বাংলা ও বিশ্বের সকল খবর এখানে
শিরোনাম

বন্দরের অনুন্নত অবকাঠামো বাণিজ্য সম্প্রসারণে বাধা!

অর্থনৈতিক রিপোর্টার : অনুন্নত অবকাঠামো প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে নানান প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বাণিজ্যিক সংগঠনের নেতারা । এতে ব্যবসায়ীরা তাদের চাহিদা মতো পণ্য আমদানি -রফতানি করতে পারছেন না। ফলে সরকার যেমন বঞ্চিত হচ্ছে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আয় থেকে তেমনি ব্যবসায়ীরাও নানান ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছেন, ব্যবসায়ীদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে ধীরে ধীরে বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ এগিয়ে চলছে।

জানা যায়, দেশে মোট সরকার অনুমোদিত ২৪টি স্থলবন্দর রয়েছে। এর মধ্যে সচল রয়েছে ১২টি বন্দর। সবচাইতে বেশি বাণিজ্য হতো বেনাপোল বন্দর দিয়ে। কিন্তু অনুন্নত অবকাঠামোর কারণে বর্তমানে তার অবস্থাও অনেকটা নাজুক।

বাংলাদেশ স্থলবন্দরের পরিসংখ্যান সূত্র বলছে, গত ৫ বছরে দেশের সচল ১২টি স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে আমদানি হয়েছে ৭ কোটি ৫৯ লাখ ২৫ হাজার ৬৫৮ মেট্রিক টন পণ্য। এ সময় ভারতে রফতানি হয়েছে ৫২ লাখ ১১ হাজার ৬৬২ মেট্রিক টন পণ্য। পরিমাণের দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে বুড়িমারী বন্দর। আর রফতানিতে প্রথম বেনাপোল বন্দর। তাবে, পরিমাণের দিক দিয়ে আমদানিতে বেনাপোল বন্দর পিছিয়ে থাকলেও সব ধরনের পণ্য আমদানি আর রাজস্ব আয়ের দিক দিয়ে আবারও শীর্ষে বেনাপোল বন্দর।

সচল বন্দরগুলো হলো- বেনাপোল, সোনা মসজিদ, হিলি, বুড়িমারী, আখাউড়া, বিবির বাজার, বাংলাবান্ধা, টেকনাফ, ভোমরা, নাকুগাঁও, তামাবিল ও সোনাহাট। আর আমদানি-রফতানি চালু না হওয়া বন্দরের তালিকায় রয়েছে- তেগামুখ স্থলবন্দর, চিলাহাটি, দৌলতগঞ্জ, ধানুয়া কালামপুর, শেওলা, দর্শনা, কোবরাকুড়া, কড়ইতলী, বিরল, রামগড় ও ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দর।

চলমান ১২টি বন্দরের মধ্যে ৬টি সরকারি ও ৬টিতে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বাকি ১২টি স্থলবন্দর দিয়ে এখন পর্যন্ত বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়নি। স্থলপথে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত, মায়ানমার ও নেপালের বাণিজ্যিক কার্যক্রম সচল রয়েছে।

সবচেয়ে বেশি পরিমাণে আমদানির তালিকায় বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ২০১৯-২০ পর্যন্ত গত ৫ বছরে ভারত থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৩৫ লাখ ৫২ হাজার ৯২২ মেট্রিক টন। এ বন্দর দিয়ে ভুটান থেকে বেশির ভাগ আমদানি হয়েছে পাথর। আমদানিতে দ্বিতীয় বন্দরের অবস্থানে ভোমরা দিয়ে আমদানি হয় ১ কোটি ৩৪ লাখ ৪৫ হাজার ৭৩৬ মেট্রিক টন। তৃতীয় অবস্থানে সোনা মসজিদ বন্দর দিয়ে আমদানি হয়েছে এক কোটি ৮ লাখ ১১ হাজার ৫৬৫ মেট্রিক টন। চতুর্থ অবস্থানে বেনাপোল বন্দর দিয়ে আমদানি ৮৮ লাখ ৮৯ হাজার ৮১১ মেট্রিক টন। বেনাপোল বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া পণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত কাঁচামাল, তৈরি পোশাক, গার্মেন্টস, কসমেটিক্স, কেমিকেল, খাদ্যদ্রব্য, মাছ ও মেশিনারি যন্ত্রাংশ।

সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আয়ের তালিকায় গত ৫ বছরে বেনাপোল বন্দর থেকে কাস্টমস রাজস্ব আয় করেছে ১৬ হাজার ৯৭২ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। রফতানিতে এগিয়ে বেনাপোল বন্দর দিয়ে গত বছরে ভারতে রফতানি হয়েছে ১৮ লাখ ৭২ হাজার ২১০ মেট্রিক টন পণ্য। রফতানি পণ্যের মধ্যে বসুন্ধরা টিস্যু, মেলামাইন, কেমিকেল, মেহেগনী ফল, গরুর শিং, টুকরা কাপড়, মাছ ও পাটজাত পণ্য উল্লেখ্যযোগ্য। আর দ্বিতীয় অবস্থানে আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে রফতানি হয়েছে ১৩ লাখ ৩৬ হাজার ৬৫৮ মেট্রিক টন পণ্য। তৃতীয় অবস্থানে ভোমরা বন্দর দিয়ে ভারতে রফতানি হয়েছে ৮ লাখ ৫৬ হাজার ১৪ মেট্রিক টন পণ্য। সবচেয়ে কম পণ্য আমদানির তালিকায় ছিল আখাউড়া বন্দর। এ বন্দরটি দিয়ে ভারত থেকে ৫ বছরে মাত্র ২৩৯ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছে। সবচেয়ে কম পণ্য রফতানি তালিকায় নাকুগাঁও বন্দর দিয়ে ৫ বছরে ভারতে রফতানি হয়েছে ২ হাজার ৭৫৫ মেট্রিক টন ৩৩ ট্রাক পণ্য।

