বাংলা ও বিশ্বের সকল খবর এখানে
শিরোনাম

মোদি-শাহের থেকেও অনেক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে মমতা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়ে তৃতীয়বারের মতো সরকার করতে যাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচনে আগে শতাধিক নেতার দলত্যাগ ও বিজেপির সর্বশক্তি প্রয়োগের ফলে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় ছিল অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু একক ক্যারেশমেটিক নেতা হিসেবে ভাঙা পা নিয়েও যেভাবে প্রচারণা চালিয়ে দলকে বিশাল জয় এনে দিয়েছেন তা নিয়ে বিশ্ব মিডিয়ায় চলছে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণ।

নির্বাচনে তিনি ভোটারদের যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা বাস্তবায়ন হলে বদলে যাবে পশ্চিমবঙ্গের সামগ্রিক চিত্র। কিন্তু এ কাজটি করা কি এত সহজ?-এনিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জার্মান ভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়-ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহের চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে বিশাল জয় পেয়েছেন, এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে অপেক্ষা করছে আরো অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিশ্রুতি পূরণের চ্যালেঞ্জ। যে প্রতিশ্রুতি তিনি ভোটের আগে ইস্তাহারে দিয়েছেন। সেই তালিকাটা রীতিমতো লম্বা। আগামী পাঁচ বছরে যদি তিনি সেই প্রতিশ্রুতি পালন করতে পারেন, তা হলে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বিপুলভাবে উপকৃত হবেন। কিন্তু সেই সব প্রতিশ্রুতি পালন করা রীতিমতো কঠিন।

গরিবি হঠাও এবং কর্মসংস্থান

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিশ্রুতি, পাঁচ বছরে ৩৫ লাখ মানুষকে দারিদ্র্য রেখার থেকে উপরে তোলা হবে। তার মানে বছরে সাত লাখ অত্যন্ত গরিব মানুষ একটু স্বাচ্ছন্দ্যের মুখ দেখবেন। তারপর অতি-গরিব মানুষের সংখ্যা থাকবে মাত্র পাঁচ শতাংশ। কীভাবে এই কাজ করা হবে, তার কোনো রূপরেখা ইস্তাহারে নেই।

ইস্তাহারের প্রতিশ্রুতি, প্রতি বছর পাঁচ লাখ বেকারের কর্মসংস্থান হবে। রাজ্যে এখন বেকারের সংখ্যা বলা হয়েছে ২১ লাখ। প্রতি বছর নতুন বেকার যুক্ত হয়। পাঁচ লাখ কর্মসংস্থান দিয়ে পাঁচ বছর পরে বেকারের সংখ্যা অর্ধেক হবে বলে দাবি করা হয়েছে। বলা হয়েছে, জিডিপি বাড়বে এবং শিল্পের বিকাশ ঘটবে, তাতেই কর্মসংস্থান তৈরি হবে। সাধারণ মানুষের কাছে এটা কোনো বার্তা দেয় কি? দেয় না। বরং এর চেয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি হলো, আগামী এক বছরে বিভিন্ন সরকারি দফতর ও পুলিশে এক লাখ ১০ হাজার খালি পদ পূরণ করা হবে।

শিল্পের প্রতিশ্রুতি

রাজ্যে প্রতি বছর ১০ লাখ ছোট ও মাঝারি শিল্প হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। পাঁচ বছরে বড় শিল্পের দুই হাজারটি ইউনিট যুক্ত হবে। আর বিনিয়োগ হবে পাঁচ লাখ কোটি টাকা। মানে বছরে এক লাখ কোটি টাকা। এই তিনটি প্রতিশ্রুতি রূপায়ণ করা রীতিমতো কঠিন। বিশেষ করে অতীত অভিজ্ঞতার নিরিখে। যিনি অর্থ ও শিল্পমন্ত্রী হবেন, তাদের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়ার মতো প্রতিশ্রুতি।

মমতা-ঝড়ে উড়ে গেছে মোদী-শাহের বিজেপি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম প্রতিক্রিয়া, ”বাংলা পারে। এটা বাংলার জয়।” পরে বললেন, ”এই জয় বাংলার মানুষকে বাঁচিয়ে দিল।” নন্দীগ্রামের খবরে মমতা বললেন, ”আমরা পুনর্গণনা চাই।” আদালতে যাওয়ার কথাও বললেন। তবে মমতা জানিয়ে দিয়েছেন, এখন বিজয় উৎসব নয়। এখন প্রথম কাজ, করোনার মোকাবিলা করা। তাই সকলের জন্য বিনা পয়সায় মোদীর কাছ থেকে টিকা চেয়েছেন। না দিলে ধরনার হুমকিও।

মমতার প্রতিশ্রুতি প্রতিটি ব্লকে একটি করে মডেল আবাসিক স্কুল হবে। পার্শ্ব শিক্ষকদের বছরে বেতন তিন শতাংশ করে বাড়বে, অবসরের পর তারা তিন লাখ টাকা করে পাবেন। পার্শ্ব শিক্ষক মানে স্কুলগুলিতে ২০০৪ সাল থেকে ক্লাসে পিছিয়ে পড়া বাচ্চাদের সহায়তা করার জন্য নিয়োগ করা শিক্ষক। পশ্চিমবঙ্গে তারা মাসে ১৩ হাজার ৭০০ টাকা করে পান। অথচ, তাদের পুরো সময়ের শিক্ষকদের মতোই ক্লাস নিতে হয়।

ডাক্তার, নার্সদের সংখ্যা দ্বিগুণ

প্রতিটি জেলায় মেডিকেল কলেজ, অতিরিক্ত সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল এবং ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সংখ্যা দ্বিগুণ করার কথা বলা হয়েছে ইস্তাহারে। এই প্রতিশ্রুতির রূপায়ণও খুবই চ্যালেঞ্জিং। সব পরিবারকে স্বাস্থ্য সাথীর আওতায় নিয়ে আসা হবে।

মমতা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, রাজ্যের ৫০টি শহরে মা ক্যান্টিন খোলা হবে। যেখানে পাঁচ টাকায় ডিম-ভাত পাওয়া যাবে। সেই সঙ্গে রেশন বাড়িতে পৌঁছে দেবে সরকার। গরিব পরিবারের কত্রীরা মাসে ৫০০ টাকা ও তফসিল জাতি ও উপজাতির ক্ষেত্রে হাজার টাকা পাবেন। বছরে দুই বার ‘দুয়ারে সরকার’ পরিকল্পনা নেয়া হবে।

এত প্রতিশ্রুতি পালন করা কতটা কঠিন? প্রবীণ সাংবাদিক শুভাশিস মৈত্র ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ”কয়েকটা কাজ মমতা করবেন। স্বাস্থ্য সাথী বা পাঁচ লাখ টাকার বিমা প্রকল্প করবেন। মানুষকে বিনা পয়সায় ভ্যাকসিন দেবেন। গরিব পরিবারের মেয়েদের পাঁচশো টাকা দেয়া বা মা ক্যান্টিন করা এসবও করবেন।” কিন্তু শুভাশিস মনে করেন, ”শিল্প আনা থেকে শুরু করে বাকি কাজগুলোর জন্য প্রচুর অর্থ লাগবে। এটা করা অসম্ভব নয়।

কিন্তু কঠিন, খুবই কঠিন। সরকারি হিসাবে অনেক কিছুই হয়ে যায়। বাস্তবের মাটিতে তার প্রতিফলন দেখতে পাওয়ার কাজটা মমতার কাছে সব চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।” ফলে বিজেপি-র চ্যালেঞ্জ তিনি অতিক্রম করেছেন ঠিকই, তবে আরো অনেক বড় চ্যালেঞ্জ তার জন্য অপেক্ষা করছে।