানি নিরুৎসাহিত করতে আমদানিকৃত পেঁয়াজের ওপর শুল্ক আরোপের বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সুপারিশ করে মাত্র। শুল্ক আরোপ হবে কিনা, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি এনবিআরের ওপর নির্ভর করে। সেখানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এর বেশি কিছুই করার নাই। অথচ এর জন্য দায়ী করা হয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে।

এদিকে ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকারের সিদ্ধান্তহীনতার জন্য তারা ক্রমাগত লোকসান দিচ্ছেন। কৃষকের ঘরে উঠতে শুরু করেছে নতুন পেঁয়াজ। আবার আগের এলসি করা পেঁয়াজও ছেড়ে দিয়েছে ভারত। তাই ভারত থেকেও পেঁয়াজ আসছে। এমন পরিস্থিতিতে মিসর, তুরস্ক ও মিয়ানমার থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের বাজার ধসে পড়েছে।

উল্লেখ্য, গত ১৪ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিলে দেশের বাজারে হু হু করে বাড়তে থাকে এর দাম। বাজার সামলাতে বিকল্প দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমোদন দেয় সরকার। টিসিবির মাধ্যমে ট্রাকসেলের জন্য সরকার নিজেও আমদানি করে। গত ২৮ ডিসেম্বর ভারত আবার রফতানির বাজার খুলে দিলে আমদানির পেঁয়াজের চাহিদা একেবারেই কমে যায়। তবে এর আগে থেকেই নতুন মৌসুমের দেশি পেঁয়াজ বাজারে আসায় চাহিদা কমছিল। চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে দামও কমে অর্ধেকে। বিক্রেতারা জানিয়েছেন, এসব পেঁয়াজ হিমায়িত কনটেইনার থেকে নামানোর পর বেশি দিন ভালো থাকে না, পচে যায়।

চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক পেঁয়াজ খালাসের পরিমাণ ৫০ টনের কাছাকাছি নেমেছে। অথচ ভারত রফতানির দুয়ার খোলার আগে দিনে গড়ে খালাস হতো এক থেকে দুই হাজার টন। খালাস কম হওয়ায় বন্দরে পেঁয়াজের স্তূপও কমছে না। সব মিলিয়ে ২৬ হাজার টন পেঁয়াজ এখন বন্দরে আছে পড়ে আছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯৮ কোটি টাকা। এসব পেঁয়াজের এখন কী হবে, তা বলতে পারছেন না আমদানিকারক, টিসিবি কিংবা বিক্রেতারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পেঁয়াজ আমদানিকারক খোরশেদ আলী জানিয়েছেন, সরকারের পরামর্শে ও অনুরোধে আমরা অনেকটাই ব্যবসায়িক ঝুঁকি নিয়ে মিসর ও তুরস্ক থেকে পেঁয়াজ আমদানি করেছি। এখনও অনেক পেঁয়াজ খালাসের অপেক্ষায় বন্দরে পড়ে রয়েছে। এসব পেঁয়াজ বন্দরে থাকবে নাকি খালাস করবো কিছুই তো ভেবে পাচ্ছি না। কারণ, বাজারে এ পেঁয়াজের কোনও চাহিদাই নেই। তাই সুনিশ্চিত লোকসান, এটুকুই শুধু নিশ্চিত করে বলতে পারি।

অপরদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক সপ্তাহে (২৮ ও ২৯ ডিসেম্বর) চিকন চালের দাম ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৬৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অসচ্ছল মানুষের মাঝারি মানের পাইজাম ও লতাশাইল চালের দাম ১ দশমিক ৮০ শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি ৫৩ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ এই দাম বাড়ার আগের দিন ২৭ ডিসেম্বর বিদ্যমান চালের আমদানি শুল্ক ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। গত ৭ জুন তা থেকেও আরও ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক কমিয়েছে সরকার।

রাজধানীর কোনাপাড়া বাজার, কাওরান বাজার, বাদামতলী বাজার, সূত্রাপুর বাজার, শাহজাহানপুর, মালিবাগ বাজার, শ্যামবাজার, কচুক্ষেত বাজার, রহমতগঞ্জ বাজার, রামপুরা, মিরপুর-১ নম্বর বাজার, মৌলভীবাজার, মহাখালী বাজার, উত্তরা আজমপুর বাজারে খোঁজ নিয়ে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এসব বাজারের চাল ব্যবসায়ীরা জানিয়েছে, মিলারদের কারণেই চালের দাম বেড়েছে এ নিয়ে আর কোনও সন্দেহ নাই। সরকারের মন্ত্রীও এ তথ্য প্রকাশ্যেই জানিয়েছেন।

বিষয়টি সম্পর্কে চালকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী জানিয়েছেন, ধানের দাম বেশি, তাই চালের দাম বেড়েছে। ধানের দাম বাড়লে তো চালের দাম বাড়বেই, এটি তো স্বাভাবিক। ধানের দাম বাড়লে কেউ কৃষককে দায়ী করে না, কিন্তু ওই কারণে চলের দাম বাড়লে সবাই মিলারদের দোষ দেয়। প্রকৃতপক্ষে ধানের দামের কারণে মিলাররা এখন লোকসান দিচ্ছে, বিষয়টি সরকারের কেউই নজরে তুলছে না।

এ বিষয়ে সম্প্রতি কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক জানিয়েছেন, মিলারদের কারসাজিতেই বেড়েছে চালের দাম। চালকল মালিকরা (মিলার) নানা কারসাজি করে বাজারে চালের দাম বাড়িয়েছে। তিনি বলেন, চাল উৎপাদনে যে ঘাটতি হয়েছে তা মেটানোর জন্য সরকার ৫ থেকে ৬ লাখ টন চাল আমদানি করা হবে। সরকারি গুদামেও চাল কমে গেছে। গত বছর এই সময়ে সরকারি গুদামগুলোতে ১৩ লাখ টনের মতো খাদ্যশস্য থাকলেও এবার তা কমে ৭ লাখ টনে নেমেছে। এ জন্যই ৫ থেকে ৬ লাখ টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার জানিয়েছেন, চালের সরবরাহ বাড়াতে আমদানি করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে চালের আমদানি শুল্ক অস্বাভাবিক হারে কমানো হয়েছে। আশা করছি কয়েক দিনের মধ্যেই চালের বাজারে স্বস্তি ফিরবে।

লাইটনিউজ/এসআই