মুসলিম দেশগুলোকে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করে মার্কিন আধিপত্যের বাইরে একটি নতুন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোজতবা খামেনি।
মঙ্গলবার আরাফাহ দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় তিনি লেখেন, “বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ ও অঞ্চলের জাতিগুলোর মধ্যে বহু অভিন্ন সক্ষমতা ও স্বার্থ রয়েছে, যা নতুন বিশ্বব্যবস্থা এবং অঞ্চল ও বিশ্বের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণ করবে।”
হজের দ্বিতীয় দিন উপলক্ষে দেওয়া ওই বার্তায় বলা হয়, মুসলিম দেশগুলো এমন এক ঐতিহাসিক পর্যায়ে প্রবেশ করছে যেখানে আঞ্চলিক বাস্তবতা অপরিবর্তনীয়ভাবে বদলে যাচ্ছে এবং মার্কিন সামরিক প্রভাব ক্রমাগত কমে আসছে।
খামেনি বলেন, “সময়ের চাকা আর পেছনে ফিরবে না এবং এই অঞ্চলের দেশ ও জনগণ আর মার্কিন ঘাঁটির ঢাল হিসেবে কাজ করবে না।”
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই অঞ্চলে “ষড়যন্ত্র চালানো ও সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের নিরাপদ আশ্রয় আর থাকবে না” এবং দেশটি “প্রতিদিনই তার আগের অবস্থান থেকে আরও দূরে সরে যাচ্ছে।”
তার ভাষায়, “ভবিষ্যৎ মুসলিম উম্মাহ এবং নতুন ইসলামী সভ্যতার।”
ইসরায়েলের পতনের পূর্বাভাস
বার্তায় আঞ্চলিক “প্রতিরোধ অক্ষ”-এর ভূমিকাকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন “ইরান থেকে লেবানন, ফিলিস্তিন, ইরাক ও সিরিয়া, আফ্রিকা ও ইয়েমেন থেকে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান পর্যন্ত” বিস্তৃত।
খামেনি বলেন, এসব শক্তি মার্কিন প্রভাবের বিরুদ্ধে লড়েছে, ইসরায়েলি দখলদারিত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছে এবং দায়েশ (আইএস) তাকফিরি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে।
তিনি ইসরায়েলকে “ক্যানসারসদৃশ টিউমার” এবং “অস্থিতিশীল শাসনব্যবস্থা” হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি তার “অভিশপ্ত জীবনের শেষ পর্যায়ে” পৌঁছে গেছে।
এছাড়া তিনি শহীদ ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির সেই ভবিষ্যদ্বাণীর কথাও স্মরণ করেন, যেখানে তিনি বলেছিলেন ইসরায়েল আরও ২৫ বছর টিকবে না।
‘ইরান ইসরায়েলকে অসহায় করেছে, যুক্তরাষ্ট্রকে কঠিন চপেটাঘাত করেছে’
বার্তার অন্য অংশে খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার জবাবে ইরানের পদক্ষেপের প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, “ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান তার কঠোর আঘাতে জায়নবাদী শাসনকে অসহায় করে দিতে সক্ষম হয়েছে, আগ্রাসী আমেরিকাকে কঠিন চপেটাঘাত করেছে এবং ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার শত্রুর লক্ষ্য ব্যর্থ করে দিয়েছে।”
তিনি ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ও মিত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর, বিশেষ করে লেবাননের সংগঠনগুলোর, প্রশংসা করেন। তার ভাষায়, তারা “পূর্ণ সজ্জিত মার্কিন-জায়নবাদী সন্ত্রাসী বাহিনীর” বিরুদ্ধে “উল্লেখযোগ্য বিজয়” অর্জন করেছে।
এতে বিশেষভাবে “স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথে” ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের কথাও উল্লেখ করা হয়, যা “মহাশয়তান আমেরিকা এবং তার প্রশিক্ষিত পশু জায়নবাদী শাসনের” বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
‘ইরানি জাতি বিশ্বকে বিস্মিত করেছে’
বার্তায় আরও বলা হয়, আগ্রাসনের শুরুর দিকে আয়াতুল্লাহ খামেনির শাহাদাতের পর ইরানের জনগণ নতুন এক গণ-সমাবেশ ও প্রতিরোধের ধাপে প্রবেশ করে।
এতে বলা হয়, জনগণ দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সমর্থনে রাস্তায় নেমে এবং শাহাদাতের পরও দৃঢ়তা প্রদর্শনের মাধ্যমে “বিশ্বকে বিস্মিত করেছে।”
হজ ‘আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের পথ’
খামেনি হজকে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, মিথ্যা শক্তির প্রত্যাখ্যান, আত্মশুদ্ধি এবং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থানের ধারাবাহিক পথ হিসেবে বর্ণনা করেন।
তার মতে, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের সময় ইরানি জাতি “আত্মসমর্পণ” প্রত্যাখ্যান করে “বিশুদ্ধ মুহাম্মদী ইসলাম”-এর পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে এই পথ গ্রহণ করেছিল।
তিনি বলেন, সেই ধর্মীয় উদ্দীপনাই ইরানি জনগণকে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত শাহ শাসনের পতন ঘটাতে শক্তি জুগিয়েছিল। একই উদ্দীপনা ১৯৮০-এর দশকের পশ্চিমা-সমর্থিত যুদ্ধ ও দীর্ঘ বিদেশি নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধেও দেশটিকে টিকিয়ে রেখেছে।
‘মুসলিম বিশ্বের সাধারণ স্লোগান হবে: আমেরিকার মৃত্যু, ইসরায়েলের মৃত্যু’
ইরানি হাজিদের উদ্দেশে খামেনি বলেন, অন্যান্য দেশের মুসলমানদের কাছে “তৃতীয় চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিজয়ের কাহিনি” পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের “গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর ভূমিকা” রয়েছে।
তিনি মুসলিম ঐক্য, ফিলিস্তিনের মুক্তি এবং “বিশ্ব অহংকারের” বিরুদ্ধে বিজয়ের জন্য দোয়ার আহ্বান জানান।
বার্তায় “বারাআহ” বা শত্রু ও জালিমদের প্রতি ঘৃণা ও বিচ্ছিন্নতার ধারণাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, এই নীতি শুধু হজের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের অংশ।
শেষে খামেনি বলেন, “আমেরিকার মৃত্যু এবং ইসরায়েলের মৃত্যু হবে ইসলামী উম্মাহ ও বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের, বিশেষ করে তরুণদের, অভিন্ন স্লোগান।”