শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ০২:২৪ পূর্বাহ্ন

রুশ ক্ষেপণাস্ত্র রুখতে কেন ব্যর্থ ইউক্রেন

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬

ইউক্রেনকে লক্ষ্য করে রাশিয়া যখনই কোনো ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার হাতে সেই প্রাণঘাতী হুমকি চিহ্নিত করে তা ধ্বংস করার সময় থাকে মাত্র কয়েক মিনিট- কখনো কখনো কয়েক সেকেন্ড।

সময়ের এই মারাত্মক ঘাটতির কারণে ঘাটতির কারণে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ অন্যান্য শহর ক্রমশ রাশিয়ার ভয়াবহ হামলার মুখে প্রতিরক্ষাহীন হয়ে পড়ছে।

আকাশ থেকে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ও খাড়াভাবে নেমে আসা এসব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ করার মতো সক্ষমতা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ‘প্যাট্রিয়ট’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থারই রয়েছে বলে জানিয়েছে ইউক্রেন। তবে তাদের দাবি, পুরো দেশকে রক্ষা করার জন্য তাদের কাছে প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্যাট্রিয়ট ব্যাটারি এবং ইন্টারসেপ্টর (ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী ক্ষেপণাস্ত্র) নেই।

ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর গতিপথ সাধারণত বিমানের মতো হলেও, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয় রকেটের মতো। এরপর এগুলো শব্দের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি গতিতে হঠাৎ করে লক্ষ্যবস্তুর ওপর খাড়াভাবে আছড়ে পড়ে।

গতিপথ এতটা খাড়া ও তীব্র হওয়ায় ক্ষেপণাস্ত্রটি ধ্বংস করার সুযোগ অনেকটাই কমে যায়। এর পরিণতিতে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে বুধবার (৫ আগস্ট) আবারো আঘাত হেনেছে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, এই হামলায় অন্তত ১৭ জন নিহত এবং আরো বহু মানুষ আহত হয়েছেন।

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বিশেষজ্ঞ থমাস উইথিংটনের মতে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা অনেকটা ক্রিকেট খেলায় ক্যাচ ধরার মতো। তিনি বলেন, “যখন ওয়ারহেডটি (ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্ফোরক অংশ) তার লক্ষ্যবস্তুর দিকে খাড়া হয়ে ধেয়ে আসে, তখন এর গতি থাকে অবিশ্বাস্য রকম বেশি। ক্যাচ খেলার সময় বল যদি খুব বেশি গতিতে আসে, তাহলে তা ধরা যেমন কঠিন, এটাও ঠিক তেমনই।”

রাশিয়ার ভূমি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ‘ইস্কান্দার-এম’ তাদের প্রধান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এছাড়া বিমান থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ‘কিনঝাল’-ও এর অন্যতম উদাহরণ। পাশাপাশি রাশিয়ার এস-৩০০ এবং এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকেও ভূমিতে হামলার জন্য ব্যালিস্টিক মোডে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে রুশ বাহিনী। অন্যদিকে ‘জিরকন’ মূলত হাইপারসনিক দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হলেও, এর অত্যাধিক গতির কারণে একে প্রতিরোধ করা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতোই কঠিন।

‘প্যাট্রিয়ট’ ব্যবস্থা ইউক্রেনকে কিছুটা সুরক্ষা দিচ্ছে

ইউক্রেনকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদেশগুলোর সরবরাহ করা উন্নতমানের প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো মূলত উচ্চগতির ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের জন্যই তৈরি। লক্ষ্যবস্তুর কাছে গিয়ে বিস্ফোরিত হওয়ার বদলে এর ‘পিএসি-৩’ ব্যবস্থাটি সরাসরি ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটিয়ে তা ধ্বংস করে দেয়। ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্রটি শনাক্ত করা, এর গতিপথ অনুমান করা এবং লক্ষ্যভেদে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে প্যাট্রিয়টের প্রযুক্তি মাত্র কয়েক মিনিট সময় পায়; এমনকি অনেক সময় শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় মেলে।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনীর মুখপাত্র ইউরি ইহনাত জানান, বর্তমানে তাদের কাছে থাকা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে একমাত্র প্যাট্রিয়টই রাশিয়ার ইস্কান্দার-এম, এস-৪০০ এবং জিরকন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কাছে ‘থাড’ ও নৌঘাঁটিভিত্তিক ‘ইজিস’-এর মতো অন্যান্য শক্তিশালী ব্যালিস্টিক-বিরোধী ব্যবস্থা থাকলেও, সেগুলো এখনো ইউক্রেনকে সরবরাহ করা হয়নি।

তবে প্যাট্রিয়ট থাকলেই যে নিরাপত্তা নিশ্চিত- বিষয়টি তেমন নয়। কোনো প্যাট্রিয়ট ব্যাটারি যদি অনুপস্থিত থাকে, ভুল অবস্থানে থাকে কিংবা ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি থাকে, তাহলে ইউক্রেনের অন্যান্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো দিয়ে এর অভাব পূরণ করা সম্ভব হয় না।

