মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৫ পূর্বাহ্ন

‘ইরানের চেয়েও বড় হুমকি পশ্চিম তীরে ইহুদি সন্ত্রাস’

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ইরান, গাজা কিংবা লেবানন নয়—ইসরাইলের জন্য এখন সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা। এমনটাই মনে করছেন দেশটির সাবেক জেনারেল, গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও প্রধানমন্ত্রীদের একটি অংশ। ডিজিটালম্যাপ দেখুন

তাদের অভিযোগ, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এর পেছনে সরকারের সমর্থন ও নিরাপত্তা কাঠামোর একাংশের সহযোগিতা রয়েছে। বসতিস্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর, মসজিদ ও গ্রামে হামলা চালাচ্ছেন, আগুন দিচ্ছেন। তাদের জমি ও গবাদিপশু দখলেরও অভিযোগ রয়েছে।

ইসরাইলের সাবেক মেজর জেনারেল আইয়াল বেন-রুভেন সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেছেন। সেখানে তিনি বসতিস্থাপনকারীদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। দেখেছেন লুট হওয়া একটি স্কুলের ধ্বংসাবশেষও।

বেন-রুভেনের সামরিক জীবনের বড় অংশ কেটেছে ইসরাইলের হয়ে যুদ্ধ করে। ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে তার প্লাটুন প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। পরে তিনি পশ্চিম তীরে একটি ডিভিশনের নেতৃত্ব দেন। ২০০৬ সালে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধেও ইসরাইলের স্থলবাহিনীর নেতৃত্ব দেন।

এখন সেই সাবেক জেনারেলই বলছেন, ইসরাইলের নিরাপত্তা নিয়ে তার ধারণা বদলে গেছে।

বেন-রুভেন বলেন, ‘বসতিস্থাপনকারীরা এখানে যা করছে, সেটিই ইসরাইলের জন্য প্রকৃত হুমকি। ইরান, গাজা কিংবা লেবাননের চেয়েও এটি আমাকে বেশি উদ্বিগ্ন করছে।’

তার সঙ্গে সফরে থাকা সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী এফ্রাইম স্নেহ বলেন, ‘সহজভাবে বললে, এটি জাতিগত নির্মূল।’

পশ্চিম তীরে বাড়ছে হামলা

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে হামলার পর থেকে দেশটি একের পর এক যুদ্ধে জড়িয়েছে। ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ ইসরাইলি নিহত হন।

এরপর গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়। এতে গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং কয়েক দশক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গে দুই দফা সংঘর্ষ হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধেও দুটি সামরিক অভিযান চালিয়েছে ইসরাইল।

এসব সংঘাতের আড়ালে পশ্চিম তীরে আরেকটি সংঘাত তীব্র হয়েছে।

সশস্ত্র ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর, মসজিদ ও গ্রামে হামলা চালাচ্ছেন। কোথাও আগুন দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব হামলার উদ্দেশ্য ফিলিস্তিনিদের ওই এলাকা থেকে বিতাড়িত করা।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে পশ্চিম তীরে বসতিস্থাপনকারীরা হাজারো হামলা চালিয়েছেন। এতে হাজারো ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন।

চলতি বছরেই বসতিস্থাপনকারীদের হামলায় ৩ হাজার ২০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। গত বছরের তুলনায় এই হার দ্বিগুণ।

জাতিসংঘ বলছে, ২০২০ সালে বসতিস্থাপনকারীদের হামলায় গড়ে প্রতি তিন দিনে একজন ফিলিস্তিনি আহত হতেন। ২০২৬ সালে সেই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিদিন তিনজনের বেশি।

ইসরাইলের পশ্চিম তীরে দায়িত্বপ্রাপ্ত শীর্ষ সামরিক কমান্ডারও সতর্ক করেছেন, এই সহিংসতা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

‘ইহুদি সন্ত্রাস’ বন্ধের দাবি

পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে ইসরাইলের ভেতরে ক্ষোভও বাড়ছে।

জুনে ২০০-এর বেশি প্রভাবশালী ইসরাইলি একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন দুজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, ৩০-এর বেশি অবসরপ্রাপ্ত সেনা ও বিমানবাহিনীর জেনারেল এবং দেশটির বিদেশ ও অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধানেরা। ছিলেন রাব্বি, নোবেল পুরস্কারজয়ী ব্যক্তি ও একজন খ্যাতিমান ঔপন্যাসিকও।

চিঠিতে তাঁরা পশ্চিম তীরে ‘ইহুদি সন্ত্রাস’ ও ‘জাতিগত নির্মূল’ বন্ধের দাবি জানান।

স্বাক্ষরকারীদের অনেকে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দল থেকেও এসেছেন। তাঁদের অনেকেই একসময় কঠোর নিরাপত্তাপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

