মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ০৬:৩৩ পূর্বাহ্ন

কান্না থামছেই না মুন্সীগঞ্জের গ্রামে গ্রামে

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২০

রাজধানীর শ্যামবাজারের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চের ধাক্কায় অপর একটি লঞ্চ ডুবে যাওয়ার ঘটনায় ৩২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তারা সবাই মুন্সীগঞ্জের। এ দুর্ঘটনায় গ্রামে গ্রামে চলছে শোকের মাতম। চারদিকে হৃদয় বিদারক দৃশ্য। বুকফাটা আর্তনাদের শব্দে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।

এমএল মর্নিং বার্ড নামে ওই লঞ্চটি মুন্সিগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে যাত্রী নিয়ে সদরঘাটের দিকে আসছিল। সোমবার (২৯ জুন) সকাল সোয়া ৯টার দিকে শ্যামবাজারের কাছে নদীতে ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় সেটি ডুবে যায়। সাঁতরে কয়েকজন তীরে উঠতে পারলেও বেশিরভাগ মানুষ ডুবে যায়। শুরু হয় উদ্ধারকাজ।

যারা মারা গেছেন: শাহাদাত হোসেন (৪৪), আবু তাহের বেপারী (৫৮), সুমন তালুকদার (৩৫), ময়না বেগম (৩৫), তার মেয়ে মুক্তা আক্তার (১৩), আফজাল শেখ (৪৮), মনিরুজ্জামান মনির (৪২), গোলাপ হোসেন (৫০), সুবর্ণা বেগম (৩৮), তার ছেলে তামিম (১০), আবু সাঈদ (৩৯), সুফিয়া বেগম (৫০), শহিদুল ইসলাম (৬১), মিজানুর রহমান কনক (৩২), সত্য রঞ্জন বনিক (৬৫), শামীম বৈপারী (৪৪), বিউটি আক্তার (৩৮), আয়শা বেগম (৩৫), মো. মিল্লাত (৩৫), মো. আমির হোসেন (৫৫), সুমনা আক্তার (৩২), পাপ্পু (৩২), মো. মহিম (১৭), দিদার হোসেন (৪৫), হাফেজা খাতুন (৩৮), হাসিনা রহমান (৩৫), সিফাত (৮), আলম বেপারী, তার ভাগ্নে তালহা (২), ইসমাইল শরীফ (৩৫), সাইফুল ইসলাম (৪২) ও বাসুদেব নাথ (৪৫)।

রাতে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসনের তালিকা অনুযায়ী ৩০ জন মুন্সীগঞ্জের এবং ১ জন ঢাকা জেলার দোহার উপজেলার। ৩০ জনের মধ্যে মুন্সীগঞ্জের সদর উপজেলার ১৯ জন, টঙ্গীবাড়ি উপজেলার ৯ জন, সিরাজদিখান উপজেলা এবং শ্রীনগর উপজেলার ৩ জন।

মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার জানান, এমভি মর্নিং বার্ড নামে ওই লঞ্চটি মন্সীগঞ্জের মিরকাদিমের কাঠপট্টি থেকে শতাধিক যাত্রী নিয়ে সদরঘাটের দিকে যাচ্ছিল। সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শ্যামবাজারের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে চাঁদপুর থেকে আসা ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় ডুবে যায় মর্নিং বার্ড। জেলা প্রশাসনে নিহতদের তালিকা করা হয়েছে।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) মোহাম্মদ শাহজামান জানান, ৩২ জনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তাদের সবার বাড়ি মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায়।

এই তালিকা অনুযায়ী:
মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার নিহতরা হলেন- মিরকাদিমের গোয়ালঘুন্নির আব্দুর রহিমের ছেলে, শাহাদত হোসেন (৪৮), একই গ্রামের আলী হোসেনের ছেলে আবু তাহের বেপারী (৫৮), আবুল কালামের ছেলে স্মুন তালুকদার (৩৫), মোল্লাকান্দির মজিদ সারেংয়ের ছেলে সাইদূর হোসেন (৩৯), রিকাবীবাজার পশ্চিম পাড়ার পরশ মিয়ার সুফিয়া বেগম (৫০), রামপালের ধলাগাঁওয়ের মো. দেলোয়ার হোসেন মো. মিজানুর রহমান কনক (৩২), রামগোপালপুরের মৃত দেবেন্দ্র বনিকের ছেলে সত্ত রঞ্জন বনিক (৬৫), রিকাবীবাজারের নহর দিঘিরপাড় গ্রামের মো সোহরাবের ছেলে মো. পাপ্পু (৩২), মালপারার হাজী আব্দুর রফ মাতবরের মো. সাইফুর রহমান উজ্জ্বল (৪০), রামপালের ধলাগাঁওয়ের মৃত আলাউদ্দিন শেখের মেয়ে বিউটি বেগম (৩৮), মিরাপাড়ার মৃত আব্দুল জলিলের শামীম বেপারী (৪৭), নৈদিঘিরপাড়ের আব্দুল মজিদের ছেলে মো.দিদার হোসেন (৪৫),পানহাটার আব্দুল সামাদের ছেলে মো. মিল্লাত (৩৫), রিকাবীবাজারের জাহান শরীফের ছেলে ইসলাম শরীফ (৩৫), তিলারদির আফসারুদ্দিনের মো. সাইম (১৭), নৈদিঘিরপাড়ের আব্দুল মজিদের হাফেজা খাতুন (৩৮)।

টঙ্গীবাড়ি উপজেলার নিহতরা হলেন: টঙ্গীবাড়ি-সোনারং গ্রামের মাসুদ শেখের দুই মেয়ে সরনা বেগম (৩৫) ও মুক্তা আক্তার (১৩), বাঘিয়ার ইব্রাহিম শেখের ছেলে আফজাল শেখ (৪৮), আব্দুল্লাহপুরের আব্দুল হালিমের ছেলে মো. মনিরুজ্জামান (৪২), রামপালের মশরী বাজারের আব্দুল হাকিম ভূঁইয়ার গোলাম হোসেন (৫০), রামপালের সুজানগরের জাকির হোসেনের স্ত্রী সুবর্ণা আক্তার, শিশুপুত্র তামিম (১০),যশলংয়ের বাঘিয়ার মৃত ইব্রাহিম শেখের ছেলে মো. শহিদুল ইসলাম (৬৯), কামারখাড়ার খাড়ার পাচকরি বেপারীর আয়শা বেগম (৬৫), টঙ্গীবাড়ি গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের মেয়ে ময়না বেগম(৩৫), আব্দুল্লাহপুরের আব্দুর রহমানের ছেলে সিফাত (০৮), আশরকাটি গ্রামের বেলায়েত হোসেনের মেয়ে তালহা (২)। এছাড়া সিরাজদিখান উপজেলার পাইকপাড়ার মৃত বাদল দেবনাথের ছেলে বাসু দেবনাথ (৪৫), শ্রীনগর উপজেলার তারাহাটি গ্রামের জয়নাল বেপারীর ছেলে আলম বেপারী (৩৮)। ঢাকা জেলার দোহার উপজেলার বানাঘাটা গ্রামের মৃত রুস্তম শরীফের ছেলে আমির হোসেন (৫৫)।

জানাজার পর রাতেই অনেকের দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন রাতেই স্বজনহারাদের বাড়িতে যান সমর্মিতা জানাতে। জানাজায়ও অংশ নেন।

ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা রোজিনা ইসলাম জানান, দুর্ঘটনার পর তাদের ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। পাশাপাশি নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, নৌ পুলিশ ও বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মীরাও সেখানে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়। উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থল থেকে ৩০ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করেন।

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন সরদার জানান, এছাড়া স্থানীয়রা আরও দুজনকে উদ্ধার করে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।

লঞ্চডুবির প্রায় ১৩ ঘণ্টা পর রাত সোয়া ১০টার দিকে একজনকে জীবিত উদ্ধারের কথা জানায় ফায়ার সার্ভিস। তবে ঠিক কতজন নিখোঁজ রয়েছেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

এ দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন) মো. রফিকুল ইসলাম খানকে আহ্বায়ক এবং বিআইডব্লিউটিএ’র পরিচালক (নৌ নিরাপত্তা) মো. রফিকুল ইসলামকে সদস্য সচিব করে গঠিত এই কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

সদরঘাটের একটি সিসি ক্যামেরার ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ময়ূর-২ এর ধাক্কায় তুলনামূলকভাবে আকারে অনেক ছোট মর্নিং বার্ডকে মুহূর্তের মধ্যে বুড়িগঙ্গায় ডুবে যেতে দেখা যায়।

দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার পর ওই ভিডিও দেখার কথা জানিয়ে নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনার যে ধরন, তাতে তার মনে হয়েছে ধাক্কা দেয়ার বিষয়টি ‘পরিকল্পিত’।

নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, লঞ্চডুবিতে মারা যাওয়া প্রত্যেকের পরিবারকে দেড় লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসি শাহ জামান বলেন, সোমবার রাত ১০টা কোনো মামলা এ ঘটনায় দায়ের হয়নি।

তবে ময়ূর-২ লঞ্চটি ঘটনার পরপরই জব্দ করা হয়েছে জানিয়ে নৌ পুলিশের প্রধান ডিআইজি আতিকুল ইসলাম বলেন, লঞ্চের মাস্টারসহ অন্যরা পালিয়ে গেছে। আমরা লঞ্চে থাকা দুইজন স্টাফকে গ্রেপ্তার করেছি। জব্দ করা লঞ্চটি এখন লালকুঠি ঘাটে আছে।

বিআইডব্লিউটিএ’র পরিবহন পরিদর্শক মো. সেলিম জানান, মুন্সীগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা মর্নিং বার্ডে অর্ধশতাধিক যাত্রী ছিল বলে তারা তথ্য পেয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও অনেকেই ভেতরে আটকা পড়েন। তবে ঠিক কতজন নিখোঁজ রয়েছেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

লাইট নিউজ

আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD