আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে অবস্থিত তোরখাম সীমান্ত ক্রসিংয়ে সতর্ক পাহারায় তালেবান নিরাপত্তাকর্মীরা। গতকাল তোলা। ছবি : এএফপি
পাকিস্তান গতকাল শুক্রবার আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলসহ দেশটির বড় শহরগুলোতে বোমা হামলা চালিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে গতকাল আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে পাকিস্তান ‘সরাসরি যুদ্ধের’ ঘোষণা দেওয়ার পর এই হামলার ঘটনা ঘটে।
পাকিস্তানের দৈনিক ডন জানায়, গতকাল ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে আইএসপিআরের মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী জানান, এই সেনা অভিযানে ২৭৪ জন তালেবান সেনা ও
জঙ্গি নিহত হয়েছে। এ ছাড়া অভিযানে চার শতাধিক আফগান সেনা আহত হয়েছে, ৭৩টি চৌকি ধ্বংস করা হয়েছে এবং ১৭টি চৌকি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের ১২ জন সেনা প্রাণ হারায়।
তিনি জানান, প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী আফগান বাহিনীর অন্তত ১১৫টি ট্যাংক, সাঁজোয়া যান ও কামান ধ্বংস করা হয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের তিন শহরে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন দেশটির তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার। এ হামলার জন্য সরাসরি আফগানিস্তানের তালেবান সরকারকে দায়ী করেছে ইসলামাবাদ।
তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বলেছেন, পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদ, সোয়াবি ও নওশেরা শহরে ছোট পরিসরে ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়। তবে এই হামলায় কেউ হতাহত হয়নি।
আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের মুখপাত্র জবিহউল্লাহ মুজাহিদ বলেন, আফগান বাহিনী ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা ও অন্যদের আটক করেছে। অন্যদিকে তাদের ১৩ জন সেনা নিহত হয়।
তারা পাকিস্তানের দুটি সামরিক ঘাঁটি ও ১৯টি চৌকি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করলেও পাকিস্তান তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে দুই পক্ষের এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা এ মুহূর্তে কঠিন।
গতকাল আফগানিস্তানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেছেন, তালেবান সরকারের যেকোনো অপতৎপরতায় ইসলামাবাদের নীতি ‘জিরো টলারেন্স’ (শূন্য সহনশীলতা) থাকবে। তিনি বলেন, ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী সব সময় দেশ রক্ষা করার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তিনি বলেন, পাকিস্তান জানে কিভাবে কোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষা করতে হয়।
এএফপির সাংবাদিকরা কাবুল ও কান্দাহারে রাতভর পাকিস্তানের বিমান হামলার কথা জানিয়েছেন। তাঁরা আকাশপথে পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানের উড়ে আসা ও বোমার বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন। তালেবান সরকার গতকাল বিকেলে আফগানিস্তানের আকাশে পাকিস্তানি নজরদারি বিমানের চক্কর মারার কথা জানিয়েছে। তালেবান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কাবুলে এটি ব্যাপক বিস্তৃত হামলা বলে দাবি করা হচ্ছে। এর আগে ইসলামাবাদের বিমান হামলার জবাবে গত বৃহস্পতিবার রাতে পাকিস্তান সীমান্তে অবস্থানরত সেনাদের ওপর হামলা চালায় আফগান সেনারা। এর জেরে গতকাল হামলা চালায় পাকিস্তান।
প্রতিবেশী দেশ আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে পাকিস্তান ‘সরাসরি যুদ্ধের’ ঘোষণা দিলেও শব্দটির ব্যাখ্যা তারা দেয়নি। বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, পাকিস্তানি সেনারা সীমান্ত পেরিয়ে আফগানিস্তানে না ঢুকেই অস্ত্র, ড্রোন ও বিমানের সাহায্যে সীমিত লড়াই চালিয়ে যেতে পারে। তবে আফগানিস্তানে পাকিস্তানি হামলার একটি উল্লেখযোগ্য দিক তুলে ধরেছেন পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক বিশ্লেষক ও আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়ার সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান।
তিনি জানিয়েছেন, সাম্প্রতিকতম হামলায় সশস্ত্র গোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তুর বদলে আফগানিস্তানে তালেবানদের সরকারি স্থাপনাগুলোকে নিশানা করছে পাকিস্তান। বিবিসির ‘নিউজডে’ প্রোগ্রামে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান এখন শাসকগোষ্ঠীকেই নিশানা করছে।’ পাকিস্তানের দাবি, আফগান তালেবান তাদের ওপর হামলা চালানোর জন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীকে আশ্রয় দিচ্ছে।
এদিকে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং সংস্থাটির মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক চলমান পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেছেন। গুতেরেস দুই দেশকে আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন কঠোরভাবে মেনে চলার আহবান জানিয়েছেন। এদিকে সীমান্ত সংঘর্ষ ও প্রাণঘাতী বিমান হামলার প্রেক্ষাপটে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে সংলাপের আহবান জানিয়েছেন তুর্ক। চীন, রাশিয়া, ইরান, তুরস্ক, মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবও এই হামলা থেকে বিরত থেকে দুই দেশকে সংলাপের আহবান জানিয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি। এদিকে তালেবানের বক্তব্য ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা সীমান্তের অন্য প্রান্তে পাকিস্তানকে নিশানা করে ‘নিরলস আক্রমণ’ চালাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তারা বলেছে, এটি একটি ‘অনিশ্চিত পরিস্থিতি’, যা প্রকৃত সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এএফপি জানিয়েছে, পাকিস্তানের তোরখাম শহর এবং আফগানিস্তানের নানগারহার প্রদেশ সংযোগকারী তোরখাম ক্রসিং দুই দেশের মধ্যে বাসিন্দাদের যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। এখানেই গুলি ও গোলাবর্ষণের শব্দ শোনা গেছে।
কাবুলের ৬ নম্বর জেলার দাশতি বারচি এলাকার একজন বাসিন্দা বৃহস্পতিবার রাতে পাকিস্তানি বিমান হামলা সম্পর্কে বলেছেন, হামলার সময় একটি বিস্ফোরণে তাঁর বাড়ি প্রচণ্ডভাবে কেঁপে ওঠে। তিনি বলেন, ‘শুরুতে আমরা ভেবেছিলাম, এটা ভূমিকম্প, কারণ কয়েক দিন আগে কাবুলে ভূমিকম্প হয়েছিল। তার পরই আমরা প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শুনি। দাশতি বারচির মানুষ বিস্ফোরণের পরপরই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে এবং পুরো রাত জেগে থাকে। সবাই ভয় পাচ্ছিল।’
কান্দাহার ও নানগারহার প্রদেশের মানুষের সঙ্গে কথা বলে বিবিসি জানিয়েছে, পরিস্থিতি আপাতত শান্ত বলে মনে হচ্ছে, যদিও সীমান্তের দুই দিকেই উচ্চ সতর্কতা জারি রয়েছে। এক তালেবান সামরিক মুখপাত্র বলেছেন, ‘যদি আমাদের ওপর হামলা চালানো হয়, আমরা জবাব দেব। কিন্তু আপাতত আমরা সংঘর্ষ শুরু করব না।’
এদিকে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের বাসিন্দারা জানিয়েছে, সকাল থেকে যুদ্ধবিমানের শব্দ তারা শুনতে পাচ্ছে না। কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিকায় হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। হতাহতের বিষয়ে এখনো কিছু জানা যায়নি। তবে এই মুহূর্তে কিছুটা হলেও শান্তির পরিবেশ রয়েছে বলে জানিয়েছে কাবুলের বাসিন্দারা।
আফগানিস্তানের তালেবানের পক্ষে পাকিস্তানের সঙ্গে প্রচলিত যুদ্ধ করার আশঙ্কা কম বলে বিবিসি উর্দুকে বলছেন বেশ কিছু বিশ্লেষক। তাঁদের যুুক্তি হচ্ছে, সামরিক ক্ষমতার দিক থেকে দুটি দেশের মধ্যে ব্যবধান বেশি হওয়ার কারণে দেশ দুটির মধ্যে প্রচলিত যুদ্ধের আশঙ্কা কম। তালেবান বাহিনীর হাতে থাকা অস্ত্র মূলত তিনটি উৎস থেকে এসেছে—সাবেক আফগান সেনাবাহিনীর ফেলে যাওয়া অস্ত্র, দেশ ছেড়ে যাওয়া বিদেশি বাহিনীর রেখে যাওয়া সামরিক সরঞ্জাম এবং কালোবাজারসহ বিভিন্ন উৎস থেকে নতুন করে সংগ্রহ করা অস্ত্র। সূত্র : বিবিসি, আল জাজিরা, এএফপি