চিঠিতে বলা হয়, নেতানিয়াহু সরকার শুধু বসতিস্থাপনকারীদের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়নি। বরং এটি একটি ‘পরিকল্পিত সরকারি নীতি’ অনুসরণ করছে।

সামরিক বাহিনী, শিন বেত ও পুলিশসহ পুরো নিরাপত্তা কাঠামো এতে জেনেশুনে জড়িত বলে তাঁদের অভিযোগ।

অবৈধ ইসরাইলি বসতি ও খামার গড়ে তুলতে সরকারি অর্থ ব্যয়েরও হিসাব চেয়েছেন তাঁরা। এসব স্থাপনায় রাস্তা, পানি, বিদ্যুৎ, যানবাহন ও অস্ত্র সরবরাহে কত অর্থ ব্যয় হয়েছে, তার পূর্ণ হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা আরও অভিযোগ করেন, ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার সময় অনেক ক্ষেত্রে ইসরাইলি সেনারা দাঁড়িয়ে থাকে। কোথাও কোথাও সেনারা বসতিস্থাপনকারীদের সঙ্গে মিলে ফিলিস্তিনি গ্রামেও হামলা চালায়।

‘আগের প্রধানমন্ত্রীদের কেউ এটা হতে দিতেন না’

চারজন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আজরিয়েল নেভো পশ্চিম তীরে যা দেখেছেন, তা ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেছেন।

তিনি বলেন, তিনি যেসব প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করেছেন, তাঁদের কেউ এমন ঘটনা ঘটতে দিতেন না।

এই সমালোচনার গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ এসব অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অনেকেই নিজের সামরিক জীবনে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালিয়েছেন।

তাঁরা হত্যার অনুমোদন দিয়েছেন, বিমান হামলা চালিয়েছেন এবং অভিযান পরিচালনা করেছেন। এসব অভিযানে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকও নিহত হয়েছেন।

তাঁদের বক্তব্য, তখন তাঁরা ইসরাইলের নিরাপত্তার স্বার্থে সামরিক কাঠামো ও আইনি ব্যবস্থার অধীনে কাজ করেছেন।

বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন বলে তাঁরা মনে করেন।

তাঁদের মতে, এখন সহিংসতা নিয়ন্ত্রণহীন ও নির্বিচার। নিরপরাধ বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য পশ্চিম তীরের বড় অংশ থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে সেখানে ইসরাইলিদের বসতি স্থাপন এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা শেষ করা।

নাৎসিবাদের সঙ্গে তুলনা

কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান হামলাকে নাৎসিবাদের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

ইসরাইলে এই তুলনা অত্যন্ত বিতর্কিত। কারণ ইউরোপে নাৎসি নিপীড়নে বহু ইহুদি পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়েছিল।

সাবেক সেনাপ্রধান ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে ইয়ালন সম্প্রতি পশ্চিম তীরের উগ্র ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারীদের আদর্শের সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার জার্মানির তুলনা করেন।

ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেটে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ব কী?’

হলোকাস্টের ৮০ বছর পর পরিস্থিতিকে ‘উল্টো মাইন ক্যাম্পফ’ হিসেবে উল্লেখ করে ইয়ালন বলেন, ‘শ্রেষ্ঠ জাতি আমরা।’

নেতানিয়াহুর কার্যালয় এসব অভিযোগ নিয়ে মন্তব্য করেনি। পশ্চিম তীরে বসতিস্থাপনকারীদের হামলা নিয়ে তথ্য চাইলেও সরকার একাধিক অনুরোধের জবাব দেয়নি।

এর আগে নেতানিয়াহু বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতাকে ‘মুষ্টিমেয় কয়েকজন তরুণের’ বেআইনি কর্মকাণ্ড হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তাঁর সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী আবার বলেছেন, ‘ইহুদি সন্ত্রাস’ বলে কিছু নেই।

তবে বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে চাপ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রও এর নিন্দা জানিয়েছে।

সম্প্রতি বসতিস্থাপনকারীরা কয়েকটি ফিলিস্তিনি বাড়ি ঘেরাও করেন। এর একটি বাড়ির মালিক ছিলেন একজন মার্কিন নাগরিক।

এর পর নেতানিয়াহু এক বিরল বিবৃতিতে এসব ঘটনাকে ‘অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড’ বলেন। তাঁর মতে, এতে আইন মেনে চলা বসতিস্থাপনকারীদের ‘ব্যাপক ক্ষতি’ হচ্ছে এবং বিশ্বে ইসরাইলের অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ইসরাইলি সামরিক বাহিনী অবশ্য বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতায় সহযোগিতার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, পশ্চিম তীরে তাদের দায়িত্ব হলো ‘সব বাসিন্দাকে সুরক্ষা দেওয়া’।

