যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চলমান আলোচনা এখন ‘চূড়ান্ত পর্যায়ে’ পৌঁছেছে। ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত সাময়িকভাবে থেমে যাওয়ার পর তিনি এ মন্তব্য করেন।
মঙ্গলবার (৯ জুন) সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরান ও ইসরাইল পালটা পালটি পদক্ষেপ নিচ্ছিল। এখন তারা উভয়েই আমার মধ্যস্থতায় উত্তেজনা থামতে সম্মত হয়েছে। আমরা এমন একটি চুক্তির একেবারে শেষ ধাপে রয়েছি, যা অত্যন্ত ভালো হবে। খবর আল আরাবিয়ার।
চুক্তি কত দিনের মধ্যে হতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই।
তবে ট্রাম্পের আশাবাদী বক্তব্যের বিপরীতে বাস্তব পরিস্থিতি এখনও জটিল। তেহরান বহুবার জানিয়েছে, যে কোনো শান্তি চুক্তিতে লেবাননের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। এদিকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলের সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
রোববার ইরান ইসরাইলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করলে ইসরাইল পাল্টা হামলা চালায়। পরে ইরান সামরিক অভিযান বন্ধের ঘোষণা দেয়। কয়েক ঘণ্টা পর ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানান, সেই ফ্রন্টের পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তবে উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। সোমবার ইরান সতর্ক করে বলেছে, লেবাননে ইসরাইল হামলা অব্যাহত রাখলে তারা আবারও আক্রমণ করবে। জবাবে নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের পক্ষ থেকে নতুন হামলা হলে ইসরাইল ‘পূর্ণ শক্তি’ দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাবে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ জানিয়েছেন, লেবাননে সামরিক অভিযান চলবে এবং উত্তর ইসরাইলে হামলার প্রতিটি ঘটনার জবাবে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালানো হবে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তবে ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে নেতানিয়াহুকে ফোন করে তা থেকে বিরত থাকতে বলেন।
ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি নেতানিয়াহুকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘সাবধান হও, না হলে খুব শিগগিরই তোমাকে একাই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।’
অন্যদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অনেক অভিন্ন স্বার্থ থাকলেও সব ক্ষেত্রে দুই দেশের অবস্থান এক নয়।
লেবাননে প্রাণহানি
ইসরাইলি সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ইরান প্রায় ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। পাল্টা হামলায় ইসরাইলও ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে। তবে দুই দেশেই কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
কিন্তু দক্ষিণ লেবাননে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সোমবার ইসরাইলি হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন।
তেহরানে সতর্ক স্বাভাবিকতা
যুদ্ধের আশঙ্কা থাকলেও সোমবার তেহরানের পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত ছিল। শহরের ক্যাফেগুলোতে মানুষের উপস্থিতি দেখা গেছে, যদিও অনেক এলাকায় জ্বালানি স্টেশনে দীর্ঘ সারি ছিল।
৪১ বছর বয়সী হিসাবরক্ষক মরিয়ম বলেন, মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তি কাজ করছে। যুদ্ধ হবে কি না, আর শান্তি চুক্তি টিকবে কি না—কেউ জানে না।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত
সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি তেহরান সফর করে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির কাছে একটি ‘বিশেষ চিঠি’ পৌঁছে দিয়েছেন বলে জানিয়েছে ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন।
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, তেহরান এখনও আলোচনার টেবিলে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাময়িক যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক তৎপরতা শান্তির সম্ভাবনা তৈরি করলেও ইরান, ইসরাইল ও লেবাননকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা যে কোনো সময় নতুন করে সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।