প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচার দেশের বাইরে থেকে বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলকে অর্থ সরবরাহ করছে বলে গোয়েন্দাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে। একদল জনগণকে বিভ্রান্ত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, অন্যরা নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে মিথ্যা বলে বিভিন্ন টিকিট বিক্রি করতে চেয়েছে। এখন দুই পক্ষ এক হয়েছে। একজন পয়সা দিচ্ছে সীমান্তের ওপার থেকে, আরেকজন এখানে বসে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।’
গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠে (হাজী মুহম্মদ মুহসীন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ) আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ষড়যন্ত্র রুখতে ঐক্যের ডাক দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সময়েও যখনই তাঁরা দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের কাজে হাত দিয়েছিলেন, তখনই দেশি-বিদেশি কুচক্রী মহল ষড়যন্ত্র করে গতি রোধ করার চেষ্টা করেছে।
সেই কুচক্রী মহল আবার সজাগ হয়ে দেশের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। তাই উন্নয়নের গতি ধরে রাখতে জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
একই দিন প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম ও রংপুর সফর করেন। সফরে তিনি শারদীয় দুর্গোৎসবের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
রাজশাহী অঞ্চলের ৩৮ হাজার ৯৭০ জন আখ চাষিকে তিনি ১২ কোটি টাকা প্রণোদনা দেন। এ ছাড়া নীলফামারীর সৈয়দপুরে শিক্ষার্থীদের খেলার সামগ্রী উপহার দেন। এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন, সেলফি তোলেন এবং তাদের অটোগ্রাফ দেন।
শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে জে এম সেন হল পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও সাংগঠনিক সভায় যোগ দিতে চট্টগ্রামে যান প্রধানমন্ত্রী। গতকাল সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে সামরিক বিমানে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তিনি।
‘কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়তে সবার সহযোগিতায় চাই’ : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘আমাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য একটাই—একটি বাংলাদেশ গড়া, যেখানে আমরা সবাই মিলেমিশে শান্তিতে থাকব। এটিই ছিল যাঁরা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, যাঁরা বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র রক্ষায় আন্দোলন করেছেন, যাঁরা জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ হয়েছেন, সংগ্রাম করেছেন—তাঁদের লক্ষ্য।’
গতকাল রাত সাড়ে ৯টার পর চট্টগ্রাম জে এম সেন হল পূজামণ্ডপে মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের আয়োজনে শুভেচ্ছাবিনিময় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসুন, আমরা সবাই মিলে সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশটি গড়ি। এই বাংলাদেশের জন্য বিভিন্ন সময়ে দল-মত-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে বিভিন্ন সময় বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছি। আজকে যদি সে বাংলাদেশ গড়তে হয়, আমি আপনাদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সবার সহযোগিতা চাই। আপনি হিন্দু হন, বৌদ্ধ হন, খ্রিস্টান—যা-ই হন না কেন, আপনার সহযোগিতা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব না। কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়তে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সহযোগিতা চাই।’
মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের আয়োজনে শুভেচ্ছাবিনিময় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব কথা বলেন। এ সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, গয়েশ্বর রায়, নিতাই রায় চৌধুরী, শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, জামায়াতের এমপি শাহজাহান চৌধুরীসহ চট্টগ্রামের অন্য সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
‘ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সব মানুষের অধিকার সমান’ : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘ধর্ম, বর্ণ, পেশা ও জাতিগত পরিচয়-নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার সমান। কাউকে পেছনে ফেলে নয়, বরং সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে একটি প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায় সরকার।’
গতকাল বিকেলে রাজশাহীর ধর্মসভা (রাধা গোবিন্দ মন্দির) মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শেষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছাবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
এ ছাড়া তিনি রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠে (হাজী মুহম্মদ মুহসীন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ) আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দেন। জনসভায় সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন অর রশিদ মামুন। সভায় বক্তব্য দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শাহীন শওকত, রাজশাহী-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাঈদ চাঁদ, রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মিলন, রাজশাহী-৫ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মণ্ডল, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ও বিএমডিএর চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল শরিফ উদ্দিন। এ ছাড়া মঞ্চে কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। জনসভা পরিচালনা করেন রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন।
৩৯ হাজার আখ চাষিকে প্রণোদনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী : রাজশাহীতে ৩৮ হাজার ৯৭০ জন আখ চাষিকে ১২ কোটি টাকা সরকারি প্রণোদনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠের জনসভা মঞ্চে বসে তিনি ল্যাপটপের বাটন চেপে কৃষকদের এই প্রণোদনা দেন। কৃষকদের ব্যাংক হিসাবে এই টাকা পৌঁছে যায়। সঙ্গে সঙ্গে কৃষকরা মোবাইলে এসএমএস পান।
পরে অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে দলীয় সংসদ সদস্য ও নেতারা বক্তব্য শুরু করেন।
এর আগে বিকেল ৩টার কিছু পরে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী সামরিক বিমানটি রাজশাহীর শাহ মখ্দুম বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মাদরাসা মাঠে জনসভায় যোগ দেন।
সম্প্রীতি ও উন্নয়নে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘হাজার বছর ধরে এ দেশের বিভিন্ন ধর্মের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে একসঙ্গে বসবাস করে আসছে। আগামী হাজার বছরও যেন তারা একইভাবে সম্প্রীতি ও শান্তির সঙ্গে বসবাস করতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘এ লক্ষ্যে ধর্ম-বর্ণ, দল-মত ও শ্রেণি-পেশা-নির্বিশেষে সব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায় সরকার।’
গতকাল রংপুর ধর্মসভা (রাধা গোবিন্দ মন্দির) পরিদর্শনকালে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে আয়োজিত শুভেচ্ছা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বর্তমান সরকার সব মানুষের সরকার হতে চায় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচনে কোনো এলাকায় বিএনপির প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন, আবার কোনো এলাকায় হননি। তবে সরকার সব নাগরিকের জন্য কাজ করতে চায়। যাঁরা আমাদের ভোট দিয়েছেন, তাঁদেরও সরকার হতে চাই; যাঁরা ভোট দেননি, তাঁদেরও সরকার হতে চাই।’
তিনি জানান, রংপুর মহানগরের উন্নয়নে একনেক সভায় এক হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে জেলার বিভিন্ন উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দুপুর ১২টা ৪ মিনিটে সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে রংপুর ধর্মসভা মন্দির প্রাঙ্গণে পৌঁছলে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানানো হয়। এ সময় শিশুরা নৃত্য পরিবেশনের মাধ্যমে তাঁকে অভ্যর্থনা জানায়।
প্রধানমন্ত্রী মন্দিরের পূজারি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
পরে মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি ভবতোষ সরকার ও সাধারণ সম্পাদক খোকন সরকার তাঁকে একটি ক্রেস্ট উপহার দেন। মন্দির কর্তৃপক্ষের হাতে ১০ লাখ টাকার একটি চেক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের সঞ্চালনায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্ত কুমার কুণ্ড, সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল ও নিপুণ রায় চৌধুরী বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদসহ রংপুরের সংসদ সদস্য ও জেলা পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
শিক্ষার্থীদের খেলার সামগ্রী উপহার : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে বিভিন্ন খেলার সামগ্রী উপহার পেলেন নীলফামারীর সৈয়দপুর সরকারি বিজ্ঞান কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন, সেলফি তোলেন এবং তাঁদের অটোগ্রাফ দেন। এতে উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েন ওই কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীরা।
গতকাল সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর পূর্বনির্ধারিত সফরসূচি অনুযায়ী রংপুরে ধর্মসভার (রাধা গোবিন্দ মন্দির) পূজামণ্ডপে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সামরিক বাহিনী একটি বিমানে করে সৈয়দপুর বিমানবন্দর অবতরণ করেন। সকাল ১০টার দিকে তিনি সফরসঙ্গীদের নিয়ে সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে সড়কপথে রংপুরের উদ্দেশে রওনা দেন। সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে বাসে করে রংপুর যাওয়ার পথে সৈয়দপুর বিমানবন্দর সড়কে সৈয়দপুর সরকারি বিজ্ঞান কলেজের প্রধান ফটকের সামনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বাসটি থামান প্রধানমন্ত্রী। এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েন কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তাঁদের বাঁধভাঙা আনন্দ-উচ্ছ্বাসে প্রধানমন্ত্রী বাসের গেটে এসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে হাত মেলান, কথা বলেন এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মুঠোফোন চেয়ে নিয়ে নিজেই সেলফিও তোলেন।
পরে উপহার হিসেবে শিক্ষার্থীদের হাতে ফুটবল, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন খেলার সামগ্রী তুলে দেন তিনি। এ সময় কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবুল কালাম আজাদ প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান।
সৈয়দপুর থেকে রংপুর আসার পথে তিনি তারাগঞ্জ ও পাগলাপীর এলাকায় দুটি পথসভায় বক্তব্য দেন। সূত্র: কালের কণ্ঠ