সামরিক বাহিনী বলেছে, কোনো সেনা বসতিস্থাপনকারীদের হামলায় অংশ নিলে বা হামলার সময় দাঁড়িয়ে থাকলে তিনি তাঁর আদেশ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করছেন।

‘ওরা আমার বাড়ি নিয়ে নিতে চায়’

পশ্চিম তীরের বুরিন গ্রামে সাবেক ইসরাইলি কর্মকর্তাদের সামনে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ফিলিস্তিনি কৃষক বাশার ঈদ।

লাঠিতে ভর দিয়ে তিনি তাঁদের বাড়ির ছাদে নিয়ে যান। তাঁর দাবি, বসতিস্থাপনকারীদের হামলায় তিনি গুরুতর আহত হয়ে স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়েছেন।

তিনি বলেন, পাহাড়ের আশপাশে থাকা বসতিস্থাপনকারীদের ঘাঁটি থেকে প্রায় প্রতিদিন তাঁর গ্রামে হামলা হয়। এমনকি ইহুদিদের বিশ্রামের দিন সাবাথেও তাঁরা সেখানে আসেন।

একদিন নিজের জমিতে এক কিশোর বসতিস্থাপনকারীকে দেখতে পান ঈদ। কী করছে জানতে চাইলে কিশোরটি তাঁকে চুপ করতে বলে। অন্যথায় তাঁর অন্য পা-টিও ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেয়।

ঈদ বলেন, ‘একটি শিশু আমাকে এ কথা বলেছে।’

হামলার ভয়ে এখন আর নিজের জমিতে চাষ করতে পারেন না তিনি। দিনের বড় সময় বাড়ির ছাদে বসে বসতিস্থাপনকারীদের গতিবিধি দেখেন।

তিনি বলেন, ‘আমি জানি না কী করব। ওরা আমার বাড়ি নিয়ে নিতে চায়।’

সফরে থাকা সাবেক এক প্রধান রাষ্ট্রীয় কৌঁসুলি প্রশ্ন করেন, ইসরাইলি বাহিনী যখন ফিলিস্তিনিদের রক্ষা করছে না, তখন তাঁরা নিজেদের রক্ষা করেন না কেন।

ঈদ বলেন, তিনি নিজেকে রক্ষা করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে বলে ভয় পান।

সফর আয়োজনকারী সাবেক জেনারেল ইয়াকভ অর বলেন, ফিলিস্তিনিরা সহিংসভাবে প্রতিরোধ করলে বসতিস্থাপনকারীদের পাল্টা হামলা আরও কঠোর হতে পারে। ইসরাইলি সেনাবাহিনীও তখন অভিযানে নামতে পারে।

একটি জনপদ মুছে যাওয়ার গল্প

পশ্চিম তীরের জর্ডান উপত্যকায় গত কয়েক বছরে বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতায় কয়েকটি ফিলিস্তিনি জনপদ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এর একটি হামামাত আল-মালেহ।

ফেব্রুয়ারিতে সেখানে কয়েকটি পরিবারকে উসমানীয় আমলের একটি পাথরের ভবনে আশ্রয় নিতে দেখা যায়। তাঁরা খালি মেঝেতে গাদাগাদি করে থাকতেন।

৩৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ খলিল বলেন, ‘আমরা এক ঘণ্টাও ঘুমাতে পারি না। তারা যখন আসে, আর আপনি ঘুমিয়ে থাকেন, তাহলে বাঁচবেন না।’

সেখানে দাতাদের অর্থে তৈরি একটি স্কুলও ছিল। তবে শিক্ষার্থীরা সবাই চলে যাওয়ায় স্কুলটি বন্ধ ছিল।

মার্চে বসতিস্থাপনকারীদের ধারাবাহিক হামলা, লুটপাট ও চুরির পর খলিলসহ শেষ পরিবারগুলোও এলাকা ছেড়ে যায়।

এরপর বাসিন্দা ও অধিকারকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বসতিস্থাপনকারীরা বুলডোজার দিয়ে স্কুলটি গুঁড়িয়ে দেয়। পরে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পাসওভার উৎসব উদ্‌যাপনের ভিডিও প্রকাশ করা হয়।

জুনের শেষ দিকে অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলরা সেখানে পৌঁছানোর সময় পুরো জনপদটি ফাঁকা।

ধ্বংস হওয়া স্কুল দেখে ক্ষুব্ধ হন সাবেক বিমানবাহিনী জেনারেল নেহেমিয়া ডাগান।

তিনি বলেন, ‘যখন আপনি বই পোড়ান, জ্ঞান ধ্বংস করেন এবং শিশুদের ওপর হামলা করেন, তখন আপনি জার্মানদের মতো আচরণ করছেন।’

৮৬ বছর বয়সী ডাগান বলেন, ‘আমরা নিজেদের হারিয়ে ফেলেছি। এই লড়াইটিও আমরা হেরে গেছি।’

দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের আলাদা হতে হবে। তাদের জন্য নয়, আমাদের নিজেদের জন্য।’

‘ছয় মাস আগে এটি আমাদের জমি ছিল’

সফরের শেষ দিকে উত্তর জর্ডান উপত্যকার একটি অনুর্বর এলাকায় যান সাবেক জেনারেলরা।

সেখানে এক তরুণ ফিলিস্তিনি কৃষক তাঁদের নিজের জমির দিকে দেখান। পেছনের পাহাড়ে বসতিস্থাপনকারীদের একটি ঘাঁটি। তার ওপর ইসরাইলি পতাকা উড়ছে। সামনেও সারি করে ইসরাইলি পতাকা পোঁতা।

কাছেই একটি বেড়া দেওয়া হয়েছে। এতে কৃষকের জমিটি অনেকটা ঘেরের মতো হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, ‘ছয় মাস আগে এটি আমাদের জমি ছিল। এখন এটি জেলের মতো।’

জানুয়ারি পর্যন্ত তাঁদের জীবন স্বাভাবিক ছিল। তাঁরা চাষ করতেন, ভেড়া চরাতেন এবং নিজেদের মতো চলাফেরা করতেন।

প্রথম বসতিস্থাপনকারীরা পাহাড়ে অবস্থান নেওয়ার পর সব বদলে যায়।

কৃষক বলেন, জমিতে যাওয়ার চেষ্টা করলেই বসতিস্থাপনকারীরা পুলিশে খবর দেয়। তাঁকে চারবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রতিবারই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ই-পেপারসাবস্ক্রাইব করুন

কিন্তু বসতিস্থাপনকারীদের হয়রানি কিংবা পানির ট্যাংক নষ্ট করার অভিযোগ জানাতে পুলিশকে ফোন করলে কেউ সাড়া দেয় না বলে তাঁর অভিযোগ।

ইসরাইলের জাতীয় পুলিশ অবশ্য বলেছে, সন্দেহভাজন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিটি অভিযোগ ও ঘটনা তারা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে।

জমিতে যেতে না পারায় কৃষক তাঁর ভেড়াগুলোও বিক্রি করে দেন। কারণ, সেগুলো চরাতে না পারলে বসতিস্থাপনকারীদের হাতে হারানো অথবা খাবারের অভাবে মারা যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।

‘আমি লজ্জিত’

সফরে থাকা অনেক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিজেরাও ইসরাইলের সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ এমন হামলার অনুমোদন দিয়েছেন, যেখানে শিশু নিহত হওয়ার আশঙ্কাও তাঁরা জানতেন।

তাঁদের যুক্তি ছিল, এসব পদক্ষেপ ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন।

কিন্তু পশ্চিম তীরে বসতিস্থাপনকারীদের বর্তমান হামলা ইসরাইলকে নিরাপদ করছে না বলে মনে করেন তাঁরা। বরং এর বিপরীতটাই ঘটছে বলে তাঁদের আশঙ্কা।

সাবেক বিমানবাহিনী জেনারেল আসাফ আগমন বলেন, ‘ইসরাইলের ভাবমূর্তি, কূটনৈতিক মূল্য এবং সামরিক বাহিনীকে একসঙ্গে ধরে রাখা মূল মূল্যবোধগুলো নষ্ট করে আপনি কিছুই অর্জন করতে পারবেন না।’

৭৮ বছর বয়সী আগমনের নাতি একজন ইসরাইলি সেনা ছিলেন। গত বছর লেবাননে তিনি নিহত হন।

আগমন বলেন, ‘আমার পরিবার ও আমি এই দেশের জন্য সর্বোচ্চ মূল্য দিয়েছি।’ ডিজিটালম্যাপ দেখুন

এরপর তাঁর বক্তব্য আরও কঠোর হয়ে ওঠে।

‘আমাদের দেশের মানুষ এখানে যা করছে, তাতে আমি লজ্জিত,’ বলেন তিনি।

একসময় যাঁরা ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুদ্ধ করেছেন, তাদেরই কেউ কেউ এখন বলছেন, পশ্চিম তীরের এই সহিংসতা শুধু ফিলিস্তিনিদের জীবনকেই বিপন্ন করছে না। এটি ইসরাইলের গণতন্ত্র, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD