ফেসবুক কনটেন্ট থেকে আয় করার সুযোগ নেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের। ফেসবুকের এমন নীতি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের অন্তত ১৩ জন সংসদ সদস্য আয় করছেন। তাদের মধ্যে মন্ত্রিসভার তিনজন সদস্যও আছেন।
তথ্য যাচাইকারী (ফ্যাক্টচেক) প্রতিষ্ঠান ‘ডিসমিসল্যাব’-এর এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ডিসমিস ল্যাবের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ওইসব সংসদ সদস্যের কনটেন্ট মনিটাইজেশন এখনও চালু আছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে এ তথ্য পেয়েছে ডিসমিসল্যাব। অনুসন্ধানে মেটার প্রকাশ্য ‘পার্টনার-পাবলিশার’ তালিকা এবং নেদারল্যান্ডস-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘হোয়াট টু ফিক্স’ সংরক্ষিত মনিটাইজেশন আর্কাইভের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
ডিসমিস ল্যাবের প্রতিবেদন বলছে, এসব ফেসবুক অ্যাকাউন্টে নিয়মিত বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনও প্রদর্শন করা হচ্ছে। এতে মেটার নিজস্ব নীতি প্রয়োগের কার্যকারিতা, যাচাই প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য ‘স্বার্থের সংঘাত’ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) ডিসমিসল্যাবের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেটার ‘কনটেন্ট মনিটাইজেশন’ কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকা ভেরিফায়েড ১৩টি ফেসবুক পেজ ও প্রোফাইলের মধ্যে সাতজন বিএনপির, পাঁচজন জামায়াতে ইসলামীর এবং একজন স্বতন্ত্র এমপি আছেন। তালিকায় থাকা মন্ত্রিসভার তিন সদস্য হলেন– বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অন্তত দুটি ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পরও মনিটাইজেশন কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছে। লালমনিরহাট-১ আসনের সংসদ সদস্য হাসান রাজীব প্রধানের অ্যাকাউন্ট ৪ ফেব্রুয়ারি এবং চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস কে ফরিদ আহমেদের অ্যাকাউন্ট ১১ ফেব্রুয়ারি (ভোটের ঠিক আগের দিন) মেটার এই কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়।
তালিকায় থাকা অ্যাকাউন্টগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনুসারী পটুয়াখালী-২ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মো. শফিকুল ইসলামের। তার ফেসবুক পেজে অনুসারীর সংখ্যা ১৭ লাখের বেশি। পেজটির পরিচিতিতে তাকে ‘সংসদ সদস্য’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এটি জামায়াতে ইসলামীর নিয়ন্ত্রণাধীন বলেও ‘পেজ ট্রান্সপারেন্সি’ তথ্য থেকে জানা যায়। আর্কাইভের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকেই তার পেজটি মনিটাইজেশন কর্মসূচির আওতায় রয়েছে।
এ বিষয়ে শফিকুল ইসলাম ডিসমিসল্যাবকে বলেন, তার আইটি টিম পেজটি পরিচালনা করে। তার জানা মতে, ফেসবুক থেকে তিনি কোনও আয় করেন না। তবে তিনি মনে করেন, রাজনীতিবিদদেরও মনিটাইজেশনের সুযোগ থাকা উচিত।
প্রতিবেদনে বিশেষভাবে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহর বিষয়টি উঠে এসেছে। ‘হোয়াট টু ফিক্স’-এর তথ্য অনুযায়ী, তার ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টটি ৭ ফেব্রুয়ারি মেটার মনিটাইজেশন কর্মসূচিতে যুক্ত হয় এবং ৫ এপ্রিল তা তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে আরও ২২টি আনভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট পাওয়া গেছে— যেগুলো বিভিন্ন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীর নামে পরিচালিত হচ্ছে এবং মেটার মনিটাইজেশন তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি অ্যাকাউন্ট নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণায় রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনও চালিয়েছে। কিছু অ্যাকাউন্ট নির্বাচনের পর মনিটাইজেশন কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছে।
হোয়াট টু ফিক্সের আর্কাইভ অনুসারে, হাসনাত আবদুল্লাহর ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি গত ৭ ফেব্রুয়ারি মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে যুক্ত হয় এবং এরপর ৫ এপ্রিল তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। ডিসমিসল্যাবের পর্যালোচনার সময় অ্যাকাউন্টটি আর মেটার বর্তমান অংশীদার-প্রকাশক তালিকায় উপস্থিত ছিল না।
তবে হাসনাতের সঙ্গে যুক্ত আরও দুটি ফেসবুক পেইজ মেটার অংশীদার-প্রকাশকের তালিকায় রয়ে গেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, মেটা তার ফেসবুক আয় প্রকাশ্যে আসার পরে হাসনাতের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকে মনিটাইজেশন সরিয়ে নিয়েছিল, তবে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্য পেইজগুলোতে মনিটাইজেশন সক্রিয় ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিসমিসল্যাব এমন একটি ঘটনার সন্ধান পেয়েছে, যেখানে মেটা বাংলাদেশের নির্বাচনি প্রার্থীকে শনাক্ত করার পরে মনিটাইজেশন বাতিল করেছে। ঢাকা-৮ নির্বাচনি এলাকা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা মেঘনা আলম ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে যুক্ত হয়েছিলেন। নির্বাচনে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পরে চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি তার অ্যাকাউন্টের মনিটাইজেশন চলে যায়।
মেঘনা আলম ডিসমিসল্যাবকে জানান, মেটা তাকে একটি নোটিশ পাঠিয়ে বলেছে, মনিটাইজেশন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের জন্য সীমাবদ্ধ। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর ১৫ ফেব্রুয়ারি তার মনিটাইজেশন পুনর্বহাল করা হয়েছিল এবং ডিসমিসল্যাবের পর্যালোচনার সময় সক্রিয় ছিল।
তবে ডিসমিসল্যাব অন্যান্য প্রার্থী এবং নির্বাচিত রাজনীতিবিদদের খুঁজে পেয়েছিলেন— যাদের অ্যাকাউন্টগুলো এই জাতীয় কোনও সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়নি। ঢাকা-৯ থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তাসনিম জারার একটি ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট রয়েছে, যার ৭ দশমিক ৬ মিলিয়ন অনুসারী আছে। হোয়াট টু ফিক্সের আর্কাইভ অনুসারে, অ্যাকাউন্টটির মনিটাইজেশন ২০২০ সালের জুলাই মাসে চালু করা হয়েছে এবং নির্বাচনের সময়জুড়ে সক্রিয় ছিল।
ডিসমিসল্যাব মেটার অংশীদার-প্রকাশক তালিকায় বাংলাদেশি আইনপ্রণেতা এবং মন্ত্রীদের নামে কমপক্ষে ২২ টি অযাচাইকৃত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে।
যেহেতু এই অ্যাকাউন্টগুলি যাচাই করা হয় না, তাই ডিসমিসল্যাব তাদের ১৩টি যাচাইকৃত অ্যাকাউন্ট থেকে আলাদাভাবে নিরীক্ষা করেছে। এর মধ্যে বিএনপির সংসদ সদস্যদের নামে ১৩টি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। এর মধ্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নামে একটি প্রোফাইল ছিল, যার ৪৪ হাজারেও বেশি অনুসারী ছিল।
পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী শরিফুল আলমের নামে একটি আনভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট (একটি প্রোফাইল ও এক পেইজ) পাওয়া গেছে অনুসন্ধানে। প্রোফাইলটির ৪৬ হাজার অনুসরণকারী এবং পেইজে ৫৭ হাজার অনুসরনকারী ছিল। উভয়ই মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে যুক্ত হয়েছিল।
কিছু যাচাই না করা অ্যাকাউন্ট নির্বাচনের পরে মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে যোগ দেয়। গাজীপুর-৩ থেকে সংসদ সদস্য এস এম রফিকুল ইসলাম এবং নওগাঁ -৫ এর সংসদ সদস্য মো. জাহিদুল ইসলাম ধলুর ফেসবুক পেজে যথাক্রমে ১২ মার্চ এবং ২০ এপ্রিল যোগ দেওয়া হয়েছিল। উভয় তারিখই তারা সংসদ সদস্য হওয়ার পরে যুক্ত হয়েছিল। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি নির্বাচনি প্রচারণার সময় রফিকুল ইসলামের পেইজে ২৩টি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনও চালিয়েছিল।
পার্টনার ও প্রকাশক তালিকায় জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যদের নামে আটটি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে বলে দেখেছে ডিসমিসল্যাব। এর মধ্যে ছিল চট্টগ্রাম-১৬ আসনের জহিরুল ইসলাম, ফরিদপুর-১ আসনের মো. ইলিয়াস মোল্লা এবং ঝিনাইদহ-৪ আসনের মো. আবু তালেবের নাম— যা সবাই নির্বাচনি প্রচারণার সময় রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন চালিয়েছিল। কুষ্টিয়া-৩ আসনের মুফতি আমির হামজার নামে আরেকটি অ্যাকাউন্টের ৮ লাখেরও এরও বেশি অনুসারী ছিল।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এ ধরনের পরিস্থিতি সম্ভাব্য ‘স্বার্থের সংঘাত’ (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) তৈরি করে। কারণ, যারা প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ বা এ-সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারেন, তারাই যদি সেই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা পান, তবে জবাবদিহি ও সুশাসনের প্রশ্ন ওঠে।’
ডিসমিসল্যাব এ বিষয়ে মেটার কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। তবে প্রতিবেদন প্রকাশ করা পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।