পুরো দেশ সুরক্ষিত করার মতো পর্যাপ্ত প্যাট্রিয়ট ব্যাটারি ইউক্রেনের নেই। অন্যদিকে, রাশিয়া একইসঙ্গে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং ‘ডিকয়’ (নকল ক্ষেপণাস্ত্র) ব্যবহার করে হামলা চালাচ্ছে। ফলে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনীকে একইসঙ্গে একাধিক হুমকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে এবং তাদের সীমিত সংখ্যক ইন্টারসেপ্টর মেপে মেপে ব্যবহার করতে হচ্ছে।

ইন্টারসেপ্টরের বৈশ্বিক সংকট

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে বিপুল পরিমাণ প্যাট্রিয়ট ও ‘থাড’ ইন্টারসেপ্টর ব্যবহৃত হওয়ায় ইউক্রেনের জন্য এই সংকট আরো তীব্র রূপ নিয়েছে। প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্যমতে, ইরানযুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট মজুদ অন্তত ৬৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। যদিও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন দাবি করছে, তাদের নিজস্ব বিশাল মজুত এখনো অক্ষত রয়েছে।

হুট করেই এই বিপুল চাহিদা মেটানো কারখানাগুলোর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন ২০২৫ সালে ৬০০টিরও বেশি ‘পিএসি-৩ এমএসই’ ইন্টারসেপ্টর সরবরাহ করেছে এবং ২০৩০ সালের শেষের দিকে তাদের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা দুই হাজার-এ উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। অন্যদিকে ন্যাটো জানিয়েছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে জার্মানিতে ইউরোপের প্রথম প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কারখানা চালু হতে যাচ্ছে।

এদিকে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সুরও পরিবর্তিত হচ্ছে। গত মাসে তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে নিজস্ব প্যাট্রিয়ট তৈরির লাইসেন্স দেবে। কিন্তু এর ঠিক তিন সপ্তাহ পর তিনি জানান, এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। সামরিক বিশেষজ্ঞরা এপি-কে জানান, লাইসেন্স পেলেও ইউক্রেনে এই ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন শুরু করতে বহু বছর সময় লেগে যাবে।

উৎক্ষেপণস্থলেই আঘাত হানার কৌশল ইউক্রেনের

আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার চেয়ে উৎক্ষেপণ করার আগেই রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার এবং অবকাঠামো ধ্বংস করার কৌশল নিচ্ছে ইউক্রেন।

আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সূত্রে এপি জানিয়েছে, জেলেনস্কি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছেন যেন ইলন মাস্ক ইউক্রেনীয় বাহিনীকে রাশিয়ার অভ্যন্তরে ‘স্টারলিংক’ স্যাটেলাইট সেবা ব্যবহারের অনুমতি দেন। কারণ বর্তমানে মাস্ক রাশিয়ার ভূখণ্ডে এই পরিষেবা সীমিত করে রেখেছেন।

এই সুবিধা পেলে ইউক্রেনীয় ড্রোনগুলো রাশিয়ার লঞ্চারগুলো খুঁজে বের করে সহজেই হামলা চালাতে পারবে। ফলে ইউক্রেনের দিকে ধেয়ে আসা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা কমে যাবে এবং প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার ওপর চাপ কমবে। তবে হোয়াইট হাউজ, ইউক্রেনীয় দূতাবাস বা স্পেসএক্স- কোনো পক্ষই এই অনুরোধের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।

পাশাপাশি, প্যাট্রিয়টের ওপর নির্ভরতা কমাতে ইউক্রেন নিজ উদ্যোগে কম খরচের ব্যালিস্টিক-বিরোধী ব্যবস্থা ‘ফ্রিয়া’ তৈরির কাজ করছে। একটি যৌথ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে জুলাই মাসে ইউক্রেন ও ইউরোপের নয়টি দেশ একটি জোট গঠন করেছে। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানান, তারা আগামী ১২ মাসের মধ্যে যৌথভাবে এই ক্ষেপণাস্ত্রের গণউৎপাদন শুরু করতে পারেন। তবে ফ্রিয়া ব্যবস্থাটি এখনো গবেষণাধীন পর্যায়ে রয়েছে এবং এটি কবে নাগাদ চালু হবে তা এখনো অনিশ্চিত।

বুধবার কিয়েভে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক হামলার পর জেলেনস্কি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ইউক্রেন মাত্র এক-তৃতীয়াংশ আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র পেয়েছে। যেসব মিত্র দেশ অবিলম্বে ইন্টারসেপ্টর সরবরাহ বাড়াতে অনিচ্ছুক, তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, অন্তত তারা যেন রাশিয়ার ওপর নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কারণ, রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের একটি বড় অংশ এখনো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার বাইরে রয়ে গেছে।

তথ্যসূত্র: এপি

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD