হিমালয় থেকে নেমে আসা বরফশীতল পানি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের ভয়াবহ স্রোতে তছনছ হয়ে গেছে নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকা। স্বজন হারানো মানুষের কান্নার মধ্যেই এবার শুরু হয়েছে আরও হৃদয়বিদারক এক প্রক্রিয়া। মরদেহের সংখ্যা এত বেশি এবং অনেকের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব না হওয়ায় ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পর বন্যায় নিহতদের গণকবর দিয়েছে নেপালের কর্তৃপক্ষ।
মঙ্গলবার নেপালের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ২৬ আগস্ট হিমালয়ঘেঁষা উপত্যকাগুলোতে ভয়াবহ বন্যা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতের পর এখন পর্যন্ত এক হাজার তিনটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই ঘটনায় এখনও ৩ হাজার ৯১৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
উচ্চভূমিতে হিমবাহ ধসের ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ এই ঢল মুহূর্তের মধ্যে বিস্তীর্ণ এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। প্রবল স্রোতের সঙ্গে বরফশীতল পানি, পাথর, কাদা ও নানা ধরনের ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে ঘরবাড়ি, সড়ক ও জনপদ ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
দুর্যোগের ভয়াবহতা এতটাই ব্যাপক যে অনেক এলাকায় স্বাভাবিকভাবে মৃতদেহ শনাক্ত করা, সংরক্ষণ করা এবং ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী পৃথকভাবে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
চিতওয়ান জেলার একটি গণকবরে এরই মধ্যে বন্যায় নিহতদের দাফন শুরু হয়েছে। স্থানীয়ভাবে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে মৃতদেহ দাহ, প্রার্থনা ও শেষ বিদায়ের বিভিন্ন আচার প্রচলিত থাকলেও বিপুলসংখ্যক মরদেহের কারণে এবার সেই প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেছে।
মরদেহগুলো সংরক্ষণ বা পৃথকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় কর্তৃপক্ষ ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করছে। পরে মরদেহগুলো গণকবরে দাফন করা হচ্ছে।
এর ফলে অনেক পরিবার তাদের স্বজনের শেষকৃত্যে সরাসরি অংশ নেওয়ার সুযোগও পাচ্ছে না। পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য সংগৃহীত ডিএনএ নমুনা পরবর্তী সময়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হতে পারে।
একটি বাড়িতেই ২৪ মরদেহ
দুর্যোগের ভয়াবহতা কতটা বিস্তৃত হয়েছে, তার আরেকটি চিত্র পাওয়া গেছে নুয়াকোট জেলায়।
নিখোঁজ ও জীবিতদের সন্ধানে ড্রোন ব্যবহার করে অভিযান চালানোর সময় পুলিশ একটি বাড়ির ভেতর থেকে ২৪টি মরদেহ উদ্ধার করেছে।
মঙ্গলবার পুলিশ জানিয়েছে, দুর্গম এলাকায় উদ্ধার অভিযান চালিয়ে ওই মরদেহগুলো পাওয়া যায়। বন্যা ও ভূমিধসের কারণে অনেক এলাকা এখনও দুর্গম থাকায় নিখোঁজদের সন্ধানে ড্রোনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
ভারতেও উদ্ধার ১৭ মরদেহ
নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতের প্রভাব সীমান্তের ওপারেও পড়েছে। নদীর ভাটির দিকে ভারতের বিভিন্ন এলাকায়ও মরদেহ ভেসে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
এখন পর্যন্ত ভারত থেকে অন্তত ১৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ফলে নেপালের অভ্যন্তরে উদ্ধারকাজের পাশাপাশি সীমান্তবর্তী নদীপথ ও ভাটির এলাকাতেও উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান চালাতে হচ্ছে।
এই ভয়াবহ দুর্যোগকে ‘অকল্পনীয় ও হৃদয়বিদারক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ।
দুর্যোগের পর থেকে দেশটির বিভিন্ন সংস্থা উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানের পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া মরদেহ শনাক্ত করার কাজও চলছে।
তবে দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড, ধ্বংসস্তূপ এবং বিপুলসংখ্যক নিখোঁজ ব্যক্তির কারণে উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
গত ২৬ আগস্ট হিমালয় অঞ্চলে শুরু হওয়া ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত এক হাজারের বেশি মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে। কিন্তু প্রায় চার হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
একদিকে স্বজনদের সন্ধানে মানুষের অপেক্ষা, অন্যদিকে শনাক্ত না হওয়া মরদেহের সারি—নেপালের এই ভয়াবহ দুর্যোগে মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র ক্রমেই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আল জাজিরা