ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক যুদ্ধের উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বাণিজ্যিক অংশীদারদের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নেওয়ার মধ্যে তেহরান হুমকি দিয়েছে, অর্থনৈতিক যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে পারস্য উপসাগর থেকে এক ফোঁটা তেলও রপ্তানি হতে দেবে না। খবর রয়টার্সের।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির মধ্যস্থতার উদ্দেশ্যে সোমবার তেহরান সফর করার সময়ই ইরান এমন হুঁশিয়ারি দিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বাণিজ্যিক অংশীদারদের লক্ষ্য করে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় আর্থিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ি রোববার সরাসরি অর্থনৈতিক প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, অর্থনৈতিক যুদ্ধ চলতে থাকলে এক ফোঁটা তেলও রপ্তানি হবে না হরমুজ প্রণালি দিয়ে কিংবা পারস্য উপসাগরের অন্য কোনো পথেও নয়।
রেজায়ি আরও বলেন, ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধে কোনো দেশ অংশ নিলে বা সেটিকে সমর্থন করলে তেহরান সেটিকে যুদ্ধের অংশগ্রহণ হিসেবে বিবেচনা করবে।
ইরান নতুন করে জাহাজ চলাচলের ওপরও সতর্কতা জারি করেছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ বলেছে, অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ৪৫টি জাহাজকে নিয়ম লঙ্ঘনকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত করে এসব জাহাজের সঙ্গে পণ্য স্থানান্তর বা জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে তেহরান।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সোমবার দুপুর ১টায় ইরানের বিরুদ্ধে নতুন পদক্ষেপ ঘোষণা করবেন বলে জানিয়েছেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে প্রায় ধারাবাহিকভাবে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা ইরানের ওপর এবার আরও কঠোর চাপ প্রয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়াশিংটন।
রোববার ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে বেসেন্ট লিখেছেন, সোমবার ভোরে শুরু হবে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ যা কোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত পরিচালিত সবচেয়ে বড় আর্থিক অভিযান।
এদিকে আজ ইরানে পৌঁছেছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে বলে জানা যায়।
পাকিস্তান জানিয়েছে, মুনিরের সফরের উদ্দেশ্য আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা। পাকিস্তানের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মুনির ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে পাকিস্তানের এই মধ্যস্থতা কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর ইরান ও লেবাননে বেশির ভাগসহ হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন। হামলায় ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশটির অর্থনীতিতেও ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে ইরানের হাতে এখনো পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা রয়েছে। এর মাধ্যমে তারা উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলা চালানোর পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় অচল করে দিয়েছে।
এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা অবশ্য এখনো পরিষ্কার নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করার লক্ষ্য নিয়েছে। সোমবার অবশ্য টানা দুই সপ্তাহ দাম বাড়ার পর বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলে নেওয়ায় তেলের দাম কিছুটা কমেছে।
নতুন নিষেধাজ্ঞার সুনির্দিষ্ট বিবরণ না দিলেও বেসেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও আর্থিক সম্পর্ক বজায় রাখা দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
তিনি ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে লিখেছেন, যেসব ভীতু দেশ ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের চাপকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তাদের পরিণতি বিবেচনা করা উচিত।
ওয়াশিংটনের এমন অবস্থানের পর থেকেই ইরান ধারাবাহিকভাবে পাল্টা সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়ার হুমকি দিয়ে আসছে।
সূত্র : রয়টার্স