বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১১ পূর্বাহ্ন

পদ্মা-যমুনার পানি বাড়ছে, তলিয়ে গেছে ফসলি জমি

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

উজানের ঢলে পাবনা অঞ্চলে পদ্মা ও যমুনা নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। এর মধ্যে পদ্মার পানি বিপৎসীমার মাত্র ৭৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর পানি বাড়ায় পাবনা ও কুষ্টিয়ার চরাঞ্চলে ফসলের মাঠ প্লাবিত হয়েছে। অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা, মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীর পানি কমতে শুরু করলেও এখনও পানিবন্দি প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ। তিন জেলায় কয়েক হাজার হেক্টর ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার লক্ষ্মীকুণ্ডা, ডিগ্রীর চর, দাদাপুর, চর কুড়ুলিয়াসহ বিভিন্ন চর এবং সদর উপজেলার চর ভবানিপুর ও শানিকদিয়া এলাকার বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠে পানি ঢুকেছে। কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও কোমর পানি জমেছে। আগাম জাতের বিভিন্ন ফসল, সবজি ও অন্যান্য আবাদ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন।

পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার সকালে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানির উচ্চতা ছিল ১৩ দশমিক শূন্য ৬ মিটার। সেখানে বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার। আরিচা পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি ছিল ৭ দশমিক ৮৩ মিটার। সেখানে বিপৎসীমা ৮ দশমিক ৯৫ মিটার।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, কয়েক দিনের মধ্যে নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় অনেক জমি তলিয়ে গেছে। পানি আরও বাড়লে অবশিষ্ট ফসলও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, বন্যা পরিস্থিতির সার্বিক খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে প্রায় ১০০ টন জিআর চাল, ৩০০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং নগদ সহায়তার বরাদ্দ রয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত পাঁচ দিন ধরে পদ্মার পানি কমছে। গতকাল মঙ্গলবার থেকে মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীর পানিও কমতে শুরু করেছে। তবে সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা এরই মধ্যে প্লাবিত হওয়ায় দুর্ভোগ কমেনি।

নারায়ণপুর, আলাতুলি, পাঁকা, উজিরপুর ও দুর্লভপুর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে। কোথাও বসতবাড়ির উঠান, কোথাও ঘরের ভেতর ও গোয়ালঘরে পানি ঢুকেছে। গবাদি পশু ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নিতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন বাসিন্দারা।

পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক বলেন, তাঁর ইউনিয়নের প্রায় দুই হাজার পরিবার পানিবন্দি। এর মধ্যে প্রায় ৬০০ পরিবারের উঠানে পানি ঢুকেছে। বন্যার কারণে চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান বন্ধ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম আহসান হাবীব বলেন, পদ্মার পাশাপাশি জেলার অন্য দুই প্রধান নদীর পানিও কমতে শুরু করেছে। নতুন করে এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা না থাকলেও পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ আরও কয়েক দিন থাকতে পারে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ ইউনিয়নের দুই হাজার ৯০০ পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ২৯ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, শিবগঞ্জ ও গোমস্তাপুরে ২০৬ দশমিক ৪ হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। আক্রান্ত ফসলের মধ্যে রয়েছে আউশ ও আমন ধান, মাষকলাই, শাকসবজি, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজতলা, মরিচ, হলুদ, পেঁপে ও কলা। এর মধ্যে আউশ ১১৩ হেক্টর, আমন পাঁচ হেক্টর, মাষকলাই ১০ দশমিক ৬ হেক্টর, শাকসবজি ৪০ হেক্টর, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজতলা ৩ দশমিক ৪ হেক্টর, মরিচ তিন হেক্টর, হলুদ চার হেক্টর, পেঁপে দুই হেক্টর এবং কলা ২৮ হেক্টর আক্রান্ত হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আতিকুল ইসলাম বলেন, পানি কতদিন স্থায়ী হয়, তার ওপর ফসলের চূড়ান্ত ক্ষতি নির্ভর করবে।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মার পানি বাড়ায় চরাঞ্চলের মানুষের পাশাপাশি কৃষকরাও বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন। চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন চর ও নিম্নাঞ্চলের ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে।

উপজেলা কৃষি অফিসের প্রাথমিক হিসাবে, দৌলতপুরে মোট এক হাজার ৫০ হেক্টর জমির ফসল আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নে ৫১৯ হেক্টর, চিলমারীতে ১৬৫, ফিলিপনগরে ২২৮ এবং মরিচা ইউনিয়নে ৯৫ হেক্টর জমি রয়েছে। তবে কৃষকদের দাবি, কৃষি বিভাগের হিসাবের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণ বেশি।

দৌলতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত জমির প্রাথমিক তালিকা করা হচ্ছে। পানি দ্রুত নেমে গেলে কিছু ফসল রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে। পানি দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনিন্দ্য গুহ বলেন, পানিবন্দি পরিবারগুলোর কাছে জরুরি ত্রাণ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ুর অক্ষের বর্ধিতাংশ রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর কম সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় রয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী ১২০ ঘণ্টার পূর্বাভাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মৃদু তাপপ্রবাহের কথা বলা হয়েছে, যা কিছু এলাকায় প্রশমিত হতে পারে।

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD