রবিবার, ১৭ মে ২০২৬, ১০:৪৬ পূর্বাহ্ন

চীন সফরে অমীমাংসিত ইরান ইস্যু, নতুন সংকটে ট্রাম্প

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্রমশ হতাশ হয়ে উঠছিলেন। এ সময় ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘনিষ্ঠভাবে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তারা ভাবছিলেন— ইরানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, তাই চীন সফর এ বিষয়ে তাদের কোনো গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এনে দিতে পারে। কিন্তু শুক্রবার ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতির কথা জানাতে পারেননি।

ওয়াশিংটনে ফেরার পথে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, চীনের নেতা শি জিনপিং বলেছেন— তিনি হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে চান এবং ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকা উচিত নয় বলে শি জিনপিংও একমত। তবে এ ধরনের বক্তব্য চীন আগেও দিয়েছে যা এক্ষেত্রে চীনের পূর্ব বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি ছিল।

শুক্রবার প্রচারিত ফক্স নিউজের ব্রেট বেয়ারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প তার চীনা সমকক্ষ সম্পর্কে বলেন, ‘তিনি এটা শেষ হতে দেখতে চান। তিনি সাহায্য করতে চান। যদি তিনি সাহায্য করতে চান, সেটা ভালো। কিন্তু আমাদের সাহায্যের প্রয়োজন নেই।’

ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প ও শি’র আলোচনার ফলাফল দেখার পরই তারা ইরান বিষয়ে পরবর্তী পথ নির্ধারণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এখন প্রেসিডেন্টকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ইরানের ওপর আরও হামলা চালানোই কি সংঘাত শেষ করার সবচেয়ে ভালো উপায় হবে কিনা। এই সংঘাত ট্রাম্প প্রথমে যে ছয় সপ্তাহ সময়সীমা বলেছিলেন, তার চেয়েও অনেক বেশি দীর্ঘ হয়েছে; একই সঙ্গে গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে এবং অর্থনীতি নিয়ে তার জনপ্রিয়তা কমিয়ে দিয়েছে।

শুক্রবার চীনা সময় সকালে ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে তার সামরিক অভিযান ‘চলবে!’

এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের ভেতরে কীভাবে এগোনো উচিত তা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে বলে আলোচনার সঙ্গে পরিচিত সূত্রগুলো জানিয়েছে। কিছু কর্মকর্তা যার মধ্যে পেন্টাগনের কর্মকর্তারাও রয়েছেন; তারা আরও আক্রমণাত্মক অবস্থানের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের আশা, লক্ষ্যভিত্তিক হামলা ইরানের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে এবং সমঝোতায় যেতে বাধ্য করবে।

অন্যদিকে, কেউ কেউ কূটনীতির ওপর জোর অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ট্রাম্প নিজেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এই পথের দিকেই ঝুঁকেছেন, এই আশায় যে সরাসরি আলোচনা ও অর্থনৈতিক চাপের সমন্বয় ইরানকে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে রাজি করাবে। কিন্তু এপ্রিল মাসে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার পর থেকে তেহরান চুক্তির শর্তে খুব একটা পরিবর্তন আনেনি।

শুক্রবার এয়ার ফোর্স ওয়ানে ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাব সম্পর্কে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এটা দেখেছি, আর যদি প্রথম বাক্যটাই আমার পছন্দ না হয়, আমি সেটা ফেলে দিই।’

ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এ সপ্তাহের শুরুতে আত্মবিশ্বাস দেখিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, তিনি ‘আজ সকালে জ্যারেড কুশনার এবং স্টিভ উইটকফের সঙ্গে ফোনে যথেষ্ট সময় কথা বলেছেন, আরব বিশ্বের কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গেও কথা বলেছেন।’ ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে সমঝোতা আনার দায়িত্ব এই শীর্ষ কূটনীতিকদের ওপর দিয়েছেন।

ভ্যান্স বলেন, ‘দেখুন, আমি মনে করি আমরা অগ্রগতি করছি। মৌলিক প্রশ্ন হলো: আমরা কি এতটা অগ্রগতি করছি যা প্রেসিডেন্টের নির্ধারিত রেডলাইন পূরণ করতে পারে? এ মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট আমাদের কূটনৈতিক পথেই রেখেছেন, আর আমি সেটাতেই মনোযোগ দিচ্ছি।’

কিন্তু ইরান তাদের কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত না দেওয়ায় ট্রাম্প ক্রমশ অধৈর্য হয়ে উঠেছেন। সূত্রগুলো জানিয়েছে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় তিনি বিরক্ত, যার ফলে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে গেছে। পাশাপাশি ইরানের নেতৃত্বের ভেতরের বিভাজন আলোচনা আরও জটিল করে তুলেছে।

ইরানের সর্বশেষ জবাব এবং সাম্প্রতিক বক্তব্যের কারণে অনেক কর্মকর্তা এখন প্রশ্ন তুলছেন, তেহরান আদৌ কোনো গুরুতর চুক্তিতে আগ্রহী কি না।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি সিএনএনকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে সব ধরনের বিকল্প রয়েছে। তবে তার প্রথম পছন্দ সবসময় কূটনীতি। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এই শাসনের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে, এবং প্রেসিডেন্ট কেবল এমন একটি চুক্তিই গ্রহণ করবেন যা আমাদের দেশের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।’

ন্যাটোতে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত আইভো ডালডার বলেন, ‘তিনি হুমকি দিয়েছেন, কাজ হয়নি। আলোচনা করেছেন, তাতেও কাজ হয়নি। এখন তিনি এমন একটা পথ খুঁজছেন যাতে এই অচলাবস্থা ভাঙা যায়।’

মধ্যবর্তী নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে বের করার তাগিদও তত বাড়ছে। যুদ্ধটি প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তায় বড় আঘাত হেনেছে, কারণ ভোটাররা অর্থনৈতিক চাপ অনুভব করছেন। রিপাবলিকানরা আশঙ্কা করছেন, নভেম্বরের নির্বাচনে এর মূল্য তাদের দিতে হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের গড় মূল্য গ্যালনপ্রতি ৪.৫০ ডলার ছাড়িয়েছে এবং ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলে তা আরও বাড়তে পারে। মুদ্রাস্ফীতিও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে; এপ্রিল মাসে তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো মূল্যস্ফীতি আমেরিকানদের মজুরি বৃদ্ধিকেও ছাড়িয়ে গেছে।

আর যদিও শেয়ারবাজার এখনো মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে, করপোরেট নেতারা পর্দার আড়ালে আরও জোরালোভাবে ট্রাম্প ও তার উপদেষ্টাদের দ্রুত সমাধান খুঁজে বের করার জন্য চাপ দিচ্ছেন।

সম্প্রতি ওয়াল স্ট্রিটের নির্বাহীদের সঙ্গে কথা বলা ট্রাম্পের এক উপদেষ্টা বলেন, ‘তারা শুধু যুদ্ধটা শেষ হোক এটা চায়।’ তিনি সামগ্রিক বার্তাকে বর্ণনা করেন এভাবে: ‘যেভাবেই হোক, দ্রুত শেষ করুন।’

ট্রাম্প প্রায়ই যুদ্ধের অভ্যন্তরীণ প্রভাবকে ছোট করে দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, পরিস্থিতি এর চেয়ে অনেক খারাপ হবে বলে তিনি ভেবেছিলেন। এ সপ্তাহের শুরুতে তিনি অর্থনৈতিক উদ্বেগকে উড়িয়ে দেন, পরে আবার সেটিই জোর দিয়ে পুনরাবৃত্তি করেন।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি আমেরিকানদের আর্থিক অবস্থা নিয়ে ভাবি না। আমি কারও কথা ভাবি না। আমি শুধু একটা বিষয় ভাবি: আমরা ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র পেতে দিতে পারি না। এটাই সব। শুধু এটাই আমাকে প্রেরণা দেয়।’

এই মন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প ফক্স নিউজের বেয়ারকে বলেন, ‘এটা একদম নিখুঁত বক্তব্য। আমি আবারও এটা বলব।’

তবুও ট্রাম্প ও তার দল তাদের জটিল পরিস্থিতি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন। একদিকে ইরানে কোনো ধরনের সাফল্য খোঁজা, অন্যদিকে দ্রুত ফুরিয়ে আসা রাজনৈতিক সময়সীমা সামলানো।

ট্রাম্পের ওই উপদেষ্টা স্বীকার করেন, ‘আমি যখন রাস্তায় গাড়ি চালাই আর ৫ ডলারের গ্যাস দেখি, তখন সেটা আমাকে ভীষণ ভয় পাইয়ে দেয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘তারা একটা উপায় বের করার চেষ্টা করছে, কিন্তু এটা আর বেশি দিন চলবে না। যেভাবেই হোক, তারা প্রণালিটা খুলবে, খুলতেই হবে।’

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD