মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:২৫ অপরাহ্ন

রূপপুরে ফুয়েল লোডিং শুরু, পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে বাংলাদেশ

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬

দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের’ (আরএনপিপি) প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে জ্বালানি ইউরেনিয়াম লোডিং শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) জ্বালানি (ফুয়েল) লোডের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।

এই ফুয়েল লোড প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে এক মাসের মতো সময় লাগতে পারে। এটিই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনে যাওয়ার শেষ ধাপ।

এর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু হলো।

মঙ্গলবার বিকেলে প্রকল্প সাইটে উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।

সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এ প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি কর্পোরেশন-রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ। অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসির ধারণ করা বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়।
সম্মানিত অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম ও উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ ফুয়েল লোডিংয়ের উদ্বোধন করেন।

রাশিয়ার প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতায় পাবনা জেলার ঈশ্বরদীর রূপপুরে দুই ইউনিট বিশিষ্ট এই ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র’টি বাস্তবায়ন হচ্ছে।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল স্থাপনা রিয়্যাক্টর প্রেসার ভেসেল বা চুল্লিপাত্র। এই চুল্লিপাত্রেই জ্বালানি ইউরেনিয়াম লোড বা সংযোজন করা শুরু হলো। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলো। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় ইউরেনিয়াম-২৩৫ নামের মৌলিক পদার্থ। খনি থেকে সংগ্রহ করে ছোট আকৃতিতে একত্রিত করা কয়েকশ পেলেটকে একত্রিত করে একটি ধাতব টিউবে ঢোকানো হয়। যাকে বলা হয় ইউরেনিয়াম রড। অনেকগুলো ফুয়েল রড একত্রিত করে তৈরি করা হয় ফুয়েল এসেম্বলি। একটি এসেম্বলি লম্বায় সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার মিটার দৈর্ঘ্যের হয়। আরএনপিপির রিয়্যাক্টর-১ এ ১৬৩টি এসেম্বলি সংযোজন বা লোড করা হবে। এ ইউরেনিয়াম রাশিয়া থেকে আনা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী আরএনপিপির পুরো মেয়াদেই এই জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়া।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, পারমাণবিক চুল্লিতে ইউরেনিয়াম-২৩৫ লোড করতে সাধারণত সময় লাগে ২১ থেকে ৩০ দিন। এরপর ইউরেনিয়াম রডকে সঠিক অবস্থানে নিতে হয় এবং নিউট্রন হিট করে ফিশন বিক্রিয়া শুরু হয়। সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করে চেইন রিয়াকশনে যেতে হয়। এই প্রক্রিয়া শেষ করতে সময় লাগে কমপক্ষে ৩৪ দিন। এই ফিশন বিক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপকে কাজে লাগিয়ে পানি ব্যবহার করে বাষ্প তৈরি করা হয়। এরপর বাষ্পকে বিশেষভাবে প্রবাহিত করা হয় টারবাইনে। টারবাইন ঘুরলেই ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। প্রথমে এক শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে এটিকে দুই শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত নেওয়া হবে। এরপরই বিদ্যুৎ যাবে গ্রিডে। পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ করতে সময় লাগে ৪০ দিন। এর প্রতিটি ধাপেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতে থাকে।

সূত্রগুলো আরও জানায়, ফুয়েল লোডের পর ধাপে ধাপে প্রক্রিয়াগুলো শেষ করে আগামী জুলাইয়ের শেষে বা আগস্টে বাণিজ্যিকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে প্রক্রিয়াগুলো শেষ করে চলতি বছরের (২০২৬ সালের) ডিসেম্বর অথবা ২০২৭ সালের শুরুতে পুরো মাত্রায় উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হবে।

এদিকে, রূপপুর প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর কেন্দ্রটি পরিচালনা করবে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি অব বাংলাদেশ বা এনপিসিবিএল। চুক্তি অনুযায়ী, এর জনবল কাঠামো ও তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে রাশিয়া। শুরুতে রাশিয়ার অপারেটরদের নেতৃত্বে বিদ্যুৎ চুল্লিটি চালু করা হবে। যেখানে সহযোগী হিসেবে থাকবেন বাংলাদেশিরা। তিন বছরের মাথায় ধীরে ধীরে নেতৃত্বে আসবেন তারা। পাঁচ-সাত বছরে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিচালনা করবেন বাংলাদেশিরাই।

রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করছে দেশটির রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি কর্পোরেশন-রোসাটমের প্রকৌশল বিভাগ এ্যাটমোস্ট্রয়। রাশিয়ান ফেডারেশনের সঙ্গে একটি সাধারণ চুক্তির মাধ্যমে এ কাজ চলছে। এর আগে ২০১৩ সালে সমীক্ষা চুক্তি এবং ২০১৫ সালে নির্মাণ চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী এতে অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া। মূল প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১২.৬ বিলিয়ন ডলার বা এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। এ প্রকল্পে দুটি ইউনিট রয়েছে। ইউনিট দুটিতে রাশিয়ার সর্বশেষ প্রযুক্তির ৩ জি(+) ভিভিইআর ১২০০ রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হয়েছে।

প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১২০০ মেগাওয়াট করে। সে অনুযায়ী এ প্রকল্প থেকে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটির আয়ুষ্কাল (উৎপাদন সময়) ৬০ বছর। এরপর এই সক্ষমতা প্রথমে ২০ বছর, পরে আরও ২০ বছর অর্থাৎ মোট ৪০ বছর এক্সটেনশন করে ১০০ বছর এ প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

এই প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে, যেটিতে ফুয়েল লোডিংয়ের মাধ্যমে উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু হলো। দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণকাজ এখনো চলছে। আগামী বছরের শেষ নাগাদ এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হতে পারে। প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, সবমিলিয়ে পুরো প্রকল্প শেষ হতে ২০২৮ সাল লাগতে পারে।

প্রথম ইউনিটের ফুয়েল লোডিং উদ্বোধন অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, আজকের দিনে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি অপরিহার্য। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সেই চাহিদা পূরণ করবে। শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনই করবে না, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব আনোয়ার হোসেন বলেন, এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে টেকসই করবে। বাংলাদেশকে বিজ্ঞান প্রযুক্তির দেশের দিকে এগিয়ে নেবে।

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD