বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৪৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম :

গ্রাহক টানতে পারছে না স্টারলিংক

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

উচ্চগতির স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের প্রতিশ্রুতি নিয়ে বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করেছিল কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান স্টারলিংক। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক মানের সেবার ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে প্রত্যাশিত গ্রাহক টানতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। উচ্চ ডিভাইস ও মাসিক খরচ, জটিল আমদানি ও পেমেন্ট প্রক্রিয়া, সীমিত লোকাল সাপোর্ট এবং দেশের বিদ্যমান ফাইবার ও ৪জি নেটওয়ার্কের শক্ত অবস্থান—সব মিলিয়ে বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে রয়েছে স্টারলিংক।

২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল দেশে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য লাইসেন্স পায় স্টারলিংক সার্ভিসেস বাংলাদেশ। অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠানটিকে ১০ বছর মেয়াদি লাইসেন্স প্রদান করে। আড়াই মাস পর ১৮ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে তারা। নানা হাঁকডাক দিয়ে কার্যক্রম শুরু করলেও এখন পর্যন্ত মাত্র এক হাজার ৯৩৩ জন গ্রাহক পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রযুক্তিবিদদের মতে, উচ্চ ডিভাইস ও মাসিক খরচ বাংলাদেশের বাজার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পাশাপাশি হার্ডওয়্যার আমদানি, কাস্টমস প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থার জটিলতাও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব এলাকায় পরিষ্কার সিগন্যাল ও স্থিতিশীল কভারেজ নিশ্চিত না হওয়া, সীমিত অফিসিয়াল ডিস্ট্রিবিউশন ও লোকাল সাপোর্ট এবং অভিযোগ নিষ্পত্তিতে ধীরগতিও ইত্যাদি বিষয়ও কাঙ্ক্ষিত গ্রাহকদের মধ্যে অনাগ্রহ বাড়িয়েছে।

ইন্টারনেট ব্যবহারকারী একাধিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে এই সেবা নিতে গ্রাহককে এককালীন যন্ত্রপাতি সেটআপ বাবদ প্রায় ৪৭ হাজার টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। আবাসিক গ্রাহকদের জন্য মাসিক খরচ ছয় হাজার টাকা এবং ‘লাইট’ প্যাকেজে চার হাজার ২০০ টাকা নির্ধারিত। উচ্চ ব্যয়ের কারণে অনেকেই আগ্রহ হারাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশে সেবা দিতে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি পিএলসি থেকে ২০০ গিগাবাইট ব্যান্ডউইথ এবং আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) অপারেটরদের কাছ থেকে ৮০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ নিয়েছে স্টারলিংক। এর মধ্যে বাংলাদেশের গ্রাহকরা ব্যবহার করেছে মাত্র ৩০ জিবিপিএস ব্যান্ডইউথ।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষক তানভীর জোহা গত বৃহস্পতিবার রাতে বলেন, উচ্চ ব্যয়ের কারণে অনেকেই এই সেবা নিতে আগ্রহী নন। অন্যদিকে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) মহাসচিব নাজমুল করিম ভূঁইয়া দাবি করেন, স্টারলিংক আসার পর দেশীয় উদ্যোক্তারা ধ্বংসের পথে। এই প্রতিষ্ঠানের কারণে তরুণ সমাজও বিপথগামী। কারণ বিটিআরসি দেশের অভ্যন্তরে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলেও স্টারলিংকে তা নেই। ফলে তরুণ সমাজ যে কোনো সাইটে অবাধে প্রবেশ করতে পারছে।

তিনি আরো জানান, নন-জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট অরবিট (এনজিএসও) লাইসেন্স কাঠামোতে বাণিজ্যিক আইপিএলসি ব্যবহার বা ক্রস-বর্ডার ডেটা সঞ্চালনের কোনো অনুমতি নেই। স্টারলিংককে কোনোভাবেই এই অনুমতি দেওয়া উচিত নয়।

ইন্টারনেট ব্যবসায়ী একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া এবং দুর্গম এলাকাকে সবসময় ইন্টারনেটে সংযুক্ত রাখতে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্টারলিংককে দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশে সেবা দেয়ার সুযোগ করে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। একই বছর ৭ অক্টোবর স্টারলিংককে ল’ফুল ইন্টারসেপশন কমপ্লায়েন্স (এলআই কমপ্লায়েন্স) সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য জানতে চিঠি দেয় বিটিআরসি। এর জবাবে স্টারলিংক জানায়, লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি এনটিএমসিকে কমপ্লায়েন্স এপিআই সংক্রান্ত টুল সরবরাহ করেছে। এনটিএমসি ওই টুল পেলেও আশানুরূপভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। তবে উভয়পক্ষ এ বিষয়ে নিয়মিত আলোচনা অব্যাহত রেখেছে বলে জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, স্টারলিংকের বিদেশি (রোমিং) গ্রাহকরা যখন বাংলাদেশে অবস্থান করেন, তখন তাদের ইন্টারনেট সেবা দেশের ভেতরে স্থাপিত গ্রাউন্ড স্টেশন ও পপের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত নয়। এ বিষয়ে স্টারলিংক থেকে স্পষ্ট উত্তর জানতে চায় বিটিআরসি। তবে স্টারলিংক এর স্পষ্ট কোনো উত্তর দেয়নি। বিটিআরসি জানিয়েছে, রপ্তানি করা ডেটা বাংলাদেশি গ্রাহক বা বাংলাদেশে বসবাসরত বিদেশিদের সেবা দেবে কি না তা নিশ্চিত করতে হবে। বিটিআরসির এমন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে ইন্টারনেট ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, লাইসেন্সপ্রাপ্ত একটি প্রতিষ্ঠানের দাপ্তরিক কার্যক্রম না থাকলে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিং করা সম্ভব হয় না। স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তবে তা যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়।

সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেন, স্টারলিংকের সংযোগ পেতে নানা ভোগান্তি পেতে হয়। দেশীয় প্রতিষ্ঠানে ফোন দিয়ে দ্রুতই সংযোগ পাওয়া যায় ইন্টারনেটের। আবার সেবায় কোনো ঘাটতি হলে বা নেটের বাফারিং হলে তাদের দ্রুতই জানানো ও সমাধান পাওয়ায় বাংলাদেশে স্টারলিংকের ব্যবসার প্রচার হয়নি।

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD