শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬, ০৯:৩০ অপরাহ্ন

কোটি টাকার বকেয়ায় জিম্মি বগুড়ার চামড়া বাজার

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬
কোটি টাকার বকেয়ায় জিম্মি বগুড়ার চামড়া বাজার

চার লাখ টাকার গরুর চামড়া পাঁচশ টাকা কেমনে হয়? এটা তো গরিব আর এতিমের হক।

গরিবের হক ধনীরা মেরে খাচ্ছে।’ চার লাখ টাকা দিয়ে গরু কিনে কোরবানির পর চামড়া বিক্রির সময় এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন বগুড়া শহরের বাসিন্দা মানিক মিয়া।

তিনি আরও বলেন, সরকার তো বসে আছে। যারা খাওয়ার তারা খাচ্ছে। অথচ এই টাকাগুলো এতিম-মাদরাসার কাজে লাগার কথা।

শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বিপাকে পড়েছেন দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ীরাও। প্রায় ২৭ বছর ধরে চামড়া ব্যবসায় জড়িত মোহাম্মদ মুন্টু মোল্লা বলেন, জীবনে এত খারাপ বাজার দেখিনি। এবারই সবচেয়ে কম দাম দেখলাম। ট্যানারি মালিকরা টাকা দেয় না। কোটি কোটি টাকার চামড়া দিয়েছি, কিন্তু লিখিত কাগজও পাইনি।

তার অভিযোগ, ঢাকার কয়েকটি ট্যানারি প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর ব্যবসায়ীদের পাওনা পরিশোধ না করে বাজার থেকে সরে গেছে। রিলায়েন্স, বিএলসি, ঢাকা হাইড এমন অনেক কোম্পানি কোটি কোটি টাকা মেরে দিয়েছে। আমরা শুধু কথার ওপর ভরসা করে চামড়া দিয়েছি, পরে টাকা পাইনি।

একসময় কোরবানির ঈদ মানেই ছিল এতিমখানা, মাদরাসা আর গরিব মানুষের জন্য বাড়তি আয়ের বড় উৎস। সেই পশুর চামড়াই এখন অনেকের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বগুড়ার বিভিন্ন এলাকায় এবার দেখা গেছে ভয়াবহ চিত্র। খাসির চামড়া রাস্তার পাশে পড়ে আছে, ফ্রি দিলেও নিতে চাচ্ছে না কেউ। আর লাখ টাকার গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু বাজার ধস নয়, ঢাকার ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেট, কোটি কোটি টাকার বকেয়া এবং নগদ অর্থ সংকট মিলেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে দেশের ঐতিহ্যবাহী চামড়া শিল্পকে।

শহরের বাদুড়তলা, থানামোড়, চকসূত্রাপুর, ইয়াকুবিয়া স্কুল মোড়, সাবগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চামড়া কেনাবেচা চললেও বাজারে ছিল হতাশার ছাপ। অনেক কোরবানিদাতা চামড়া নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন, কিন্তু ন্যায্যমূল্যের তো প্রশ্নই আসে না উল্টো কোথাও ক্রেতাই পাওয়া যায়নি।

গরুর চামড়া আকার ও মানভেদে ২০০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বেশিরভাগ চামড়াই বিক্রি হয়েছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে। আর খাসির চামড়া কোনো কোনো এলাকায় ৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অনেক জায়গায় বিনামূল্যেও কেউ নিতে রাজি হয়নি।

বগুড়ার চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে বকেয়া টাকার পাহাড় জমে যাওয়ায় মাঠপর্যায়ে ভেঙে পড়েছে পুরো সংগ্রহ ব্যবস্থা।

জেলা চামড়া ব্যবসায়ী মালিক সমিতির তথ্যমতে, বর্তমানে বগুড়ার ব্যবসায়ীদের প্রায় ৩২ কোটি টাকা বিভিন্ন ট্যানারি প্রতিষ্ঠানের কাছে আটকা আছে।

সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকুল হোসেন জানান, আগে থেকেই প্রায় ২২ কোটি টাকা বকেয়া ছিল। গত এক বছরে আরও ১০ কোটি টাকা যোগ হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এ টাকা না পাওয়ায় পাড়া-মহল্লার ফড়িয়া ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের আগাম টাকা দেওয়া যায়নি। নগদ সংকটে অনেকেই বাজারে নামেনি। তার মতে, বছরের পর বছর টাকা আটকে থাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মূলধন হারিয়ে ব্যবসা ছাড়ছেন। একসময় বগুড়ায় দেড় লাখ পর্যন্ত চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য থাকলেও এখন সেটি অর্ধেকের নিচে নেমেছে।

ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, কয়েক বছর আগেও কোরবানিতে ভালো মানের গরুর চামড়া ২ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হতো। খাসির চামড়ার দাম ছিল ২০০ থেকে ৪০০ টাকা। কিন্তু ২০১৮ সালের পর থেকে বাজারে ধস নামতে শুরু করে। বর্তমানে গরুর চামড়া ২০০ থেকে ৫০০ আর খাসির চামড়া ৫ থেকে ৩০ টাকায় নেমেছে।

বিশেষ করে খাসির চামড়া নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। কারণ গরুর চামড়া কিছুদিন লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা গেলেও খাসির চামড়া দ্রুত নষ্ট হয়।

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD