বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৪ অপরাহ্ন

জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় স্বল্প মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দেশের চলমান জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় একযোগে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনার পর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো একযোগে কাজ করছে। স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি, বিকল্প দেশ থেকে গ্যাস আনার উদ্যোগ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো এবং গ্যাসের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন-সব মিলিয়ে সংকট মোকাবিলায় বহুমুখী কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি উৎস থেকে এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় উচ্চমূল্যে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে এবং মালয়েশিয়া থেকে আইএসও পদ্ধতিতে গ্যাস আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোরও সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর নেতৃত্বে মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলা স্বল্প মেয়াদে সরবরাহ ঘাটতি মোকাবিলার পাশাপাশি দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। সরকারের লক্ষ্য হলো শিল্পের উৎপাদন সচল রাখা, বিদ্যুৎ সরবরাহে স্থিতিশীলতা আনা এবং ধীরে ধীরে ব্যয়বহুল আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমানো।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে পেট্রোবাংলা স্পট মার্কেট থেকে চড়া দামে কার্গো কিনছে। গত সপ্তাহে কেনা দুই কার্গোর প্রতি এমএমবিটিইউর দাম পড়েছে ২৪ ডলারের বেশি। সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে এলএনজি সরবরাহকারীর তালিকাও বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে ২৯টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত থাকলেও নতুন করে আরও ৯টি কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি সরবরাহ পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে কাতারের সরবরাহ স্থগিতের কারণে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের পর কাতার এনার্জি এলএনজি কার্যক্রম স্থগিত করে ফোর্স মেজর ঘোষণা করে। বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় চলতি অর্থবছরে ৫৬ কার্গো এলএনজি আসার কথা থাকলেও নভেম্বর পর্যন্ত সরবরাহ বাতিল হওয়ায় এসব কার্গোর অর্ধেক পাওয়ার প্রত্যাশা করছে পেট্রোবাংলা। এ অবস্থায় বিকল্প উৎসর সন্ধানেও তৎপর সরকার। গ্যাসসংকট মোকাবিলায় মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানির প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। মিয়ানমার থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের পুরোনো প্রস্তাব নতুন করে আলোচনায় আনার পাশাপাশি এলএনজি হিসেবেও গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

অন্যদিকে মালয়েশিয়া থেকে ক্রোয়োজেনিক লরি ট্যাংকার বা আইএসও পদ্ধতিতে গ্যাস আমদানির নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। শিল্পকারখানায় দ্রুত গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্যে নেওয়া এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রায় ছয় মাস লাগতে পারে। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া থেকেও এলএনজি আনার উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।

২০৩০ সালের মধ্যে বাড়বে ১,৪০১ এমএমসিএফডি : গ্যাসসংকটের স্থায়ী সমাধানে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। পেট্রোবাংলার ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে ২০৩০ সালের মধ্যে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৪০১ মিলিয়ন ঘনফুট বা এমএমসিএফডি অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ২৯টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে। এসব কূপ থেকে প্রায় ২৭০ দশমিক ৮ এমএমসিএফডি গ্যাসের সংস্থান নিশ্চিত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১২৫ দশমিক ৩ এমএমসিএফডি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হচ্ছে। এ ছাড়া আটটি কূপে খনন ও ওয়ার্কওভার চলছে। এগুলোর কাজ শেষ হলে জাতীয় গ্রিডে আরও প্রায় ৯০ এমএমসিএফডি গ্যাস যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাকি ১১৩টি কূপের অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও ওয়ার্কওভার পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি এবং অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে ১৫০টি কূপ কর্মসূচির পাশাপাশি নতুন গ্যাসের সন্ধানে ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। সিসমিক জরিপের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় কাঠামো শনাক্ত করে দ্রুত অনুসন্ধান কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

দেশের গ্যাস উৎপাদন কমে আসায় এ উদ্যোগের গুরুত্বও বাড়ছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় বছরে দেশীয় গ্যাসের দৈনিক উৎপাদন ২ হাজার ৫০০ এমএমসিএফডি থেকে কমে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৬০০ এমএমসিএফডিতে নেমেছে। বিপরীতে বেড়েছে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে গ্যাসের চাহিদা। বর্তমানে দেশে গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় ৪ হাজার এমএমসিএফডি; গতকাল জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে ২ হাজার ৩২৯ এমএমসিএফডি, যার ৭১১ এমএমসিএফডি এসেছে এলএনজি থেকে।

গ্যাস বাঁচিয়ে শিল্পে, তেল দিয়ে বিদ্যুৎ : শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের মাধ্যমে কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি কেনার সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরলে জাতীয় গ্রিডে আরও প্রায় ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হতে পারে।

এ লক্ষ্যে সরকার বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি) ৬ হাজার কোটি টাকা সুদমুক্ত ঋণ দিয়েছে। এই অর্থ দিয়ে ফার্নেস অয়েল কেনা হবে। তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে দৈনিক গড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে এ অর্থ ব্যবহার করা হবে।

সরকারের এই সমন্বিত উদ্যোগে একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে লোডশেডিং কমানোর চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতে সাশ্রয় হওয়া গ্যাস শিল্পে সরবরাহ করে উৎপাদন সচল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস কিছুটা কমিয়ে শিল্পে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত; তবে দীর্ঘ মেয়াদে তেলভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো উচিত নয়।

সব মিলিয়ে, একদিকে উচ্চমূল্যে এলএনজি কিনে তাৎক্ষণিক সংকট সামাল দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন গ্যাসের উৎস খোঁজা, পুরোনো ক্ষেত্রের উৎপাদন বাড়ানো এবং বিকল্প দেশ থেকে গ্যাস আমদানির পথ তৈরি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়ায় শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD