ইয়েমেনে সংঘাত তীব্র হওয়ায় ভয়াবহ আকার নিচ্ছে খাদ্যসংকট। দেশটির সরকার-নিয়ন্ত্রিত যেসব এলাকায় জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) কাজ করতে পারছে, সেখানে ৭৪ শতাংশ পরিবার এখন তাদের ন্যূনতম খাদ্যচাহিদা পূরণ করতে পারছে না। চলতি বছরে এ হার সর্বোচ্চ বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
ডব্লিউএফপির তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক সপ্তাহের লড়াইয়ে ১ লাখ ৪৯ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তাদের অনেকেই এর আগেও সংঘাতের কারণে ঘরবাড়ি হারিয়েছিলেন। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর অনেকে আদেন ও তাইজের আশপাশে পানি ও খাবার ছাড়াই পৌঁছাচ্ছে।
ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত হুথিদের মধ্যে সংঘাত সাম্প্রতিক সময়ে বড় আকারে বেড়েছে। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় সীমান্তপারের হামলা অনেকটা বন্ধ হওয়ার পর এটিই সবচেয়ে গুরুতর সংঘাত বৃদ্ধি বলে উল্লেখ করেছে রয়টার্স। এই লড়াই দেশটির নিয়ন্ত্রণের ভারসাম্য বদলে দেওয়ার পাশাপাশি লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সংঘাতের কারণে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ইয়েমেন তার প্রয়োজনীয় খাদ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি করে। ফলে বন্দর, সড়ক ও বাণিজ্যপথে সামান্য বিঘ্নও খাদ্যের দাম ও সরবরাহে বড় প্রভাব ফেলছে। তাইজের কিছু এলাকায় মাত্র দুই সপ্তাহে গমের আটার দাম ১০ শতাংশ বেড়েছে।
ডব্লিউএফপির সহকারী নির্বাহী পরিচালক ম্যাথিউ হলিংওয়ার্থ বলেছেন, সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ইয়েমেনের খাদ্যনিরাপত্তার ওপর “ভয়াবহ” প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর মতে, সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, ক্ষুধার সংকটও তত বাড়বে।
ইয়েমেনে এরই মধ্যে ১ কোটি ৮৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে রয়েছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ২২ লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে, যার মধ্যে প্রায় ৫ লাখ শিশু গুরুতর অপুষ্টির শিকার।
সংঘাত থেকে পালিয়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের চাপও দ্রুত বাড়ছে। ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, গত কয়েক সপ্তাহে বাস্তুচ্যুত হওয়া মানুষের প্রায় ৭০ শতাংশ নারী ও শিশু। সংস্থাটি তাইজ ও লাহজের বড় দুটি বাস্তুচ্যুতি এলাকায় ইতোমধ্যে ৭০ হাজারের বেশি মানুষকে গরম খাবার ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা দিয়েছে। আরও ১৫ লাখ মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।
তবে অর্থ ও খাদ্য মজুতের সংকটও বড় হয়ে উঠছে। জরুরি সহায়তা চালিয়ে যেতে ডব্লিউএফপির আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ১০ কোটি ৯ লাখ ডলার প্রয়োজন। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, নতুন অর্থ না এলে বাস্তুচ্যুত ১ লাখ ৫২ হাজার মানুষ এবং ইতোমধ্যে সহায়তা পাওয়া ১৪ লাখ মানুষের জন্য খাদ্য ও অর্থের মজুত শেষ হয়ে যেতে পারে।
সংঘাতের প্রভাব ইয়েমেনের সীমানার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাব আল-মান্দাব প্রণালি- যা লোহিত সাগরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ- এবং হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে অস্থিরতা তৈরি হলে খাদ্য ও জ্বালানির বৈশ্বিক দাম আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে খাদ্য আমদানিনির্ভর দরিদ্র দেশগুলোর ওপর।
ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, সংঘাতের কারণে ইয়েমেনের তাইজ ও হোদেইদার কিছু এলাকায় তাদের প্রবেশাধিকারও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। একই সময়ে সংস্থাটি ভবিষ্যতের জন্য রাখা খাদ্য মজুতও এখন জরুরি সহায়তায় ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে।