স্টাফ রিপোর্টার : দেশে জঙ্গি তৎপরতা শুরু হয়েছিল প্রায় দেড় যুগ আগে। নিজেদের জাহির করতে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী বোমা হামলা চালিয়েছিল জামা’তুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ ওরফে জেএমবি। ওই দিন দেশের ৬৩ জেলায় সিরিজ বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল ওরা। শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুর রহমান ওরফে বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বাধীন জেএমবি প্রায় পাঁচ শ’ স্পটে বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। এতে দুজন নিহত ও শতাধিক লোক আহত হয়েছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৯৯৮ সালে আল কায়েদার অনুকরণে যাত্রা শুরু করে জেএমবি। যাদের মধ্যে আফগানিস্তানে তালেবানের পক্ষ হয়ে সেভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা অনেকেও ছিল। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিলেও ২০০৭ সালের মার্চে জেএমবি’র শীর্ষ দুই নেতা শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুর রহমানের ফাঁসির মধ্য দিয়ে জেএমবির প্রথম অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছিল।
পরে জেএমবি’র আমিরের দায়িত্ব পান হবিগঞ্জের সাইদুর রহমান। ২০১০ সালে তাকেও গ্রেফতার করা হয়। একপর্যায়ে জেএমবি দু’ভাগ হয়ে একটি গ্রুপ নব্য জেএমবি নামে আবির্ভূত হয়। ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলা চালিয়েছিল ওই নব্য জেএমবি।
বিচারাধীন ৪৩
পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট জেএমবি’র সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় সারাদেশে মামলা হয়েছিল ১৫৯টি। তদন্ত শেষে ১৬টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। চার্জশিট দেওয়া হয় ১৪৩টি মামলার। এরমধ্যে নিম্ন আদালতে ১০০টি মামলার বিচারকাজ শেষ হয়েছে। ৪৩টি মামলা বিচারাধীন। এসব মামলায় এজাহারে নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়েছিল ২৪২ জনকে। অভিযোগপত্রের আসামি এক হাজার ১২১ জন। গ্রেফতার করা হয়েছিল ৯৮৮ জনকে।
মামলাগুলোর ৪৩টি এখনও বিচারাধীন। দীর্ঘ ১৬ বছর পরও নিষ্পত্তি হয়নি কেন জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর আবদুল্লাহ আবু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঢাকার আদালতে ১৭টি মামলা ছিল। এরমধ্যে কয়েকটির বিচার শেষ করে আসামিদের সাজা হয়েছে। এখনও পাঁচটি মামলা বিচারাধীন। সেগুলো সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।’
বিচার প্রক্রিয়ার দেরির কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সাক্ষীদের অনুপস্থিতি ও করোনা পরিস্থিতির কারণে দেরি হয়েছে। এখন কোর্টের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আশা করছি এ বছরের মধ্যে এসব মামলার কাজ শেষ হবে।’
উৎপত্তিটা আফগানিস্তানে
১৬ বছর আগের এই সিরিজ বোমা হামলার কয়েক বছর পর জঙ্গিবাদ ব্যাপকভাবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে দেশে। একের পর এক টার্গেট কিলিং শুরু করে জঙ্গিরা। দেশি বিদেশি অনেক ব্যক্তিকে গলা কেটে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজানে নব্য জেএমবির পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড দেশের মানুষকে স্তম্ভিত করে।
জঙ্গি দমনে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, জঙ্গিদের পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করা না গেলেও আগের মতো তাদের নেটওয়ার্ক বা সক্ষমতা নেই। বিগত বছরগুলোতে জেএমবি, নব্য জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমসহ বিভিন্ন জঙ্গি নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা হয়েছে।
দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান সম্পর্কে ডিএমপি কমিশনার বলেন, “এ দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান কীভাবে হলো? যখন আফগানিস্তানে রাশিয়ানদের তাড়াতে, ৮০’র দশকে জিহাদের ডাক দেওয়া হলো। তখন বাংলাদেশ থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলমান এটাকে ঈমানি দায়িত্ব মনে করে ওই যুদ্ধ করতে গেলো। এ যুদ্ধে বিজয় লাভের পর অনেকেই আবার বাংলাদেশে ফিরে আসে। তখন তারা প্রকাশ্যে মিছিল করার সাহস দেখিয়েছে। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উৎপত্তিটা আফগানিস্তান কেন্দ্রিক। সেখান থেকে যুদ্ধ করে এসে হরকাতুল জিহাদ, জেএমবি এগুলো তৈরি হয়েছে। তাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ থেকে তারা কাশ্মিরে গিয়ে যুদ্ধ করবে। কিন্তু নানা কারণে কাশ্মিরে গিয়ে সফল হতে পারেনি ওরা। পরে বাংলাদেশেই খেলাফত কায়েমের নামে জঙ্গি তৎপরতা শুরু করে।”
আঁচ লাগবে উপমহাদেশে
ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘২০০৫ সালের সিরিজ বোমা হামলার পর পুলিশ জঙ্গি সংগঠনগুলোকে প্রায় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছিল। হঠাৎ কী হলো, ইরাকে মার্কিন হস্তক্ষেপ ঘটলো। পর্যায়ে আইএস-এর উদ্ভব হলো। তখন আবার বাংলাদেশে দ্বিতীয় দফায় আইএস ভাবাদর্শের জঙ্গিরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। নব্য জেএমবিসহ অনেকগুলো সংগঠন গজিয়ে গেলো। বাংলাদেশে যখনই কোনও জঙ্গি সংগঠনের উদ্ভব হচ্ছে, সেটা আন্তর্জাতিক কোনও ঘটনা দেখেই উৎসাহিত হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, এখন যেটা আশঙ্কার বিষয়, তালেবানরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নেওয়ার পরই ঘোষণা করেছে পৃথিবীর শক্তিশালী রাষ্ট্র আমেরিকাকে যুদ্ধে পরাজিত করে আফগানিস্তানকে স্বাধীন করেছি। এতে যুবক-তরুণদের মধ্যে বাড়তি উৎসাহ তৈরি হবে। যার আঁচ উপমহাদেশেও লাগবে। এজন্য সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিতে হবে।
১৭ আগস্টের সিরিজ বোমা হামলা মামলা নিয়ে ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এসব মামলার বিচারে এত বছর কেন লাগল, ওই প্রশ্ন আমরাও তুলতে পারি। আবার এতদিন পর সাক্ষী পাওয়াও মুশকিল। তারপরও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।’