রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ১২:৫৪ অপরাহ্ন

ডেমোক্র্যাটদের তোপের মুখে ইসরাইলপন্থি লবিং গ্রুপ ‘আইপ্যাক’

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ডেমোক্র্যাটদের ইসরাইলের পক্ষে টানতে বরাবরই ভূমিকা রেখে এসেছে শক্তিশালী ইসরাইলপন্থি লবিং গ্রুপ আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (আইপ্যাক)। তবে এবারের চিত্র ভিন্ন। আসন্ন ২৩ জুনের প্রাথমিক বাছাই (প্রাইমারি) নির্বাচনকে সামনে রেখে অনেক ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এখন উল্টো আইপ্যাকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন।

নিউইয়র্কের ১০ম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ব্র্যাড ল্যান্ডার গত বছরের শেষের দিকেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি ওয়াশিংটনে গিয়ে ‘আইপ্যাকের হুকুম’ তামিল করবেন না। নির্বাচনী প্রচারণায় ল্যান্ডার আইপ্যাককে ওয়াল স্ট্রিট ও ক্রিপ্টো কারেন্সির সঙ্গে তুলনা করে একে গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য একটি দুর্নীতিগ্রস্ত প্রভাব হিসেবে অভিহিত করেছেন।

অন্যদিকে, তার প্রতিদ্বন্দ্বী বর্তমান আইনপ্রণেতা ড্যান গোল্ডম্যান আইপ্যাকের সমর্থন নিলেও কোনো রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটির (প্যাক) তহবিল নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এবং আইপ্যাককে প্রয়োজনে ইসরাইল সরকারের সমালোচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন।

আইপ্যাক ও অর্থশক্তির ভূমিকা

আইপ্যাক সাধারণত সদস্যদের ইসরাইলবিরোধী প্রার্থীদের প্রত্যাখ্যান এবং ইসরাইলপন্থিদের সমর্থনের আহ্বান জানিয়ে কাজ করে। তবে তাদের একটি ‘সুপার প্যাক’ রয়েছে, যার নাম ‘ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট’ (ইউডিপী)। এই সুপার প্যাকে দাতারা ইচ্ছামতো অর্থ দিতে পারেন এবং সেই অর্থ প্রার্থীদের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রচারণায় খরচ করা হয়। এবারের ডেমোক্র্যাট প্রাইমারিতে আইপ্যাক বিপুল অর্থ খরচ করলেও ফলাফল এসেছে মিশ্র।

আইপ্যাকের মুখপাত্র প্যাট্রিক ডরটন অবশ্য দাবি করেছেন, ডেমোক্র্যাট দলের ভেতর একটি প্রান্তিক বাম অংশ প্রাইমারি ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে রাজনীতিতে ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে, আর আইপ্যাক কেবল দলের ইসরাইলপন্থি সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে রক্ষা করছে।

তবে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে যখন ইসরাইলে নিঃশর্ত সামরিক সহায়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তখন বড় দাতাদের গোপন অর্থ ব্যবহার করে ইসরাইলকে রক্ষা করার এই চেষ্টা আইপ্যাককে খোদ বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

ঐতিহাসিক বিভাজন ও ওবামা আমল

১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর কয়েক দশক ধরে আইপ্যাক দ্বিপক্ষীয় ও অপরাজেয় ছিল। তবে বারাক ওবামার প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তিকে কেন্দ্র করে এই ঐকমত্যে ফাটল ধরে। ইসরাইল সরকার সেই চুক্তির বিরোধিতা করায় আইপ্যাক চুক্তিটি বাতিলের জন্য ৩ কোটি ডলার খরচ করেও ব্যর্থ হয়। তৎকালীন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ওবামার আপত্তি উপেক্ষা করে মার্কিন কংগ্রেসে বক্তব্য দেন। এরপর থেকে অনেক ডেমোক্র্যাট নেতা নেতানিয়াহু সরকারের কট্টরপন্থি নীতি, যেমন পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন এবং ইরান সংক্রান্ত অবস্থানের বিরুদ্ধে চলে যান। তা সত্ত্বেও আইপ্যাক ইসরাইল সরকারকে নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে যায়।

২০১৮ সালে কংগ্রেসে ‘দ্য স্কোয়াড’ (তরুণ প্রগতিশীল আইনপ্রণেতাদের জোট) গঠনের পর আইপ্যাকের উদ্বেগ আরো বাড়ে। ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তারা সুপার প্যাক গঠন করে ২ কোটি ৬০ লাখ ডলার খরচ করে। একই সময়ে আইপ্যাক এমন ১০০ জনের বেশি ইসরাইলপন্থি আইনপ্রণেতাকে সমর্থন দেয়, যারা ২০২০ সালের মার্কিন নির্বাচনী ফলাফল বাতিলের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের প্রাইমারিতে ‘দ্য স্কোয়াড’-এর দুই সদস্যকে হারাতে ইউডিপী ২ কোটি ৩০ লাখ ডলার খরচ করে। চলতি বছর বিভিন্ন আসনের নির্বাচনে প্রভাব খাটাতে ইউডিপীর তহবিলে প্রায় ১০ কোটি ডলার রয়েছে।

পাল্টা ধাক্কা ও প্রার্থীদের জয়

আইপ্যাকের বিপুল অর্থ খরচ সত্ত্বেও দলটির ভেতরে পাল্টা ধাক্কা শুরু হয়েছে। নিউ জার্সির সাবেক প্রতিনিধি টম ম্যালিনোস্কি ইসরাইলের নিরাপত্তার পক্ষে হলেও ওয়ান-সেভেন (৭ অক্টোবর) হামলার পর নেতানিয়াহুর অতিরিক্ত প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের সমালোচক ছিলেন। তাকে হারাতে আইপ্যাক ২৩ লাখ ডলারের বেশি খরচ করে। বিজ্ঞাপনগুলোতে ইসরাইলের কথা উল্লেখ না করে ম্যালিনোস্কির অভিবাসন নীতি সংক্রান্ত বিষয়ের ওপর আক্রমণ করা হয়। তবে আইপ্যাকের পছন্দের প্রার্থীও শেষ পর্যন্ত জিততে পারেনি, ডেমোক্র্যাটরা সেখানে প্রগতিশীল প্রার্থী অ্যানালিলিয়া মেজিয়াকে মনোনীত করে।

একইভাবে শিকাগো অঞ্চলের ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ড্যানিয়েল বিস ইসরাইলে অনিয়ন্ত্রিত সামরিক সহায়তার বিরোধিতা করায় আইপ্যাক তার বিরুদ্ধে মাঠে নামে। বিস জরিপ করে দেখেন যে তার এলাকার ৫১ শতাংশ ডেমোক্র্যাট ভোটার আইপ্যাককে অপছন্দ করেন এবং মাত্র ১৭ শতাংশ পছন্দ করেন। বিস তার নির্বাচনী বিজ্ঞাপনে আইপ্যাকের এই বিরোধিতাকেই তুলে ধরেন এবং গত মার্চের প্রাইমারিতে জয়লাভ করেন।

ইসরাইল প্রশ্নে নতুন বিতর্ক

আইপ্যাকের সমালোচনা করা এখন বামপন্থিদের জন্য ভালো রাজনীতি হলেও বিষয়টি সংবেদনশীল। টেক্সাসের এক ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মরিন গ্যালিন্ডো মার্কিন জায়নবাদীদের জেলে পাঠানোর মতো উগ্র মন্তব্যও করেছেন, যদিও তিনি ইহুদি-বিদ্বেষের কথা অস্বীকার করেছেন।

ব্র্যাড ল্যান্ডারের মতে, ইহুদি ও অর্থশক্তি নিয়ে তৈরি হওয়া বিদ্বেষমূলক প্রচারণার কারণে এ বিষয়ে কথা বলা অস্বস্তিকর হলেও কথা বলাটা জরুরি হয়ে পড়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কট্টর প্রগতিশীলদের চেয়ে বিস বা ম্যালিনোস্কির মতো মূলধারার ডেমোক্র্যাটরা ইসরাইলপন্থি ঐকমত্যের জন্য বেশি বড় হুমকি। কারণ তারা ইসরাইলপন্থি হয়েও নেতানিয়াহু সরকারের সমালোচনা করছেন। স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্পও চলতি মাসে এক ফোনালাপে নেতানিয়াহুর কৃতজ্ঞতাবোধ না থাকায় তাকে ‘পাগল’ বলে অভিহিত করেছেন।

আইপ্যাকের কট্টরপন্থি ও আপসহীন অবস্থানের কারণে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ইসরাইলপন্থি সংগঠন ‘জে স্ট্রিট’-এর প্রেসিডেন্ট জেরেমি বেন-অমি মন্তব্য করেছেন, ‘আইপ্যাক আগুন নিয়ে খেলছে এবং আমাদের পুরো ঘর পুড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।’

সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিন

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD