আজ শুক্রবার পবিত্র আশুরা। হিজরি সনের প্রথম মাস মহররমের ১০ তারিখ। ঐতিহাসিক কারবালার হৃদয়বিদারক ও গভীর শোকাবহ দিন। এছাড়া ইসলামের বেশকিছু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার কারণে মুসলমানদের কাছে দিনটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। মহররমের ৯ তারিখ রাত থেকে মূলত আশুরা উদযাপন শুরু হয়।
যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্য পরিবেশে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে শুক্রবার সারা দেশে ১৪৪৮ হিজরি সনের পবিত্র আশুরা পালন করবেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। এ উপলক্ষে আজ বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে আলোচনা ও দোয়া অনুষ্ঠিত হবে।
এছাড়া রাজধানীতে তাজিয়া মিছিল বের হবে। এসব কর্মসূচি ঘিরে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আলাদা বাণী দিয়েছেন।
জানা যায়, আরবি শব্দ আশারা থেকে আশুরা শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ দশ। মহররমের দশম দিনটিকে ‘আশুরা’ বলে অভিহিত করা হয়। হিজরি ৬১ সনের (৬৮০ খ্রিষ্টাব্দ) ১০ মহররম ইরাকের কুফা নগরের অদূরে ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে এজিদ বাহিনীর হাতে সপরিবারে নির্মমভাবে শহীদ হন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.)। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর আত্মত্যাগ ইসলামের ইতিহাসে সমুজ্জ্বল হয়ে আছে।
এছাড়া আশুরার দিন মহান আল্লাহতায়ালা পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং এদিনেই কিয়ামত হবে। আশুরার দিনেই হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করে দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। এদিনে হজরত ইব্রাহিম (আ.) নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে রক্ষা পান। মাছের পেট থেকে হজরত ইউনুস (আ.)-এর মুক্তি লাভ, মহাপ্লাবন থেকে হজরত নুহ (আ.)-এর রক্ষা, লাঠি দিয়ে রাস্তা বানিয়ে হজরত মুসা (আ.)-এর নীল নদ পার হওয়াসহ বেশকিছু তাৎপর্যপূণ ঘটনা ঘটেছিল এই দিনে।
রাজধানীতে তাজিয়া মিছিলসহ বিভিন্ন শোক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। এ উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
গত মঙ্গলবার পুরান ঢাকার হোসেনি দালান ইমামবাড়ায় নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, তাজিয়া মিছিল শুক্রবার সকাল ১০টায় হোসেনি দালান ইমামবাড়ার উত্তর গেট থেকে বের হয়ে, হোসেনি দালান মোড়, বকশীবাজার লেন, আলিয়া মাদরাসা মোড়, বকশীবাজার (কলপাড়) মোড়, উর্দু রোড মোড়, লালবাগ চৌরাস্তা মোড়, গৌর-এ-শহীদ মাজার মোড়, আজিমপুর চৌরাস্তা মোড়, নীলক্ষেত মোড়, সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ২ নম্বর রোড ও সাত মসজিদ রোড (জিগাতলা) হয়ে ধানমন্ডি লেক (কারবালা)-এ গিয়ে মিলিত হবে।
এই রুটগুলোয় সুনির্দিষ্ট ট্রাফিক ডাইভারশন থাকবে। মিছিল চলাকালীন তীব্র যানজট এড়াতে নগরবাসীকে বিকল্প রাস্তা ব্যবহারের জন্য অনুরোধ করেন ডিএমপি কমিশনার। তাজিয়া মিছিলের দীর্ঘ পথ ও জমায়েতের কথা বিবেচনা করে আপৎকালীন ফায়ার ফাইটার বা ফায়ার টেন্ডার, অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েন রাখা হবে।
আয়োজক কমিটির প্রতি অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, মিছিলে ব্যবহৃত নিশানের উচ্চতা ১২ ফুটের বেশি হওয়া যাবে না। কোনো প্রকার ধারালো ধাতব বস্তু, দাহ্য পদার্থ, ছুরি, লাঠি, তরবারি, বর্শা, ব্যাগ, পোটলা বা সুটকেস নিয়ে মিছিলে অংশগ্রহণ করা যাবে না। এছাড়া আগত ব্যক্তিদের ব্যাগ, সুটকেস, ছাতা, কুকার জাতীয় সন্দেহজনক প্যাকেট বা বক্সসহ প্রবেশে বাধা দেওয়া হবে। উচ্চমাত্রার শব্দ সৃষ্টিকারী যন্ত্র বা পিএ সিস্টেম ব্যবহার করা যাবে না এবং কোনো ধরনের ঢাক-ঢোল বাজানো থেকে বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে আতশবাজি বা যেকোনো ধরনের পটকা ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ থাকবে। যানজট এড়াতে ঢাকা মহানগরীর চালক ও সাধারণ জনগণকে বিকল্প রাস্তা ব্যবহারের জন্য অনুরোধ জানান তিনি।
হোসাইনী দালান ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ ফিরোজ হোসেন বলেন, এ বছর সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকবে এবং ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্যে আমরা এগুলো সম্পন্ন করতে পারব। জানা গেছে, এবার ইমামবাড়া থেকে প্রায় ৬৩টি তাজিয়া মিছিল বিভিন্ন সময় বের হবে। মিছিল শুরু হবে সকাল ১০টায়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাণীতে সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। একই সঙ্গে কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনায় শাহাদাতবরণকারী তার পরিবারের সদস্য ও সঙ্গীদের পবিত্র স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানান। এই শোকাবহ দিনে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পবিত্র আশুরা ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এটি শুধু শোক ও স্মরণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সত্য, ন্যায়, ধৈর্য, ত্যাগ ও নৈতিক দৃঢ়তার চিরন্তন শিক্ষা ধারণ করে। কারবালার ঘটনা মানব ইতিহাসের এমন এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়, যা যুগে যুগে মানুষকে সত্যের পক্ষে এবং অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে অনুপ্রাণিত করে আসছে।
তিনি বলেন, পবিত্র আশুরা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ইসলামের মূল শিক্ষা শান্তি, ন্যায়, সহমর্মিতা ও মানবকল্যাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইসলামে বিভেদ, হানাহানি, বিদ্বেষ কিংবা সামাজিক বৈরিতার কোনো স্থান নেই। তাই আশুরার মহান শিক্ষা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সবাই মিলে ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী সমাজ গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। সবশেষে তিনি বলেন, মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।