এ ছাড়া হিলি স্থলবন্দর দিয়ে গত ৫ বছরে আমদানি হয়েছে ৮১ লাখ ৭ হাজার ১২০ মেট্রিক টন এবং রফতানি ৮৬ হাজার ৫৫ মেট্রিক টন পণ্য। বিবিরবাজার স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি ১ হাজার ৮৩৬ মেট্রিক টন এবং রফতানি ৭ লাখ ৬ হাজার ৮৯৪ মেট্রিক টন পণ্য। বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি ৫৭ লাখ ২৬ হাজার ৩৯২ মেট্রিক টন এবং রফতানি ২ লাখ ৬৩ হাজার ৪০৬ মেট্রিক টন পণ্য। টেকনাফ বন্দর দিয়ে আমদানি ৬ লাখ ৪ হাজার ৭৫৫ মেট্রিক টন এবং রফতানি ২১ হাজার ৫৪৬ মেট্রিক টন পণ্য। নাকুগাঁও বন্দরে আমদানি ৩ লাখ ২৬ হাজার ৫১ মেট্রিক টন এবং রফতানি ২ হাজার ৭৫৫ মেট্রিক টন। তামাবিল স্থলবন্দরে আমদানি ৪১ লাখ ১৯ হাজার ০৭৩ মেট্রিক টন এবং রফতানি ৩ হাজার ৭৯৮ মেট্রিক টন পণ্য ও সোনাহাট বন্দরে আমদানি ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৫৫৮ মেট্রিক টন এবং রফতানি ৫ হাজার ৯৪৯ মেট্রিক টন পণ্য।

ভারত-বাংলাদেশ ল্যান্ডপোর্ট ইমপোর্ট এক্সপোর্ট কমিটির চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান বলেন, স্থলপথে ব্যবসায়ীরা আরও পণ্য আমদানি-রফতানির ইচ্ছে থাকলেও বন্দরগুলোর অনুন্নত অবকাঠামোর কারণে বাণিজ্য প্রসার ঘটছে না। যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ আর চাহিদা আছে এমন বন্দরগুলোর অবকাঠামোর উন্নয়নের প্রতি সরকারকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশ সিঅ্যান্ডএফ ফেডারেশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সড়ক ও রেলপথে সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য হয় ভারতের সঙ্গে। বাংলাদেশের স্থলবন্দরগুলোর নাজুক অবস্থা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের। চাহিদা মতো অবকাঠামো উন্নয়ন না হওয়ায় বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতায় তার খেসারত গুণতে হয় ব্যবসায়ীদের। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন করা হলে আমদানি খরচ যেমন কমবে তেমনি সরকারের রাজস্ব আয় দ্বিগুণ বাড়বে।

আমদানি-রফতানি সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক জানান, দেশের চলমান ১২টি বন্দরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাণিজ্যিক চাহিদা বেনাপোল বন্দর দিয়ে। প্রতিবছর এ বন্দর দিয়ে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার আমদানি ও ৮ হাজার কোটি টাকার রফতানি বাণিজ্য হয়ে থাকে। বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে আজ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় অবকাঠামো স্থাপন হয়নি দেশের সর্ববৃহৎ বেনাপোল বন্দর ও কাস্টমসে। বারবার অগ্নিকাণ্ডে বন্দরে রক্ষিত আমদানি পণ্য আগুনে পুড়ে পথে বসছেন ব্যবসায়ীরা।

দীর্ঘদিন ধরে সিসি ক্যামেরার দাবি জানানো হলও আজ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। বার বার প্রতিশ্রুতি দিয়েও বেনাপোল কাস্টমসে আমদানি পণ্যের মান পরীক্ষণের জন্য বিএসটিআই বা বিএসআইআরের শাখা স্থাপন হয়নি। ফলে ঢাকা থেকে রিপোর্ট করাতে ২০ দিন থেকে মাসের অধিক সময় লেগে যায়। এ সময় খালাসের অপেক্ষায় বন্দরে আটকা থাকে পণ্য। এতে পণ্যের যেমন গুণগতমান নষ্ট হয় তেমনি বেড়ে যায় আমদানি খরচ। যার প্রভাব পড়ে দেশীয় বাজারে ভোক্তার ওপর। ব্যাহত হয় শিল্প কলকারখানার উৎপাদন কার্যক্রম বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ স্থলবন্দরের চেয়ারম্যান কে.এম তারিকুল ইসলাম জানান, বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের কাছে বেনাপোল বন্দরের গুরুত্ব অনেক বেশি। বিষয়টি মাথায় রেখে ইতিমধ্যে বেনাপোল বন্দরে নতুন জায়গা অধিগ্রহণ ও আধুনিক সুবিধা নিয়ে কয়েকটি পণ্যগার ও ইয়ার্ড তৈরি করা হয়েছে। রেলে আমদানি হওয়া কিছু পণ্য বন্দরে খালাসের ব্যবস্থা হয়েছে। এছাড়া রেলে রফতানি বাণিজ্য চালুর চেষ্টা চলছে। বন্দরের নিরাপত্তায় চারপাশে উঁচু প্রাচীর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। খুব দ্রুত এসব অবকাঠামোর উন্নয়ন কাজ শুরু হবে বলে জানান তিনি।

সূত্র : বার্তা২৪.কম