শুধু যুদ্ধ বা ভূখণ্ডে হামলার ক্ষেত্রে নয়, দেশের ‘উন্নয়নস্বার্থ’ হুমকির মুখে পড়লেও বেসামরিক সম্পদ সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহারের সুযোগ রেখেছে চীন। দেশটির সংশোধিত জাতীয় প্রতিরক্ষা মোবিলাইজেশন আইনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিতে সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে। পরিবহন, প্রযুক্তি, চিকিৎসা ও খাদ্য সরবরাহসহ অর্থনীতির বিস্তৃত অংশে এর প্রভাব পড়তে পারে।
গত ১ অক্টোবর কার্যকর হওয়া সংশোধনীটি ২০১০ সালে আইন প্রণয়নের পর প্রথম বড় পরিবর্তন। প্রতিরক্ষা মোবিলাইজেশন বলতে জরুরি পরিস্থিতিতে দেশের জনবল, সম্পদ ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত ও সংগঠিত করাকে বোঝায়।
দ্য ডিপ্লোম্যাটে প্রকাশিত আকাংশ খান্ডেলওয়ালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মূল আইনটিকে প্রধানত তাইওয়ানকেন্দ্রিক হিসেবে দেখা হতো। তাইওয়ান স্বাধীনতা ঘোষণা করলে তার প্রতিক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় আইনি ও সামরিক কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আইনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। চীনের জাতীয় একীকরণের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য ঘিরে যুদ্ধের প্রস্তুতিই ছিল এর অন্যতম প্রধান বিবেচনা।
তবে সংশোধিত আইনে প্রতিরক্ষা মোবিলাইজেশনের পরিধি আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য, ভূখণ্ডের অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার পাশাপাশি ‘উন্নয়নস্বার্থের’ প্রতি হুমকিকেও এর আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু কোন পরিস্থিতিতে উন্নয়নস্বার্থ হুমকির মুখে পড়েছে বলে বিবেচিত হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট মানদণ্ড না থাকায় আইনটির প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্লেষক খান্ডেলওয়ালের মতে, এই অস্পষ্টতা সশস্ত্র সংঘাতের বাইরেও বেসরকারি সম্পদ সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে মালাক্কা প্রণালিতে অবরোধ এবং দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। চীন এসব পরিস্থিতিকে তার উন্নয়নস্বার্থের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
তবে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেছেন, আইনটি নিয়ে অতিরিক্ত ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি অন্যান্য দেশের অনুরূপ আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
চীনের রাজনৈতিক পরিসরে ‘উন্নয়নস্বার্থ’ ধারণাটি সাধারণত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের ধারাবাহিকতার সঙ্গে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির কর্তৃত্বের বৈধতাকে যুক্ত করে। খান্ডেলওয়ালের বিশ্লেষণে, প্রতিরক্ষা মোবিলাইজেশনের সংজ্ঞায় এই শব্দ অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার নামে সামরিক প্রস্তুতির পরিধি আরও বাড়তে পারে।
সংশোধিত আইনের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রতিরক্ষা মোবিলাইজেশনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের জন্য সহায়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিধান রয়েছে। ৮ নম্বর অনুচ্ছেদে উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োগ এবং উদীয়মান শিল্প খাতে প্রতিরক্ষা মোবিলাইজেশনের সক্ষমতা তৈরির কথা বলা হয়েছে। এর আওতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ নতুন প্রযুক্তিও আসতে পারে।
এ ছাড়া কৌশলগত উপকরণের মজুত এবং সামরিক পণ্যের সরবরাহব্যবস্থার নিরাপত্তা মূল্যায়নের বিধান রাখা হয়েছে। প্রতিরক্ষা মোবিলাইজেশন ঘোষণা করা হলে প্রয়োজন অনুযায়ী বেসামরিক স্থাপনা, সরঞ্জাম, যানবাহন ও জায়গা হুকুমদখল বা অধিগ্রহণ করা যেতে পারে।
খান্ডেলওয়ালের মতে, এসব বিধান বেসামরিক গবেষণা ও সামরিক শিল্পের মধ্যে সংযোগ আরও গভীর করতে পারে। একই সঙ্গে অর্থনীতির বড় অংশকে প্রয়োজনের সময় প্রতিরক্ষা সম্পদ হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।
ভারতের জন্যও এই সংশোধনী গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষক। ওষুধের কাঁচামাল, বিরল মৃত্তিকা ও চুম্বক, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ, সৌর মডিউল এবং মূলধনি পণ্যের ক্ষেত্রে ভারতের চীননির্ভরতা রয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, অর্থনৈতিক বিরোধের সময়ও আইনটি ভারতের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ভারতের জন্য কার্যকর হওয়া চীনের রপ্তানি বিধিনিষেধের প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। সূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট